‘বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা, আজ জেগেছে এই জনতা, এই জনতা।’ সলিল চৌধুরীর লেখা এই গান ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে। চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর ‘নতুন বাংলাদেশে’ বদলেছে অনেক প্রেক্ষাপট। পতিত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে অত্যন্ত আলোচিত-সমালোচিত ছিলেন বিচারপতি মানিক। একজন বিচারপতি হত্যাসহ বিভিন্ন মামলায় এখন কারাবাসে। তার বিরুদ্ধে রয়েছে দুর্নীতির নানাবিধ অভিযোগ। দেশে-বিদেশে গড়েছেন অবৈধ সম্পদও।
সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিকের যুক্তরাজ্যে তিনটি বাড়ি ক্রয়ের তথ্যপ্রমাণ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এছাড়া রাজধানীর বারিধারায় একটি ১০তলা বাড়িসহ দেশে কোটি কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ রয়েছে তার। বিচারপতি থাকাকালে এসব সম্পদের মালিকানা অর্জন করেছেন। এছাড়া তার বিরুদ্ধে অন্যের ৯০০ কোটি টাকার জমি দখলে রাখার অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের অনুসন্ধান শেষ পর্যায়ে। শিগগিরই তার বিরুদ্ধে মামলার সুপারিশসহ কমিশনে প্রতিবেদন দাখিল করা হবে বলে দুদক থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। দুদকের তথ্যমতে, বিচারপতি মানিক ও তার পরিবারের নামে বিপুল পরিমাণ সম্পদ রয়েছে। তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে নামে-বেনামে সম্পদের মালিকানা অর্জন করেন। তার সম্পদের মধ্যে বারিধারার একটি জমিতে ডেভেলপার কোম্পানির মাধ্যমে তিনটি বহুতল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। যার একটি ভবন বিচারপতি মানিক ও তার পরিবার পেয়েছেন আর দুটি ভবন ডেভেলপার কোম্পানি পেয়েছে। যে ভবনটি বিচারপতি মানিক ও তার পরিবারকে দেওয়া হয়েছে সেটিতে তিনি কয়েকটি ফ্ল্যাট পেয়েছেন। বিচারপতি মানিক চারটি ফ্ল্যাট রেখে বাকিগুলো বিক্রি করে দিয়েছেন। ফ্ল্যাট বিক্রির টাকা তিনি বিদেশে পাচার করেন। এছাড়া তার বিরুদ্ধে বারিধারা এলাকায় অন্যের ৯০০ কোটি টাকার জমি দখলে রাখার অভিযোগ রয়েছে।
জানা গেছে, দুদক গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর বিচারপতি মানিকের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ অনুসন্ধান করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য সংস্থাটির উপপরিচালক গুলশান আনোয়ার প্রধানের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি টিম গঠন করে। টিমের অপর সদস্য হলেন সহকারী পরিচালক পাপন কুমার সাহা ও আব্দুল্লাহ আল মামুন। গুলশান আনোয়ারকে কক্সবাজার বদলি করায় অভিযোগ টিমের অপর দুই সদস্য অনুসন্ধান করছেন।
দুদকের কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, দুদকের টিম অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে বিচারপতি মানিকের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের তথ্য জানাতে ব্যাংক, বীমা, সিটি করপোরেশন, রাজউক, ভূমি অফিস, রেজিস্ট্রি অফিস, রিহ্যাবসহ ২০০ প্রতিষ্ঠানে চিঠি দিয়েছে। ওই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন দপ্তর থেকে তথ্য-উপাত্ত দুদকে জমা হয়েছে। যা এখন পর্যালোচনা চলছে।
তিনি বলেন, বিচারপতি মানিকের আয়কর নথিসহ বেশ কিছু রেকর্ডপত্র পাওয়া গেছে। আয়কর নথিতে যুক্তরাজ্যে একটি বাড়ি ক্রয়ের তথ্য রয়েছে। তবে বাড়িটি কত কোটি টাকা খরচ করে ক্রয় করেছেন, বাড়িটির ঠিকানা আয়কর নথিতে উল্লেখ নেই। দুদকের অনুসন্ধান টিম বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্ট ইউনিটের (বিএফআইইউ) মাধ্যমে বাড়ির বিস্তারিত জানাতে যুক্তরাজ্যে চিঠি পাঠায়। এর বাইরে তিনি কোন কোন দেশে বাড়ি-গাড়ির মালিকানা অর্জন করেছেন তা জানাতে কানাডা, আমেরিকা, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, দুবাইসহ বিশে^র ১০টি দেশে বিএফআইইউর মাধ্যমে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বিচারপতি মানিক যুক্তরাজ্যে একটি বাড়ি ক্রয়ের কথা আয়কর নথিতে উল্লেখ করলেও সেখানে তার তিনটি বাড়ি ক্রয়ের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব বাড়ি তিনি বাংলাদেশ থেকে টাকা পাচার করে ক্রয় করেছেন। দুদকের অনুসন্ধান শেষ পর্যায়ে শিগগিরই তার বিরুদ্ধে মামলার সুপারিশসহ কমিশনে প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।
