ইস্পাতদৃঢ় ইরান, রহস্যময় ট্রাম্প

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি বলেছেন, ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকার নিয়ে কোনো দরকষাকষি হবে না। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তেহরানের বিতর্কিত পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে রোমে আসন্ন দ্বিতীয় দফার আলোচনার আগে গত বুধবার এ মন্তব্য করেন তিনি। আগামী সপ্তাহের শেষের দিকে এ আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। এর আগে গত মঙ্গলবার শীর্ষ মার্কিন মধ্যস্থতাকারী স্টিভ উইটকফ চুক্তিতে পৌঁছাতে হলে ইরানকে তার পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম বন্ধ করতে ও বাদ দিতে হবে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান বলছে, স্টিভ উইটকফের ওই মন্তব্যের জবাবে এমন কথা বলেছেন ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী। অবশ্য গত শনিবার ওমানে পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ‘ইতিবাচক’ ও ‘গঠনমূলক’ আলোচনা হয় বলে খবর প্রকাশিত হয়। তবে তার দুদিন পরই পাল্টে যায় সুর। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতিমধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন, কোনো চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব না হলে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক হামলা চালাতে পারে।

এদিকে ইরান নিয়ে ট্রাম্পের বিরূপ মনোভাব থাকলেও নিউ ইয়র্ক টাইমস এক প্রতিবেদনে দাবি করেছে, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে ইসরায়েলের পরিকল্পিত একটি হামলা ট্রাম্প আটকে দিয়েছেন। গত বুধবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে সংবাদমাধ্যমটি বলেছে, হামলার বদলে ট্রাম্প তেহরানের পরমাণু কর্মসূচি সীমিত করতে তাদের সঙ্গে আলোচনার পথকেই বেছে নিয়েছেন।

দ্য গার্ডিয়ান বলছে, ইরানকে তার পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে ও বাদ দিতে হবে স্টিভ উইটকফের এমন মন্তব্য সপ্তাহের শুরুর আলোচনার গতি বদলে দিয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ‘উইটকফের কাছ থেকে আমরা পরস্পরবিরোধী বক্তব্য শুনেছি। তবে প্রকৃত অবস্থান স্পষ্ট হবে আলোচনার টেবিলে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ইরানের সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম নিয়ে যেকোনো উদ্বেগ নিরসনে আমরা আস্থা তৈরি করতে প্রস্তুত। তবে সমৃদ্ধকরণের মৌলিক অধিকার নিয়ে কোনো দরকষাকষি হবে না।’

ওমানে অনুষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনাকে উভয়পক্ষই ‘ইতিবাচক ও গঠনমূলক’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। পশ্চিমা শক্তিগুলো বলছে, ইরান ইউরেনিয়ামকে এমন একটি উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ করছে, যা শুধু শান্তিপূর্ণ জ্বালানি কর্মসূচি নয়, বরং পারমাণবিক বোমার জন্য উপযোগী স্তরের কাছাকাছি। ইরান দীর্ঘদিন ধরে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের চেষ্টা করার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।

বুধবার ইরানের সংবাদমাধ্যম সূত্র উল্লেখ না করে জানিয়েছে, দ্বিতীয় দফার আলোচনা শনিবার ইতালির রাজধানী রোমে অনুষ্ঠিত হবে। এর আগে ঘোষণা করা হয়েছিল, আলোচনা পুনরায় ওমানে শুরু হবে। এ বিষয়ে অবগত সূত্রগুলো রয়টার্সকে স্থান পরিবর্তনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে একটি পোস্টে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক আলোচনার স্থান পরিবর্তনকে একটি গোলপোস্টের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি বলেন, স্থান বদলালে সেটি ‘যেকোনো শুরুকে বিপদে ফেলতে পারে’ এবং এটি ছিল ‘পেশাদার ভুল’।

একটি কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, ইরানের পারমাণবিক সাইটগুলোর তদারকির দায়িত্বে থাকা আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি রোমে অনুষ্ঠিত আলোচনার জন্য আমন্ত্রিত হয়েছেন।

ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টোনিও তাজানি নিশ্চিত করেছেন, আলোচনা রোমে অনুষ্ঠিত হবে। তবে তিনি বলেছেন, ইতালি এতে অংশগ্রহণ করবে না। তাজানি একটি বিবৃতিতে বলেছেন, ‘ইতালি শুধু শান্তির জন্য একটি সেতু হতে চায়; আমাদের কোনো ধরনের উচ্চাকাক্সক্ষা নেই। এ ধরনের সূক্ষ্ম আলোচনা সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর এবং তাদের বাস্তব ফল অর্জনের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে।’

