রেজিস্ট্রি অফিসে দুদকের অভিযান

গাজীপুর সদরের দুটি সাব রেজিস্ট্রার অফিসের ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্র্নীতির প্রমাণ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। বুধবার দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত গাজীপুর মহানগরীর মারিয়ালী এলাকায় রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সে দুদকের একটি টিম অভিযান চালিয়ে নানা দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগের সত্যতা পায়। অভিযান শেষে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানিয়েছেন দুর্নীতি দমন কমিশন সমন্বিত জেলা কার্যালয় গাজীপুরের সহকারী পরিচালক মো. এনামুল হক। এ সময় উপ-সহকারী পরিচালক সাগর সাহাসহ তিন সদস্যের একটি টিম উপস্থিত ছিল।

এনামুল হক জানান, গাজীপুর সদর সাব রেজিস্ট্রি অফিসের সাব কাওলা দলিল, দানপত্র দলিল, হেবা দলিল, পাওয়ার অব অ্যাটর্নি ও এওয়াজ পরিবর্তন দলিলসহ প্রতিটি দলিলে ভুল থাক বা না থাক অতিরিক্ত টাকা ঘুষ হিসেবে নেওয়া হয়। এটি শতকরা এক ভাগ থেকে অনেক সময় তিন ভাগেরও বেশি ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। দলিলের সঙ্গে যে সব সাপোর্টিং কাগজপত্র দেওয়ার কথা, ঘুষ নিয়ে সেগুলো যাচাই বাচাই ছাড়াই দলিল করে দেওয়া হয়। আর যদি ঘুুষ না দেওয়া হয়, তাহলে দলিল আটকে দেওয়া হয়। অফিসের কয়েকজন কর্মচারী ও দলিল দেখকদের মাধ্যমে সাব রেজিস্ট্রার ঘুষ নিয়ে থাকেন। টাকা না দিলে এ অফিসে কোনো কাজ হয়না। এমন অভিযোগের ভিত্তিতে বুধবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত দুদকের কর্মকর্তারা ওই অফিসটিতে অভিযান চালায়।

তিনি বলেন, এ অফিসটিতে প্রতিদিন প্রচুরসংখ্যক দলিল রেজিস্ট্রি হয়। সব দলিল যাচাই বাচাই করা সম্ভব নয়। গত দুই বছরের এবং এ বছরের কিছু দলিল নমুনাস্বরূপ দেখেছি। যেগুলোর অ্যামাউন্ট অনেক বড়। বর্তমান যে সাব রেজিস্ট্রার আছেন তিনি গত ফেব্রুয়ারি মাসে যোগদান করেছেন। গত মার্চ ও চলতি মাসের ৩০-৩৫টি দলিল দেখা হয়েছে। এতে কিছু অভিযোগ আমাদের কাছে সত্য মনে হয়েছে। কয়েকটি দলিলে দেখা গেছে, দলিলগুলোতে দাতা এবং গ্রহীতার জাতীয় পরিচয়পত্র থাকা বাধ্যতামূলক কিন্তু কয়েকটি দলিলে দাতার জাতীয় পরিচয়পত্র আছে গ্রহীতার নেই। আবার কিছু দলিলে গ্রহীতার জাতীয় পরিচয়পত্র আছে দাতার নেই। দশ লাখ টাকার ওপরে দলিল হলে টিআইএন নম্বর বাধ্যতামূলকভাবে দিতে হবে। দেখা গেছে, দলিলের মধ্যে টিআইএন লেখা থাকলেও একটিতেও কোনো কাগজ সংযুক্ত করা নেই। গত বছরের কয়েকটি দলিলে টিআইএন এর কাগজ পাওয়া গেলেও মার্চ এবং চলিত মাসের একটি দলিলেও টিআইএন এর কাগজ দেখাতে পারেননি সাব রেজিস্ট্রার। অভিযোগ রয়েছে টিআইএন না থাকলে একপার্সেন্ট করে টাকা নিয়ে দলিল করে দেন সাব রেজিস্ট্রার। এর ফলে অভিযোগের প্রমাণ মিলেছে। আমরা শুধু বড় বড় অ্যামাউন্টের কিছু দলিল দেখতে পেরেছি। সবগুলো দেখা সম্ভব হয়নি।

এদিকে দুপুরে ওই অফিসে ছদ্মবেশে অভিযানে আসার পর সদর যুগ্ম সাব রেজিস্ট্রার আবু হেনা মোস্তফা কামাল এবং তাদের অফিসের দুই কর্মচারী আহম্মদ আলী ও সোহেল রানাকে অফিসে উপস্থিত পাওয়া গেছে। পরে পোশাক পরে দুদুক টিম যখন জেলা রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ের দোতলায় যান তখন ওই দুই কর্মচারী আহম্মদ আলী এবং মাস্টার রোলে কর্মরত সোহেল অফিস থেকে পালিয়ে যায়। বিষয়টি জেলা রেজিস্ট্রার মিজানুর রহমানকে জানানো হয়েছে। দুদক টিম দেখে যারা অফিস ছেড়ে চলে গেছে জেলা রেজিস্ট্রার দুই তিন দিনের মধ্যে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় শক্ত পদক্ষেপ নেবেন বলে দুদক টিমকে আশ্বাস দিয়েছেন।দুদক কর্মকর্তা জানান, অভিযান পরিচালনাকালে আমরা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পেয়েছি। নিয়ম অনুযায়ী প্রতিবছর সাব রেজিস্ট্রি অফিস অডিট হওয়ার কথা। ২০১৪ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত গত ১০ বছরে মাত্র একবার অডিট হয়েছে। ২০১৪ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত চার বছরের একটি অডিটে ১৩ কোটি ৮৭ লাখ ৮১ হাজার ২১৩ টাকার গরমিল রয়েছে।

এদিকে বুধবার দুটি সাব রেজিস্ট্রার অফিসে দুদকের অভিযানের পর বৃহস্পতিবার সকালে গাজীপুর জেলা প্রশাসক নাফিসা আরেফীন রেজিস্ট্রেশন কার্যালয় পরিদর্শন করেন।

গাজীপুর জেলা রেজিস্ট্রার মিজানুর রহমান জানান, দুদক থেকে যে ৫-৬ জনের নাম দেওয়া হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বুধবার দুদকের অভিযান চলাকালে অফিস থেকে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায় মোহরার আহম্মদ আলীকে কাপাসিয়ায় তার কর্মস্থলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি সদর যুগ্ম সাব রেজিস্ট্রার অফিসে ডেপুটেশনে কর্মরত ছিলেন। এ ছাড়া এ অফিসের সোহেল রানাসহ আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।