সারা দেশের মোট উৎপাদিত পেঁয়াজের প্রায় ১৪ শতাংশ হয় রাজবাড়ীতে। কিন্তু সংরক্ষণের অভাবে বেশির ভাগ কৃষকই তাদের পেঁয়াজ মৌসুমেই বিক্রি করে দেন। এ কারণে পেঁয়াজের ভালো দাম পান না তারা। তবে চলতি বছর এয়ার ফ্লো মেশিন ব্যবহার করে অনেক কৃষকই পেঁয়াজ সংরক্ষণ করছেন। এতে ভালো দামের আশা করছেন তারা।
রাজবাড়ীর পাংশা ও কালুখালী উপজেলার বেশ কয়েকজন কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই অঞ্চলের মাটি পেঁয়াজ চাষের উপযোগী হওয়ায় বেশিরভাগ জমিতে পেঁয়াজের আবাদ করেন তারা। তবে এতদিন তারা পুরনো পদ্বতিতে মাচা ও চাঙ তৈরি করে পেঁয়াজ সংরক্ষণ করে আসছেন। এতে তাদের পেঁয়াজ সংরক্ষণে বড় ঘরের প্রয়োজন হয়। কেউ কেউ গোয়ালঘর বা বসতঘরে বাঁশের চাঙ করে পেঁয়াজ সংরক্ষণ করেন। কিন্তু এতে সংরক্ষণ খরচ অনেক বেড়ে যায়। আবার অন্য দিকে সংরক্ষিত পেঁয়াজের প্রায় ৩০ থেকে ৪০ ভাগ পচে যায়। রোদ ও গরমের কারণে কমে যায় পেঁয়াজের ওজন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১২০ বর্গফুটের একটি ঘরে ৩০০ থেকে সাড়ে ৩০০ মণ পেঁয়াজ সংরক্ষণ করা যায়। একটি এয়ার ফ্লো মেশিন তৈরি করতে খরচ হয় ১৬ হাজার টাকা। একটি মেশিন ব্যবহার করলে মাসে বিদ্যুৎ বিল আসে সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা। গত তিন বছর আগে পাংশা উপজেলায় এয়ার ফ্লো মেশিন ব্যবহার করে কয়েকজন কৃষক পেঁয়াজ সংরক্ষণ করেন। গত বছর প্রায় ৪০ কৃষক এই মেশিন ব্যবহার করেন। চলতি বছর এ পর্যন্ত পাংশা ও কালুখালী উপজেলায় প্রায় ৩০০ কৃষক এয়ার ফ্লো মেশিন ব্যবহার করছেন বলে জানা গেছে।
পাংশা ও কালুখালী উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, পেঁয়াজ সংরক্ষণে টিনশেড ঘর এবং ভবনের বিভিন্ন আয়তনের কক্ষে বাঁশের মাচা মেঝে থেকে এক ফুট উঁচু করে মাঝামাঝি স্থানে বসানো হয়েছে এয়ার ফ্লো মেশিন। এই মাচায় চার থেকে পাঁচ ফুট স্তূপ করে রাখা হয়েছে পেঁয়াজ। কোনো কোনো কৃষক পেঁয়াজ বোঝাইয়ের কাজ শেষ করেছেন। কেউ কেউ পেঁয়াজ বোঝাই করছেন। ফ্যানের সাহায্যে বাতাস টেনে তা কক্ষের সব স্থানে ছড়িয়ে দিচ্ছে এই এয়ার ফ্লো মেশিন। পাংশা উপজেলার মৌরাট ইউনিয়নের কৃষ্ণপুর গ্রামের কৃষক কোরবান মিয়া একটি টিনশেড ঘরে ৫০০ মণ পেঁয়াজ সংরক্ষণ করেছেন। এজন্য তিনি দুটি এয়ার-ফ্লো মেশিন ব্যবহার করছেন।
কোরবান মিয়া বলেন, ‘আগে পেঁয়াজ রাখতাম বাঁশের মাচায়। এতে অনেক পেঁয়াজ পচে যেত। রঙ নষ্ট হয়ে যেত। প্রতিমাসেই পেঁয়াজ বাছাই করা লাগত। এখন যে মেশিনটি লাগিয়েছি এর বাতাস পেঁয়াজ ঠা-া রাখে। পেঁয়াজ পচার কোনো সম্ভাবনা নেই। চাঙে পেঁয়াজ তুলতে শ্রমিক লাগত অনেক বেশি। আবার পেঁয়াজ নামাতেও অনেক শ্রমিক লাগত। এই মেশিন ব্যবহার করায় উঁচু করে মাচা (চাঙ) দিতে হচ্ছে না। এতে শ্রমিক খরচ কম লাগছে।’
কালুখালী উপজেলার বোয়ালিয়া ইউনিয়নের শ্যামসুন্দরপুর গ্রামের কৃষক মজনু বিশ^াস বলেন, ‘আমি প্রায় ৫০০ মণ পেঁয়াজ পেয়েছি। ২০০ মণ গোয়াল ঘরের চাঙে রেখেছি। আর ৩০০ মণ এয়ার ফ্লো মেশিনের আওতায় রেখেছি। চাঙে পেঁয়াজ রাখার চেয়ে এই মেশিনের আওতায় পেঁয়াজ রাখার সুবিধা বেশি। চাঙে অনেক সময় প্রায় অর্ধেক পেঁয়াজ পচে যায়। এয়ার ফ্লো মেশিন ব্যবহার করলে পেঁয়াজ পচার সম্ভাবনা কম। বাতাসের কারণে পেঁয়াজ ঠা-া থাকে, ওজনও ঠিক থাকে। আমি এবারই প্রথম এই মেশিন ব্যবহার করছি। যদি ফলাফল ভালো হয় তাহলে আগামী বছর আরেকটি মেশিন বসাব।’
পাংশা উপজেলার মৈশালা বাজারের শাহীন মেশিনারিজ অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপের মালিক শাহীন ম-ল বলেন, ‘আমি তিন বছর আগে এই উপজেলায় এয়ার ফ্লো মেশিন তৈরির কাজ শুরু করি। প্রথম বছরে ১০ জন কৃষক এই মেশিন ব্যবহার করে। গত বছর ৪০ জন কৃষক এই মেশিন ব্যবহার করে সুফল পেয়েছেন। এ বছর এই মেশিন ব্যবহারে কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া পড়েছে। এ পর্যন্ত চলতি মৌসুমেই ২৫০টির বেশি মেশিন আমি তৈরি করে দিয়েছি। আরও অনেক কৃষক এই মেশিন নেওয়ার জন্য অর্ডার দিয়েছেন।’
পাংশা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মুহাম্মদ তোফাজ্জল হোসেন বলেন, এয়ার ফ্লো মেশিন একটি চমৎকার উদ্ভাবন। একটি মোটর ব্যবহার করে এয়ার ফ্লো মেশিন তৈরি করা হয়েছে। কৃষকরা সাধারণত প্রাচীন পদ্ধতিতেই পেঁয়াজ সংরক্ষণ করে থাকেন। এতে প্রায় পঞ্চাশ শতাংশ পেঁয়াজ পচে যায়। কিন্তু এই মেশিন ব্যবহার করে ১২০ বর্গফুটের একটি কক্ষে প্রায় ৫০০ মণ পেঁয়াজ সংরক্ষণ করা সম্ভব। শাহীন নামে এক ব্যক্তি পাংশায় এই মেশিন তৈরি করেছেন। বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলার কৃষকরা এটি ব্যবহার শুরু করেছেন। আমরা কৃষকদের এই মেশিন ব্যবহারে উৎসাহী করার চেষ্টা করছি। এছাড়া অসচ্ছল কৃষকদের সরকারিভাবে এই মেশিন প্রদানের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।’