নেতৃত্বের বিকাশ ও আত্মগঠনে স্বেচ্ছাসেবা

ছাত্রজীবনেই ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজনীয় গুণগুলো আয়ত্ত করতে হয়। এই প্রয়োজনীয় গুণগুলো যেমন ভবিষ্যতে পেশাজীবনে কাজে লাগে, তেমনি সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতেও সহায়তা করে। স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করা ব্যক্তির এমন একটি গুণ, যা তাকে অন্য গুণাবলি অর্জনে নিরন্তর সহায়তা করে। ছাত্রজীবনই হলো এই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যটি অর্জনের শ্রেষ্ঠ সময়। তবে জীবনের যেকোনো ধাপে এই কাজে অংশ নেওয়া যায়। স্বেচ্ছাসেবার গুরুত্ব ও স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়েছেন নাহিদুল ইসলাম গাজী

স্বেচ্ছাসেবা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যা ব্যক্তি, সমাজ এবং দেশের উন্নতির জন্য অপরিহার্য। সমাজে আমরা যখন তরুণ বয়সে থাকি, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করি তখন আমাদের আশপাশের মানুষ, সমাজ, দেশের জন্য তথা ভালো কাজের সঙ্গে সংযুক্ত থাকার একটা স্পৃহা থাকে। স্বেচ্ছাসেবার মাধ্যমে আমরা পরিবেশ থেকে অজানা অনেক কিছু শিখতে পারি। স্বেচ্ছাসেবা আমাদের শেখায় মানুষের সঙ্গে মিশে চলা, মানুষের মনের ভাব বুঝে কথা বলতে পারা, কীভাবে একটি প্রতিকূল পরিবেশের মোকাবিলা করতে হয়, একটি টিমকে কীভাবে নেতৃত্ব দিতে হয়, কীভাবে একটি টিমের ম্যানেজমেন্ট ঠিক রাখতে হয় এভাবে আরও কত কিছু! 

স্বেচ্ছাসেবা নির্ভর করে ব্যক্তির ইচ্ছার ওপর। এটি নির্ভর করে ব্যক্তি তা করতে চায় কি না তার ওপর। সমাজ ও দেশের জন্য নিজেকে যোগ্য করে গড়তে হলে প্রত্যেকেরই ভলান্টিয়ারিং করা উচিত। ব্যক্তির কী দক্ষতা রয়েছে বা সমাজে চলার ক্ষেত্রে তার কী দুর্বলতা কাজ করছে, এটা জানতে হলে ভলান্টিয়ারিং করা জরুরি। ভলান্টিয়ারিংয়ে কাজ করতে গিয়ে ব্যক্তি তার সুপ্ত গুণাবলি অনুধাবন করতে পারে। পড়াশোনার মাধ্যমে জ্ঞান অর্জিত হয়, আর এই অর্জিত জ্ঞান চর্চার উপযুক্ত ক্ষেত্র হচ্ছে স্বেচ্ছাসেবা কার্যক্রম। স্বেচ্ছাসেবা কার্যক্রম বিশ^ব্যাপী স্বীকৃত। স্বেচ্ছাসেবা তরুণদের নৈতিকতা, দেশপ্রেম, মানবসেবা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে নেতৃত্বের পথ দেখায়।

স্বেচ্ছাসেবার সুযোগ

একজন ইনট্রোভার্ট মানুষ, তার রেজাল্ট খুবই ভালো কিন্তু সে মানুষের সঙ্গে মিশে কথা বলতে পারে না। সে যখন স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কোনো দলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে কাজ করবে, স্বাভাবিকভাবে তাকে কিছু কাজ ও দায়িত্ব দেওয়া হবে। দায়িত্ব পাওয়ার পর তার ওই কাজটি একাধিকবার করতে হবে। ফলে ধীরে ধীরে সে ওই কাজে দক্ষ হয়ে উঠবে। সে ভালো পারুক বা খারাপ, যেহেতু সে স্বেচ্ছাসেবক সেহেতু অন্যান্য স্বেচ্ছাসেবকরা তাকে ওই কাজে সাহায্য করবে বা শিখিয়ে দেবে। দলীয় নেতা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া, বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নেওয়া, প্রকল্পের বাজেট নির্ধারণ, নিজের বক্তব্য গুছিয়ে জনসমক্ষে তুলে ধরা, প্রভৃতি কাজের সুযোগ করে দেয় স্বেচ্ছা সমাজসেবা সংগঠনগুলো। এর ফলে পরবর্তী সময়ে এই স্বেচ্ছাসেবীদের মাঝে নেতৃত্বের গুণাবলি সৃষ্টি হয় এবং তারাও একেকজন সংগঠক হিসেবে গড়ে ওঠেন। ফলে আরও বেশি স্বেচ্ছাসেবাদানকারী সংগঠন গড়ে তোলে, যা সমাজকে সমৃদ্ধ করতে অবদান রাখে।

