ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের জন্য যে পৃথক পাঁচটি আইন রয়েছে, তা একটি সমন্বিত আইনে একীভূত করার সুপারিশ করেছে স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন।
আইনটি অধ্যাদেশ আকারে জারি করা হলে এক তফসিলে স্থানীয় সরকারের ওই পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন একসঙ্গে করা সম্ভব। এতে নির্বাচনব্যয় এক-চতুর্থাংশে নেমে আসবে। এ ছাড়া নির্বাচনের সময় ২২৫ দিনের পরিবর্তে ৪৫ দিনে নেমে আসবে এবং পাঁচ বছরে একবার শুধু একটি নির্বাচন হবে বলে সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রাথমিক প্রতিবেদন দেওয়ার প্রায় দুই মাস পর গতকাল রবিবার বিকেলে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় গিয়ে কমিশনের সদস্যরা প্রধান উপদেষ্টার হাতে প্রতিবেদনটি তুলে দেন বলে তার দপ্তর জানিয়েছে।
প্রতিবেদনটি হাতে পেয়ে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস সংস্কার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জনসম্পৃক্ততার প্রতি তার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
তিনি বলেন, ‘আমরা পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদনটি জনসমক্ষে প্রকাশ করব, যাতে নাগরিক, বিশেষজ্ঞ এবং অংশীজনরা প্রস্তাবিত সংস্কারগুলো বুঝতে পারেন। প্রকৃতপক্ষে আমি বিশ^াস করি যে, এই সংস্কারগুলো অল্প বয়স থেকেই নাগরিক সচেতনতা গড়ে তোলার জন্য স্কুলগুলোয় শেখানো উচিত।’
অধ্যাপক ইউনূস আরও বলেন, ‘আসুন, আমরা দেরি না করি। এই সংস্কারগুলো যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কাগজ থেকে বেরিয়ে অনুশীলনে যেতে হবে।’
কমিশন তাদের প্রতিবেদনে মোটা দাগে ৫১টি প্রধান সুপারিশ করেছে। এর যৌক্তিকতাসহ প্রতিবেদনের সারাংশ প্রধান উপদেষ্টার কাছে উপস্থাপন করে।
সন্ধ্যায় রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে কমিশনের প্রধান অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ বলেন, মাত্র ৪০ দিনের একটি শিডিউলে ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা, পৌরসভা এবং সিটি করপোরেশনের নির্বাচন করা সম্ভব।
বর্তমানে এসব প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনে ২২৫ দিন লাগে। তিনি বলেন, ‘২০২০-২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত স্থানীয় সরকারের যে নির্বাচনগুলো হয়েছে, তাতে সরকারের খরচ হয়েছে ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকার মতো। কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন করা গেলে এই খরচ ৭০০ কোটিতে নেমে আসবে এবং ২২৫ দিনের সময় ৪০ দিনে নেমে আসবে। আর নির্বাচনকেন্দ্রিক লোক নিয়োগ করা হয়েছিল ১৯ লাখের মতো, সেটা ৯ লাখে চলে আসবে। এটা একটা মৌলিক সংস্কার বলে মনে করি আমরা।’
অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘আইনগুলোর ক্ষেত্রে দেখেছি, ইউনিয়ন থেকে শুরু করে সিটি করপোরেশন পর্যন্ত পাঁচটি আলাদা আইন। অনেক ক্ষেত্রেই এক আইন আরেকটির প্রতিরূপ অথবা সাংঘর্ষিক কোনো কোনো ক্ষেত্রে। আমরা সবগুলো আইন পর্যালোচনা করে একটি অ্যাক্টের অধীনে সবগুলো নিয়ে আসার জন্য বলেছি। তিনটি নির্বাচন জাতীয় নির্বাচনের মতো আয়োজন হয়ে যায়। এ রকম নির্বাচন হলে একটা সরকার শুরু থেকে পাঁচ বছর কাজ করবে আর নতুন কোনো ইলেকশন লাগবে না। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে সিটি করপোরেশন কিন্তু ওই সরকারের সঙ্গে পুরো মেয়াদেই কাজ করতে পারবে।