বৃহস্পতিবার আরাকচি রাশিয়া সফরের সময় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির পক্ষ থেকে রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের কাছে একটি বার্তা পৌঁছে দেবেন বলে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে জানানো হয়েছে।

ইরানের রাষ্ট্রদূত কাজেম জালালি এক্সে লিখেছেন, ‘গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক ঘটনাবলির মধ্যে ইরান ও রুশ কর্র্তৃপক্ষের মধ্যে ঘনিষ্ঠ, অবিচ্ছিন্ন এবং আস্থাভিত্তিক যোগাযোগ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শান্তি এবং স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়ক হবে।’

রাশিয়া ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুদ নিয়ন্ত্রণ নিতে প্রস্তুত কি না, এমন প্রশ্নের উত্তর দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে ক্রেমলিন। এই মজুদ ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য পরমাণু চুক্তির অংশ হতে পারে।

ব্রিটেনের গার্ডিয়ান পত্রিকা জানিয়েছে, তেহরান সম্ভবত একটি চুক্তির অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব, যাতে ইরান তার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুদ রাশিয়ার মতো কোনো তৃতীয় দেশে পাঠাতে পারবে, তা প্রত্যাখ্যান করতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাক্সিওস নিউজ পোর্টালের সাংবাদিক বারাক রভিদও এক্সে পোস্টে তিনটি সূত্রের বরাতে জানিয়েছেন, আগামী শনিবার মার্কিন-ইরান পারমাণবিক আলোচনার দ্বিতীয় দফা রোমে অনুষ্ঠিত হতে চলেছে।

অ্যাক্সিওসের মতে, ইরান নীতি নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন দ্বিধাবিভক্ত। কিছু কর্মকর্তা শান্তিভিত্তিক সমাধানের পক্ষে, যার প্রতিনিধিত্ব করছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভেন উইটকফ এবং পেন্টাগন প্রধান পিট হেগসেথ। তারা যারা বিশ্বাস করেন, এ চুক্তির জন্য ওয়াশিংটনের সম্ভাব্য ছাড়সহ একটি কূটনৈতিক সমাধান প্রয়োজন।

অন্য গ্রুপে রয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মাইক ওয়াল্টজ। তারা ওয়াশিংটনের সঙ্গে চুক্তি করলেও তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি হ্রাস করার সম্ভাবনা নিয়ে অত্যন্ত সন্দিহান। তারা মনে করেন, তেহরান এখন আগের চেয়েও দুর্বল এবং যুক্তরাষ্ট্রের উচিত তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাগ করার জন্য জোর দেওয়া। যদি তারা অস্বীকৃতি জানায়, তাহলে তারা দেশটির ওপর আমেরিকান বা ইসরায়েলি হামলাকে সমর্থন করে।

এদিকে এমন দোলাচলের মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমস বলেছে, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে ইসরায়েলের পরিকল্পিত একটি হামলা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আটকে দিয়েছেন বলে জানিয়েছে নিউ ইয়র্ক টাইমস। হামলার বদলে তিনি তেহরানের পরমাণু কর্মসূচি সীমিত করতে তাদের সঙ্গে আলোচনার পথকেই বেছে নিয়েছেন।

সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যার সাহায্যে তার এক বছর বা তার চেয়ে খানিকটা বেশি সময়ের মধ্যেই পারমাণবিক অস্ত্র বানিয়ে ফেলতে পারবে বলে গুঞ্জন রয়েছে। এমন পরিপ্রেক্ষিতে তেহরানের ওই সক্ষমতা ভ-ুল করার লক্ষ্যে মে মাসের মধ্যে তাদের পরমাণু স্থাপনাগুলোতে হামলার পরিকল্পনা করেছিল ইসরায়েল। কিন্তু এ ধরনের হামলা চালাতে গেলে যুক্তরাষ্ট্রের সায় ও সহায়তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, ইরান পাল্টা ইসরায়েলে হামলা চালালে ওয়াশিংটনকে ঢাল হয়ে দাঁড়াতে হবে, তাছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত সাহায্য ছাড়া ইরানের স্থাপনাগুলোতে সফল হামলা চালানোও তেল আবিবের জন্য কঠিন হবে।

উপদেষ্টা, সহযোগী ও মন্ত্রিসভার সদস্যদের মধ্যে কয়েক সপ্তাহ ধরে হওয়া তর্ক-বিতর্কের পরপর ট্রাম্প ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপে সহায়তা করার বদলে ইরানের সঙ্গে আলোচনায় বসার সিদ্ধান্ত নেন, নিউ ইয়র্ক টাইমসের বরাত দিয়ে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।