দুদকের কাছে থাকা তথ্য অনুযায়ী, লন্ডনের ভূমি অফিসের তথ্যমতে বিচারপতি মানিক লন্ডনের (১০৮, ঝযবঢ়ঢ়বু জড়ধফ, উধমবহযধস (জগ৯ ৪খই) নম্বর বাড়িটি এক লাখ ৮৬ হাজার পাউন্ডে কিনেছেন। ২০০৮ সালের ৭ অক্টোবর টাকা পরিশোধ করে বাড়িটি রেজিস্ট্রি করেছেন। বিচারপতি মানিক লন্ডনের (২৬, ঞযব ডধৎৎবহঃ (ঊ১২ ৫ঐণ) নম্বর বাড়িটির মালিক। তিনি ২০০৭ সালের ১ ফেব্রুয়ারি এই বাড়িটি কিনেছেন। রেজিস্ট্রি দলিলে বাড়িটির ক্রয়মূল্য হচ্ছে ২ লাখ ৪০ হাজার পাউন্ড। এছাড়া লন্ডনের ৯৪, ঊধংঃ ঐরষষ (ঝড১৮ ২ঐঋ) বাড়িটির মালিক হলেন বিচারপতি মানিক এবং নাদিয়া চৌধুরী। ২০১১ সালের ২১ নভেম্বর এই বাড়িটি তাদের নামে রেজিস্ট্রি করা হয়। তার আয়কর নথিতে লন্ডনের ৬, জঁংশরহ ডধু (ঝড ১৭) ঠিকানায় আরও একটি বাড়ি উল্লেখ আছে। তবে লন্ডন ভূমি অফিসের রেকর্ডে এই ঠিকানায় কোনো সম্পত্তি তার নামে পাওয়া যায়নি। তিনি এই ঠিকানাটি ভুল অথবা ঠিকানা গোপন করেছেন। আয়কর নথিতে লন্ডনে তিন বাড়ি ক্রয়ে যে পরিমাণ টাকা ব্যয় দেখিয়েছেন, প্রকৃতপক্ষে তার কয়েকগুণ বেশি মূল্য পরিশোধ করা হয়েছে। এই টাকার কোনো হিসাব বা উৎস আয়কর নথিতে দেখানো হয়নি।
দুদকের তথ্যমতে, বিচারপতি মানিকের ১০৮ ঝযবঢ়ঢ়বু জড়ধফ, উধমবহযধস (জগ৯ ৪খই) ঠিকানার বাড়িটি ক্রয়ের ক্ষেত্রে মর্টগেজ এক্সপ্রেস নামের একটি অর্থ ঋণ কোম্পানিতে ঋণের জন্য আবেদন করেন। আবেদনপত্রে তিনি নিজেকে লন্ডনের একটি কোম্পানির মার্কেটিং ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত বলে দাবি করেন। মার্কেটিং ম্যানেজার হিসেবে তিনি বছরে স্থানীয় মুদ্রায় ৩৪ হাজার ৪৫০ পাউন্ড বেতন পান বলে উল্লেখ করেন। বাস্তবে তিনি তখন হাইকোর্ট বিভাগে বিচারপতি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি হাইকোর্টে ২০০৩ সালের ২ জুলাই পর্যন্ত অস্থায়ী বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
দুদকের একজন মহাপরিচালক বলেছেন, বাংলাদেশ থেকে টাকা লন্ডনে কী উপায়ে পাঠানো হয়েছে তার কোনো উল্লেখ আয়কর নথিতে নেই। বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় আইন ও মানিলন্ডারিং (মুদ্রা পাচার) আইন অনুযায়ী বাংলাদেশ থেকে অন্য কোনো দেশে এত বিপুল পরিমাণ টাকা সরাসরি পাঠানোর কোনো সুযোগ নেই। তিনি অবৈধ প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাজ্যে টাকা পাঠিয়ে বাড়ি কিনেছেন।
দুদকের তথ্য মতে, দুস্থ ও অসহায় সাংবাদিকদের পুনর্বাসনের জন্য ১৯৯৮ সালে জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন ফর হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড ওয়েলফেয়ার (জার) নামে একটি সংস্থাকে ঢাকার বারিধারায় ১০ একর জমি লিজ দেয় সরকার। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরই ওই জমির ৫ একর জমি দখলে নেন বিচারপতি মানিক। রাজধানীর বারিধারা জে-ব্লকে সাউথ পয়েন্ট স্কুলের পাশের ৫ একর জমিতে ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। ভবনের সামনে লেখা হয় বীর মুক্তিযোদ্ধা বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী (মানিক) অ্যাডভান্স বারিধারা চৌধুরী ভবন।
ছাত্র-জনতার আন্দোলনে গত বছরের ৫ আগস্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। ওই সময়ে অবৈধভাবে সীমান্ত পাড়ি দেওয়ার সময় জনতা বিচারপতি মানিককে আটক করে পুলিশ দেয়। তিনি বর্তমানে কারাগারে বন্দি থাকায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
জানা গেছে, শামসুদ্দিন মানিক ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ হাইকোর্টের আইনজীবী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এলে তাকে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল নিযুক্ত করা হয়। পরে তাকে হাইকোর্টের অস্থায়ী বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি ২০০৩ সালের ২ জুলাই পর্যন্ত অস্থায়ী বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরে শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক বিচারপতি হিসেবে পুনর্বহাল হন। ২০১৩ সালের ৩১ মার্চ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচাপতি হিসেবে পদোন্নতি। তখন সিনিয়র ২১ জন বিচারককে ডিঙিয়ে তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়। বিচারপতি শামসুদ্দিন মানিকের বাংলাদেশের পাশাপাশি যুক্তরাজ্যের নাগরিকত্ব রয়েছে। বিতর্কিত কর্মকা-ের জন্য ২০১২ সালে বিচারপতি থাকা অবস্থায় লন্ডনে তিনি হামলার শিকার হয়েছিলেন। এছাড়া ২০১৫ সালে অবসর গ্রহণের পর লন্ডনে ফের হামলার শিকার হন।