সংস্কার না করে জাতীয় সংসদ আর স্থানীয় সরকার কোনো নির্বাচন করেই ভালো ফল পাওয়া যাবে না বলে মন্তব্য করেন অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ। তিনি বলেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচন আগে হোক এটা আমরাও চাই। কিন্তু নির্বাচনের প্রশ্ন এলে, আগে সংস্কার না করে কোনো নির্বাচন করলে কোনো লাভ হবে না। সেজন্য আমরা সংস্কারকে প্রাধান্য দিয়েছি। সংস্কার করার পর করলে কোনো অসুবিধা নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘স্থানীয় সরকারব্যবস্থা সবার মুখে মুখে থাকলেও আসলে এটায় সরকারের কোনো চরিত্র ছিল না। কারণ ব্রিটিশ আমলে এটা যখন করা হয়, তার আগের স্তরের একটা ইতিহাস আছে। তখন কিন্তু এটাকে “ক্ষুদ্র প্রজাতন্ত্র” বলা হয়েছে। কারণ ওখানে কেউ হস্তক্ষেপ করত না, গ্রামের লোকরাই সেখানে শাসন করত। কিন্তু ধীরে ধীরে এটা পরিবর্তন হয়েছে।’
‘অনেক দেশ আগে নিচে থেকে উঠে এসে স্টেট হয়েছে, তারপর ফেডারেশন হয়েছে। কিন্তু আমাদের এখানে সেটা হয়নি। আমাদের এখানে ওপর থেকে চাপিয়ে দিয়ে স্থানীয় সরকার হয়। ব্রিটিশ আমল থেকে এই ধারা শুরু হয়েছে। কিন্তু এটা মানুষের কল্যাণের জন্য নয়, ব্রিটিশদের শাসনব্যবস্থার সুবিধার জন্য এটা করা হয়েছিল। পরিপূর্ণভাবে এটাকে সরকারি কাজের সঙ্গে অধীন রাখা হয়েছে,’ বলেন তিনি।
কমিশনপ্রধান বলেন, ‘সেই সিস্টেম পাকিস্তান আমলেও খুব একটা বদলায়নি। বাংলাদেশের জন্ম হওয়ার পর আমাদের রাষ্ট্রের জন্য যে জাতীয় আকাক্সক্ষা ছিল, তখন স্থানীয় রাষ্ট্র হবে কী হবে না, তাতে খুব একটা গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। তাই আগে যা ছিল, সেটাকেই একটু নাড়াচাড়া করে শুরু হয়েছে। সেজন্য ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ধীরে ধীরে জেলা পরিষদ গঠন হলো। এভাবে আমাদের স্থানীয় সরকারব্যবস্থা কিন্তু স্বায়ত্তশাসিত হয়ে গড়ে ওঠেনি। এখন এ সময়ে এসে এটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ।’
অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘জেলা পরিষদে জনগণের কোনো ভোটাধিকার নেই। এই যে বিভিন্ন ধরনের কাঠামো ও আইন, এটা একটা বিরাট বাধা, আমরা চেষ্টা করেছি সংগঠন কাঠামো, আইন কাঠামো দুটি সংস্কার করে সমপর্যায়ে নিয়ে আসা। সেজন্য আমরা তৃণমূলপর্যায় থেকে কীভাবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতি চালু করা যায় এবং সংসদীয় ব্যবস্থার একটা প্রতিরূপ স্থাপন করার চেষ্টা করেছি। একই সুপারিশ পৌরসভা এবং সিটি করপোরেশনের ক্ষেত্রেও। সুতরাং, এখন যদি আমাদের সুপারিশ অনুযায়ী পুনঃস্থাপন করা হয়, তাহলে কিন্তু ইউনিয়ন থেকে সিটি করপোরেশন একই রকম কাঠামো হবে।’
