নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলো অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি। একই সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচন নিয়ে যে সময়সীমা জানিয়ে দিয়েছেন, ইসি সে অনুযায়ী কাজ শুরু করতে পারে বলে মত ব্যক্ত করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। আবার যে আইনে বর্তমান ইসি হয়েছে সে আইন অবৈধ উল্লেখ করে তিনি সরাসরি ইসি পুনর্গঠনের কথা না বললেও ঐকমত্য কমিশনের রিপোর্টের আলোকেই নির্বাচন কমিশন হোক, এমন ধ্বনি তুলেছেন।
গতকাল রবিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলছিলেন তিনি। বৈঠকে পাঁচ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল সিইসির সঙ্গে আলোচনায় অংশ নেয়।
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, ‘নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কারের জন্য একটি কমিশন গঠন করা হয়েছিল। সেই কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী প্রতিটি পাতা, প্রতিটি লাইন এবং প্রতিটি শব্দ হুবহু বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই নির্বাচনের পথে এগোতে হবে। পুরনো পদ্ধতির মতো ইচ্ছেমতো সময় নিয়ে নির্বাচন আয়োজনের সুযোগ আর জনগণ দেবে না। এবার সুন্দর ও গ্রহণযোগ্য প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নির্বাচনের আয়োজন করতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা বলেছি নতুন বাংলাদেশে আপনাদের একটি সুন্দর প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। সংস্কার কমিশনের মাধ্যমে যে সুপারিশগুলো আসবে সেগুলো নিয়মনীতি অনুযায়ী প্রায়োগিক রূপ দিয়ে বাংলাদেশকে সঠিক পথে এগিয়ে নিতে হবে।’
সংস্কার শেষ করে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্যই আমরা সময় চেয়েছি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘গত ১৭ এপ্রিল রাজনৈতিক দল নিবন্ধনের সময়সীমা বৃদ্ধির জন্য ইসিতে আবেদন জমা দিয়েছিল এনসিপি। আজ (গতকাল) এসেছি নিশ্চিত হতে যে, তারা আমাদের চিঠি পেয়েছেন কি না। তারা জানিয়েছেন, বিষয়টি বিবেচনায় রেখেছেন।’
বৈঠকে মৌলিক সংস্কারসহ ইসির যেহেতু পুনর্গঠন চেয়েছেন, সে ক্ষেত্রে বর্তমান ইসির প্রতি আস্থা আছে কি না জানতে চাইলে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, ‘সিইসি ও ইসি নিয়োগ ২০২২-এর যে আইনে হয়েছে সেই আইনটা অবৈধ। অন্য কিছু দলও বলেছে অবৈধ। সে আইনের অধীনেই হয়েছে বর্তমান ইসি। আমরা এ আইনের বিরোধিতা করি। কিন্তু এখন যারা আছেন, তাদের সংস্কার প্রক্রিয়ার মধ্যে নিতে হবে। ঐকমত্য কমিশনের রিপোর্ট আসার পর উনারা থাকতে পারলে থাকবেন; না থাকতে পারলে থাকবেন না। এটা ঐকমত্য কমিশনের রিপোর্টের ওপর নির্ভর করবে। কারও প্রতি কোনো অবজেকশন নেই, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান ঐকমত্য কমিশনের রিপোর্ট অনুযায়ী হোক।’
বিগত তিন নির্বাচনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিচার দাবি : এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক বলেন, গত ১৫ বছরে সারা দেশে গুম, খুন করা হয়েছিল। ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। জালিয়াতির মাধ্যমে দেশকে একটি ফ্যাসিস্ট কাঠামোয় রূপান্তর করা হয়েছিল। আর এ ফ্যাসিস্ট কাঠামো তৈরি করতে অন্যতম ভূমিকা পালন করেছিল নির্বাচন কমিশন। এ সংস্কারের মাধ্যমে আমরা একটি নতুন বাংলাদেশ পুনর্গঠন করতে যাচ্ছি। সেই সংস্কার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে নির্বাচন কমিশনকেও সম্পৃক্ত করার বিষয়ে দীর্ঘক্ষণ আলোচনা হয়েছে। আলোচনার মধ্যে আমাদের জাতীয় নাগরিক পার্টির পক্ষ থেকে অনেক দাবি উত্থাপন করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা বলেছিলাম, গত তিনটি নির্বাচনে যারা প্রার্থী ছিলেন এবং নির্বাচন কমিশনের যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত ছিলেন, তাদের অনুসন্ধানের মাধ্যমে সঠিক প্রক্রিয়ায় এনে জনগণের সামনে দৃশ্যমান বিচারের আওতায় আনতে হবে। যাতে ভবিষ্যতে বাংলাদেশে কোনো প্রতিষ্ঠান, সাংবিধানিক হোক বা অসাংবিধানিক, কোনো ব্যক্তি বা দলের পক্ষে গিয়ে জনগণের রক্তের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করতে না পারে। সেই বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।’
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, ‘কমিশন বলেছে, কর্মকর্তারা আমাদের কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছেন। যেসব কর্মকর্তা ও কর্মচারী এখানে আছেন, তাদের কাছ থেকেও শপথ নেওয়া হয়েছে। তবে আমরা বলেছি, শুধু শপথে সীমাবদ্ধ না থেকে গত ১৫ বছরে যেসব অনিয়ম হয়েছে, তাদের আইনি প্রক্রিয়ার আওতায় আনতে হবে।’
এনসিপি নেতা আরও বলেন, ‘মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় প্রার্থীদের সশরীরে উপস্থিত থাকতে হবে। কমিশন জানিয়েছে, তারা এ বিষয়টি বিবেচনায় রাখবেন। বড় বড় ঋণখেলাপি থেকে শুরু করে গুণ্ডা-মাস্তানদের মাধ্যমে সংসদে একধরনের দুর্বৃত্তায়ন চালু হয়েছে, আমরা সেই ব্যবস্থা দেখতে চাই না। আমরা চাই গ্রামের মসজিদের ইমাম, স্কুলশিক্ষক যারা কোনো ধরনের টাকার ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন না, সমাজের পচা-গলা অংশের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিলেন না তারাই যেন জনপ্রতিনিধি হতে পারেন।’
নির্বাচনের সময় করা মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির দাবি করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘গত ১৫ বছরে অনেক প্রার্থী রয়েছেন যারা ঋণখেলাপি ছিলেন এবং হালনাগাদ হলফনামার বিশ্বাসযোগ্যতা ছিল না। কমিশন জানিয়েছেন, তারা এ বিষয়ে সম্মত এবং যেন তিন মাস আগেই এসব বিষয়ের নিষ্পত্তি হয় এটা নিশ্চিত করা হবে। বর্তমান যে নির্বাচনী আচরণবিধি এবং ব্যয় নীতিমালা রয়েছে, তা পরিবর্তনের কথা আমরা বলেছি। সিইসি জানিয়েছেন, আচরণবিধি এবং ব্যয় নীতিমালা উভয়ই পরিবর্তন করা হবে।’
‘শৃঙ্খলা কমিটি’ গঠন করেছে এনসিপি : সংগঠনের সদস্যদের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষা এবং সদস্যদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগের তদন্তের জন্য ‘শৃঙ্খলা কমিটি’ গঠন করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। অ্যাডভোকেট আব্দুল্লাহ আল-আমিনকে কমিটির প্রধান করা হয়েছে। সংগঠনটির তৃতীয় সাধারণ সভায় এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
গতকাল রবিবার এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব (দপ্তর) সালেহ উদ্দিন সিফাতের স্বাক্ষরিত এক বিবৃতি এ কথা জানানো হয়েছে। দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও সদস্য সচিব আখতার হোসেনের অনুমোদনক্রমে কমিটি গঠন করা হয়েছে।
কমিটির সদস্যরা হলেন ডা. তাজনূভা জাবীন, অর্পিতা শ্যামা দেব, অ্যাডভোকেট জহিরুল ইসলাম মুসা, মীর আরশাদুল হক, ফারহাদ আলম ভূঁইয়া, অ্যাডভোকেট আলী নাছের খান, আকরাম হোসেন (রাজ), আরমান হোসাইন, মো. আব্দুল্লাহ আল ফয়সাল, সানাউল্লাহ খান ও সাইয়েদ জামিল।