রিজওয়ানা হাসান বললেন

এনসিপির দাবিতে নির্বাচনের ঘোষণার ব্যত্যয় ঘটবে না

জাতীয় নাগরিক কমিটি বা এনসিপির দাবির কারণে নির্বাচনের ঘোষণার ব্যত্যয় ঘটার কারণ নেই বলে মনে করছেন পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। তিনি বলেছেন, গত ৮ আগস্টের পরিপ্রেক্ষিত আর আজকের পরিপ্রেক্ষিত বেশ ভিন্ন। তখন আমরা একরকম মানসিক অবস্থায় ছিলাম। এখন একটা অবস্থায় এসেছি। সরকারপ্রধান থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, ডিসেম্বর থেকে জুনের মধ্যেই নির্বাচন হবে। এখন এটুকুই আমাদের কর্ম প্রাধিকারের মধ্যে আছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত হয়ে সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।

নির্বাচনবিষয়ক এনসিপির দাবিসংক্রান্ত সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে উপদেষ্টা রিজওয়ানা বলেন, ‘এনসিপি রাজনৈতিক অবস্থান থেকে তাদের রাজনীতি করে। তাদের দাবি তারা কীভাবে আদায় করবে সেটা তাদের ব্যাপার। এটার সঙ্গে সরকারের নির্বাচনের ঘোষণার কোনো ব্যত্যয় ঘটার কোনো কারণ আমি দেখি না।’

দেওয়ানি কার্যবিধিতে সংস্কার আসছে, সমন যাবে আধুনিক পদ্ধতিতে : হয়রানিমূলক মামলায় জরিমানা বৃদ্ধি, নির্দিষ্ট সময়ে বিচার সম্পন্ন করা এবং ডিজিটাল যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করার সুযোগ রেখে সিভিল প্রসিডিউর কোড বা দেওয়ানি কার্যবিধিতে সংস্কার আনছে সরকার। এটি কার্যকর হলে টেলিফোন, খুদে বার্তাসহ যোগাযোগের অন্যান্য আধুনিক পদ্ধতিতে সমন জারি করতে পারবে আদালত।

গতকাল উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে এ বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়। বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে উপদেষ্টা পরিষদ। তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে এ সভা হয়। পরে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বৈঠকের সিদ্ধান্ত তুলে ধরেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়বিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। এ সময় প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম উপস্থিত ছিলেন।

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন দেওয়ানি কার্যবিধি বা সিভিল প্রসিডিউর কোডে (সিপিসি) কিছু কিছু পরিবর্তন আনার সুপারিশ করেছিল। তারই আলোকে ব্রিটিশ সরকারের সময়ে প্রণীত সিপিসিতে কিছু পরিবর্তন আনার জন্য নীতিগত অনুমোদন হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে একটি কথা আছে, কারও সঙ্গে শত্রুতা করলে ভূমির মামলা দিয়ে দাও। তাহলে তিন প্রজন্মেও সেই মামলা আর শেষ হবে না। তাই সেই তিন প্রজন্ম যেন না লাগে, এক প্রজন্মেই যেন শেষ করা যায়, সেজন্য সিপিসির কিছু সংশোধনী আনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। যাতে করে বিচারের সময় কম লাগে, টাকা কম লাগে।’

সিপিসির কিছু সংশোধনীর কথা উল্লেখ করে পরিবেশ উপদেষ্টা বলেন, ‘আগে একটি মামলার রায় হওয়ার পরও জারি-মোকদ্দমা করতে হতো সেই মামলার রায় বাস্তবায়নের জন্য। এখন বলা হচ্ছে, যখন রায় হবে, তখনই এই পিটিশনের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করে দেওয়া হবে। এ ছাড়া আগে বারবার সময় নেওয়া হতো। এখন বলে দেওয়া হবে সর্বোচ্চ কয়বার সময় নেওয়া যাবে। তালিকায় পূর্ণাঙ্গ শুনানির জন্য কয়টা মামলা নেওয়া যাবে এবং আংশিক শুনানির জন্য কয়টা মামলা নেওয়া যাবে সেটাও ঠিক করে দেওয়া হবে।’