নেতৃত্ব বিকাশে স্বেচ্ছাসেবা

স্বেচ্ছাসেবাদান শুধু একটি সামাজিক কার্যক্রম নয়, বরং এটি একটি জীবনধারা, যা একজন তরুণকে আত্মনির্ভরশীল ও দক্ষ নেতৃত্ব দানে সক্ষম হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করে। একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন তার সদস্যদের মাঠ পর্যায়ে কাজ করার সুযোগ দেয়। এর মাধ্যমে একজন স্বেচ্ছাসেবী বিভিন্ন ওয়ার্কশপ, ক্যাম্পেইন ও জনকল্যাণমূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের পর্যাপ্ত সুযোগ পায়। যা তাকে নেতৃত্ব প্রদানের জন্য আরও বেশি দক্ষ হতে সাহায্য করে। স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করার সময় সদস্যদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব বণ্টন করা হয়, যাতে তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা বৃদ্ধি করে।

একজন স্বেচ্ছাসেবকের বৈশিষ্ট্য

একজন স্বেচ্ছাসেবক যখন সেবাদানে এগিয়ে আসেন তখন তার একজন আদর্শ স্বেচ্ছাসেবকের সব গুণাবলি থাকে না। কিন্তু এই গুণাবলি অর্জনের জন্য মনে আকাক্সক্ষা থাকতে হবে। ধীরে ধীরে এই গুণাবলি অর্জিত হয়। একজন আদর্শ স্বেচ্ছাসেবক হন দায়িত্বশীল, তিনি তার ওপর অর্পিত কাজ পূর্ণ মনোযোগ ও প্রচেষ্টার সঙ্গে করার চেষ্টা করেন। তিনি অন্যকে সহযোগিতা করতে সদা প্রস্তুত থাকেন। তিনি কঠোর পরিশ্রমী হন। অন্যের প্রতি তার হৃদয়ে সহানুভূতি বিরাজ করে। যেখানে প্রয়োজন সেখানে নেতৃত্ব গ্রহণে দ্বিধা করেন না। আবার নিজের থেকে দক্ষ ব্যক্তির নেতৃত্বে¡ কাজ করতেও সংকোচবোধ করেন না। তিনি সপ্রতিভাবে সবার সঙ্গে যোগাযোগে সক্ষম। ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন। সমস্যা নয়, সমাধানের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করেন।

বাংলাদেশে স্বেচ্ছাসেবা কার্যক্রম

বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ। এখানে স্বেচ্ছাশ্রমের প্রচুর সুযোগ রয়েছে। দেশের প্রতিটি জেলা-উপজেলা পর্যায়ে বৃহৎ পরিসরে কাজ করার সুযোগ আছে। আমাদের দেশে স্বেচ্ছাসেবা দেওয়া যায় এ রকম কিছু উল্লেখযোগ্য ক্ষেত্র হচ্ছে রাস্তায় ট্রাফিক সমস্যা, বাজার নিয়ন্ত্রণ, পরিছন্নতা অভিযান, সুবিধা বঞ্চিত ও পথশিশুদের শিক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তনে সচেতনতা, এনিমেল রেস্কিউ, অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স সচেতনতা, রক্তদান কর্মসূচি, শিশু সংগঠন গড়ে তোলা, বয়স্কদের সেবাদাতা হিসেবে কাজ করা, বয়স্ক শিক্ষা কার্যক্রমের কাজ করা, বৃক্ষরোপণ ও পরিচর্যা প্রভৃতি। এ ছাড়াও আছে জাতিসংঘ ঘোষিত এসডিজির ১৭টি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে স্বেচ্ছাসেবা দান করার সুযোগ রয়েছে। পছন্দ মতো একটি ক্ষেত্র বেছে নিয়ে সেটি নিয়ে কাজ করে এমন সংগঠন খুঁজে বের করতে হবে। এরপর যুক্ত হতে হবে তাদের সঙ্গে। তা ছাড়া নিজেই একটি সংগঠন তৈরি করে কাজের সুযোগ তো রয়েছেই। তবে নতুন সংগঠন তৈরি করার আগে কোনো সংগঠনে প্রথমে যুক্ত হয়ে অভিজ্ঞতা অর্জন করে নেওয়া ভালো।

বিদেশে উচ্চশিক্ষায় স্বেচ্ছাসেবা

আমেরিকা, কানাডা, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়াসহ ইউরোপের দেশগুলো অনেক সময়, শুধু স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতাকে পাঠবহির্ভূত কার্যক্রম হিসেবে ধরে দশ থেকে শতভাগ পর্যন্ত স্কলারশিপ দিয়ে থাকে। একজন তরুণ হিসেবে যতটুকু নিজের দেশকে দিতে পেরেছেন সেটা বিদেশে উচ্চশিক্ষার গ্রহণের সময় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ মূল্যায়ন করে। স্বেচ্ছাসেবা দান করে একজন শিক্ষার্থীর পক্ষে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করা সম্ভব, ক্লাসরুমে বসে বই পড়ে সেটা অর্জন করা সম্ভব নয়। এই সত্যকে বিদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো গুরুত্ব দিয়ে থাকে বলে উচ্চশিক্ষায় স্কলারশিপ দেওয়ার ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাসেবা দান করেছে, এমন শিক্ষার্থীকেই তারা অগ্রাধিকার দেয়।

লেখক : শিক্ষার্থী, ইনস্টিটিউট অব লাইভস্টক

সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি