সিলেট টেস্টের প্রথম দিন শুধুই হতাশার

আকাশে সারা দিন চলেছে রোদ আর মেঘের লুকোচুরি খেলা। কখনো উজ্জ্বল আলোয় ভেসেছে মাঠ, কখনো আবার মেঘে ঢাকা পড়েছে সূর্য। হঠাৎ একবার নামল বৃষ্টি আধা ঘণ্টার জন্য থেমে গেল খেলা। যেন প্রকৃতিও জানাতে চাচ্ছিল, দিনটি হবে ধোঁয়াশায় মোড়ানো। ঠিক যেমনটা ছিল বাংলাদেশের প্রথম টেস্টের প্রথম দিন। আলোকচ্ছটায় শুরু, ভুলে ভরা মধ্যভাগ, আর হতাশায় মোড়ানো শেষ বিকেল।

সকালের নরম আলোয় সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে খেলা শুরু করেছিলেন দুই ওপেনার সাদমান ইসলাম ও মাহমুদুল হাসান জয়। উইকেটের চরিত্র ছিল ব্যাটিং-বান্ধব, বোলারদের জন্য বিশেষ কিছু না থাকলেও সুযোগটা কাজে লাগাতে পারলেন না টাইগার ওপেনাররা। অযাচিত শটে দিনের শুরুতেই পথ হারালেন দুজনে। জয় ফিরে গেলেন ১৪ রানে, সাদমানের ইনিংস থামল ১২ রানে। শুরুতেই দুটি উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে বাংলাদেশ।

দুই অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যান অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত ও মুমিনুল হক দায়িত্ব নিয়ে এগোতে থাকেন। এক সময় মনে হচ্ছিল, দিনের রঙ ফিরিয়ে আনবে এই জুটি। আগের দিন সংবাদ সম্মেলনে শান্ত জানিয়েছিলেন, সেট হয়ে আউট হতে চান না। গড়তে চান লম্বা ইনিংস। কিন্তু বাস্তবে তিনি যেন সেই কথার প্রতিফলন ঘটাতে পারলেন না। ৬৯ বলে ৪০ রানে থেমে গেল ইনিংস, আবারও সেট হয়েই ফিরলেন। অফ স্টাম্পের বাইরে একটু বাড়তি বাউন্স করা বল মাটিতে রাখতে পারলেন না শান্ত। বাউন্ডারির আশায় উড়িয়ে মারলে ধরা পড়েন ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্টে। ব্লেসিং মুজারাবানি ভালো করেছেন সকাল থেকেই। বাড়তি বাউন্সের জন্য ব্যাটসম্যানদের বেশ ভোগাচ্ছেনও তিনি। তেমনই এক ডেলিভারিতে বাউন্ডারির আশায় ওয়েসলি মাধেভেরের হাতে সহজ ক্যাচ দেন শান্ত। তার বিদায়ে ভাঙে ১২৮ বল স্থায়ী ৬৬ রানের জুটি।

মুমিনুলও এগিয়ে গিয়েছিলেন, পেয়ে যান ক্যারিয়ারের ২১তম ফিফটি। তার সাবলীল ও ধৈর্য নিয়ে ব্যাট করতে দেখে ভক্তরা তার ব্যাটে তিন অঙ্কের রান দেখতে পাচ্ছিলেন। কারণ কক্সবাজারের সৌরভ নামের এই বাঁহাতির ব্যাটিংয়ে নামা মানেই যে সেঞ্চুরি। সেঞ্চুরি না করে আউট হওয়া মানেই তার ব্যাটে রান খরা। সেই খরা সিলেটের ব্যাটিং উইকেটে কাটবে বলে ভাবা হচ্ছিল। কিন্তু ৫৬ রানে তিনিও একই পথে হাঁটলেন। ওয়েলিংটন মাসাকাদজার ফুল লেংথ বলে বড় শট খেলতে গিয়ে শর্ট মিড উইকেটে ক্যাচ দিলেন অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যান। স্থির থাকা ব্যাটসম্যানের এমন বিদায় দলকে ফেলল দোটানায়।

সন্ধ্যা নামার আগেই বাংলাদেশি ব্যাটিং দেখল আরও এক ধাক্কা। অভিজ্ঞ মুশফিকুর রহিম ও অলরাউন্ডার মেহেদী হাসান মিরাজ দুজনেই আউট হয়েছেন বড্ড দায়হীন শটে। উইকেটের অবস্থান, ম্যাচের অবস্থা, কিছুই যেন বিবেচনায় আনেননি তারা। এরপর শেষ বিকেলে যখন প্রয়োজন ছিল একপ্রান্ত আগলে রাখার, তখন উইকেট বিলিয়ে আসেন জাকের আলি অনিক। যেন সবাই মিলে ম্যাচটা ছুড়ে দিলেন প্রতিপক্ষের হাতে।

বাংলাদেশের ১৯১ রানে গুটিয়ে যাওয়ার পর ব্যাটিংয়ে নামে জিম্বাবুয়ে। দিনের আলো নিভে যাওয়ার আগে ১৪.১ ওভার ব্যাট করেছে সফরকারীরা। অথচ কোনো উইকেটই তুলতে পারেননি হাসান মাহমুদ, নাহিদ রানা, খালেদ আহমেদ কিংবা মেহেদী হাসান মিরাজ। বেন কারেন ৪০ রানে অপরাজিত থেকে দিনের খেলার ইতি টানেন। ৬৭ রানে পৌঁছে যায় জিম্বাবুয়ে, বাংলাদেশের হাল ছেড়ে দেওয়া বোলিংয়ের বিরুদ্ধে আত্মবিশ্বাসী শুরু তাদের।

প্রথম দিন শেষে বাংলাদেশের স্কোরবোর্ড যেমন, তার চেয়ে বেশি হতাশার ছবি লুকিয়ে আছে ব্যাটিং ও বোলিং দুই বিভাগেই। একটানা ভুল, দায়িত্বহীনতা আর আত্মবিশ্বাসের অভাবে প্রথম দিনটাই ছিটকে গেল হাতছাড়া সম্ভাবনার তালিকায়। এখন হয়তো শুধুই প্রকৃতির লুকোচুরি নয়, নিজেদের মনেও কিছুটা অন্ধকার জমেছে টাইগারদের।

এখন অপেক্ষা দ্বিতীয় দিনে বাংলাদেশ ফিরতে পারে কি না নিজেদের ছন্দে, নাকি এই অস্থির সূর্যাস্তই হবে পুরো টেস্টের রূপরেখা। প্রথম দিনে বৃষ্টিতে কয়েক ওভার নষ্ট হওয়ায় আজ দ্বিতীয় দিনের খেলা শুরু হবে ১৫ মিনিট আগে। সকাল ৯টা ৪৫ মিনিটে প্রথম বল গড়াবে মাঠে।