তিনি বলেন, বিচারপ্রক্রিয়া অনেকাংশেই পুরনো পদ্ধতিতে রয়ে গেছে। আগের মতো আর সমন জারি হবে না। টেলিফোন, এসএমএস বা অন্যান্য আধুনিক যোগাযোগ পদ্ধতি অবলম্বন করে সমন জারি করা হবে। কাউকে ফাঁসিয়ে দেওয়ার জন্য ভুয়া মামলা করার সুযোগ কমে যাবে। আগে ভুয়া মামলার শাস্তি ছিল ২০ হাজার টাকা, এখন সেটা বাড়িয়ে ৫০ হাজার টাকা করা হয়েছে।

বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের সুপারিশের বাস্তবায়ন অচিরেই শুরু হবে জানিয়ে পরিবেশ উপদেষ্টা বলেন, বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে বিদ্যমান সিআরপিসিতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হবে।

একটি আন্তর্জাতিক আইনে স্বাক্ষরের নীতিগত সিদ্ধান্ত : বৈঠকে অভিন্ন নদীর হিস্যা ভাগাভাগিসংক্রান্ত একটি আন্তর্জাতিক আইনে স্বাক্ষরের নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানান উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। তিনি বলেন, অভিন্ন জলরাশির পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে দুটি আইন রয়েছে। একটি হচ্ছে ১৯৯৭ কনভেনশন, যা ২০১৪ সালে কার্যকর হয়। উজানের দেশগুলোর মধ্যে কমপক্ষে ৩৬টি দেশের স্বাক্ষর প্রয়োজন হয়েছিল। সেটা পেতে ১৭ বছর সময় লেগে যায়।

ইউরোপীয় ইউনিয়নকে লক্ষ্য ধরে ১৯৯২ সালে একটি আইন করা হয়েছিল। ২০১৬ সালে এই আইন সব দেশের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। এ পর্যন্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরে ১১টি দেশ এই আইনে স্বাক্ষর করেছে, যাদের বেশিরভাগ হচ্ছে আফ্রিকার দেশ।

উপদেষ্টা রিজওয়ানা বলেন, ‘অভিন্ন নদীর হিস্যা ভাগাভাগি নিয়ে আন্তর্জাতিক একটি আইনে স্বাক্ষর করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। উপদেষ্টা পরিষদ সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, এই ১৯৯২ সালের কনভেনশনটা অনুস্বাক্ষর করব। এ নিয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় আলাপ-আলোচনা করাসহ যাবতীয় কাজ করা হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘কনভেনশন অন দ্য প্রটেকশন অ্যান্ড ইউজ অব ট্রান্সবাউন্ডারি ওয়াটার কোর্সেস অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল লেকস-১৯৯২-এ বাংলাদেশ অনুস্বাক্ষর করবে। বাংলাদেশকে দিয়েই এশিয়ার দেশগুলোর স্বাক্ষর প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে।’

সংসদবিষয়ক বিভাগের ভেটিং-সাপেক্ষে চূড়ান্ত অনুমোদন : বৈঠকে ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর খসড়া লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগের ভেটিং-সাপেক্ষে চূড়ান্ত অনুমোদন করা হয়েছে। আর্থিক দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের বিচার কার্যক্রম শুরু করতে সরকার কমিটি গঠন করেছে বলে জানিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। এরই মধ্যে আর্থিক দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে তদন্ত কার্যক্রম শেষ হয়েছে বলেও জানান তিনি। এ ছাড়া গ্রামীণ ব্যাংক (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর খসড়া নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বৈঠকে।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এ-সংক্রান্ত এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, দেশের প্রান্তিক ও দারিদ্র্যপীড়িত জনগোষ্ঠী বিশেষ করে নারীদের নিকট জামানত ছাড়া ক্ষুদ্রঋণ প্রদানের উদ্দেশ্যে ‘গ্রামীণ ব্যাংক অধ্যাদেশ, ১৯৮৩’-এর মাধ্যমে গ্রামীণ ব্যাংক গঠন করা হয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৮৩ সালের অধ্যাদেশটি বাতিল করে ‘গ্রামীণ ব্যাংক আইন, ২০১৩’ প্রণয়ন করা হয়। বর্তমানে ব্যাংকটি ‘গ্রামীণ ব্যাংক আইন, ২০১৩’ দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। ‘গ্রামীণ ব্যাংক আইন, ২০১৩’ যুগোপযোগী করার লক্ষ্যে প্রণীত ‘গ্রামীণ ব্যাংক (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর খসড়া লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগের ভেটিং-সাপেক্ষে উপদেষ্টা পরিষদে চূড়ান্ত অনুমোদন করা হয়েছে।