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের নাম পরিবর্তনের সুপারিশ করেছে কমিশন। এ ছাড়া ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পরিষদে এক-তৃতীয়াংশ ওয়ার্ড নারীদের জন্য সংরক্ষণ করে তা ঘূর্ণায়মান পদ্ধতিতে তিনটি নির্বাচনের সুপারিশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। প্রতিটি ওয়ার্ড জনসংখ্যা ১২০০ থেকে ১৫০০ জন ধরে ইউনিয়ন পরিষদগুলোর সর্বনিম্ন ৯টি থেকে সর্বোচ্চ ৩৯টি ওয়ার্ড করার সুপারিশ তুলে ধরে কমিশন বলছে, এতে সরকারি ব্যয় সাশ্রয় করে সেবার মান বাড়ানো যাবে।
অনুমোদিত নকশা ও পরিকল্পনা ছাড়া গ্রাম এবং ইউনিয়নপর্যায়ে কোনো পাকা স্থাপনা করা যাবে না বলে মত দিয়েছে কমিশন। সেবার মান বাড়াতে জনপ্রকৌশল সেবা নামে একটি নতুন ক্যাডার সৃষ্টিরও সুপারিশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোয় বাজেট বরাদ্দ দ্বিগুণ করার সুপারিশ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিভিন্ন উৎসের ও তদবিরভিত্তিক বরাদ্দ প্রথা উঠিয়ে দিতে হবে।
এ ছাড়া দীর্ঘ মেয়াদে ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীর জন্য দ্বি-স্তরের মহানগর সরকার সৃষ্টির কথা বলেছে এ-সংক্রান্ত সংস্কার কমিশন।
অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদের নেতৃত্বাধীন স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন কয়েক মাসের আলোচনা, গবেষণা ও মাঠপর্যায়ে কাজ করার পর প্রতিবেদনটি জমা দেয়।
তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘আমরা সুপারিশ করছি, ঐকমত্য কমিশন প্রতিবেদনটি পর্যালোচনা করে প্রতিফলিত করবে। প্রথম অংশে আমরা কাঠামোগত সংস্কারের ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছি এবং পরবর্তী অংশে আমরা প্রস্তাব করেছি, একটি কাঠামো, যা ব্যবহারিক এবং স্কেলযোগ্য পরিবর্তন নিশ্চিত করে।’
তিনি আরও বলেন, ‘জনসেবা প্রদানে স্থানীয় সরকারকে আরও স্মার্ট ও দক্ষ করে তোলাই এর লক্ষ্য।’
অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘আমরা সম্পদ ব্যবস্থাপনার ভূমিকার জন্য একটি পুরো অধ্যায় উৎসর্গ করেছি এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগকে তদারকির ভূমিকা গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছি।’
কমিশনের প্রতিবেদনে নগর স্থানীয় সংস্থাগুলো বিশেষ করে ঢাকা সিটি করপোরেশনের জটিল চ্যালেঞ্জগুলোও চিহ্নিত করা হয়েছে।
অধ্যাপক আহমেদ বলেন, ‘বিভাগীয় অদক্ষতা এবং অবাধ ঘুষ এখনো স্থায়ী সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে। বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্প থেকে শুরু করে দৈনন্দিন পরিষেবা, দুর্নীতি একাধিক স্তর যেমন প্রকল্প স্তর, পরিষেবা স্তর এবং আন্তঃবিভাগীয়ের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়। এগুলো মোকাবিলা করতে না পারলে কার্যকর প্রশাসন স্বপ্নই থেকে যাবে।’
প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময় আরও উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনের সদস্য অধ্যাপক ড. ফেরদৌস আরফিনা ওসমান, আবদুর রহমান, ড. মাহফুজ কবির, মাহসুদা খাতুন শেফালী, অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তরিকুল ইসলাম, এলেরা দেওয়ান, অধ্যাপক ড. কাজী মারুফুল ইসলাম, এ কে এম তরিকুল আলম, হেলেনা পারভীন এবং মেজবাহ উদ্দিন খান।