চারপাশে সবুজ ধানক্ষেত, মাঝখানে লম্বা টিনের চালাঘর। তবে যার মধ্যে নেই শ্রেণিকক্ষ কিংবা পাঠদানের ন্যূনতম কোনো অবকাঠামো। তবুও সরকারি নিবন্ধন পেতে জোর তৎপর চলছে ‘গায়েবি’ এ মাদ্রাসাটির। প্রতিষ্ঠানটির নাম ‘নতুনপাড়া স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা’। এ প্রতিষ্ঠানটি ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার বেগুনবাড়ী ইউনিয়নের নতুনপাড়া এলাকায়।
গতকাল রবিবার সকালে নামসর্বস্ব এ মাদ্রাসায় অভিযান চালিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), ঠাকুরগাঁও জেলা কার্যালয়। মাদ্রাসাটি কাগজে-কলমে বিদ্যমান থাকলেও বাস্তবে একটি টিনের চালা আর একটি সাইনবোর্ড ছাড়া কোনো অস্তিত্ব পায়নি দুদক।
দুদকের অভিযানে দেখা যায়, বিশাল মাঠের ধানক্ষেতের মধ্যে টিনের ঘরকেই দেখানো হচ্ছে ‘নতুনপাড়া স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা’ হিসেবে। সেখানে নিয়মিত শ্রেণি কার্যক্রম নেই, নেই শিক্ষক নিয়োগসংক্রান্ত কোনো প্রমাণও। অথচ এ মাদ্রাসা থেকে মাত্র ৫০০ মিটার দূরে অনেক আগে থেকে পরিচালিত হয়ে আসছে ‘নতুনপাড়া স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা’ নামে আরও একটি মাদ্রাসা, যার রয়েছে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও শিক্ষা অবকাঠামো, যা অনেক আগেই এমপিওভুক্ত হয়েছে।
দুদক ঠাকুরগাঁও সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক ও অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত উপপরিচালক আজমির শরিফ মারজী বলেন, ‘বাস্তবে প্রতিষ্ঠানটির কোনো কাঠামো নেই। অথচ ইবতেদায়ি মাদ্রাসা হিসেবে নিবন্ধনের প্রক্রিয়া প্রায় সম্পন্ন এবং এমপিওভুক্তির জন্য তদবির চলছে। এমন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এনফোর্সমেন্ট টিম অভিযানে নামে।’
তিনি আরও বলেন, ‘দুদকের উপস্থিতির খবর পেয়েই প্রায় আড়াই কিলোমিটার দূরের একটি কিন্ডারগার্টেন থেকে বেশ কিছু শিশু এনে মাদ্রাসার শিক্ষার্থী হিসেবে উপস্থাপন করারও চেষ্টা করা হয়। চকলেটের লোভ দেখিয়ে তাদের হাজির করা হয়েছিল বলেও প্রমাণ মেলে। আমরা এ বিষয়ে যথাযথ মন্ত্রণালয়ে আমাদের অভিযোগ পেশ করব।’
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ১৯৮১ সালে কয়েকজন ব্যক্তির মাধ্যমে ‘নতুনপাড়া স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা’ প্রতিষ্ঠিত হলেও ১৯৯৯ সালে এটি দাখিল পর্যন্ত অ্যাকাডেমিক স্বীকৃতি লাভ করে এবং ২০০২ সালে ইবতেদায়ি ও দাখিল শাখা একত্রিত হয়ে এমপিওভুক্ত হয়। সেই সময় ইবতেদায়ি শিক্ষক আবুল বাশার, নুরনবী ও বেলী আক্তার পরবর্তীকালে দাখিল শাখায় শিক্ষকতা করেন।
তবে দাখিলের সঙ্গে একীভূত হওয়ার পরও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদারকির অভাবে প্রতিষ্ঠানটি কাগজে-কলমে নতুনপাড়া স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা নামেই থেকে যায়।
নতুনপাড়া স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসার প্রধান মো. শাহানুর আলম দাবি করে বলেন, ‘আমাদের এ প্রতিষ্ঠানটি ১৯৮১ সালে স্থাপিত হয়। এর আগে যারা এ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকতা করেছেন, তারা নিয়মিত বেতন-ভাতা পেতেন। তারা অন্যত্র চলে যাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে যায়। সম্প্রতি আমরা এলাকার কয়েকজন মিলে পুনরায় প্রতিষ্ঠান চালু করি।’
তিনি আরও বলেন, ‘এলাকার কিছু ব্যক্তি আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য দিয়ে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে, যা সত্য নয়। আজ (গতকাল) হঠাৎ করে দুদক অভিযান পরিচালনা করে। তারা যেসব অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়েছে, তা আমরা ওনাদের সামনে তুলে ধরব।’
এই বিষয়ে প্রকৃত ‘নতুনপাড়া স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা’র প্রধান শিক্ষক রেজাউল করিম অভিযোগ করে বলেন, ‘মাত্র ৫০০ মিটার দূরে আমাদের নাম ব্যবহার করে ভুঁইফোঁড় আরেকটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে। বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।’
জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা শাহীন আখতার বলেন, ‘জেলা প্রশাসকের নির্দেশে গত ৬ এপ্রিল আমরা একটি তদন্ত করি। যেখানে আমরা উল্লিখিত মাদ্রাসাটির কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাইনি এবং সেখানে কোনো শিক্ষাকার্যক্রমও পরিচালিত হয় না। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানপ্রধান হিসেবে দাবি করা ব্যক্তি শাহিনুর আলমও কোনো বৈধ কাগজপত্র, শিক্ষক নিয়োগের প্রমাণ কিংবা শ্রেণি কার্যক্রমসংক্রান্ত কোনো তথ্য উপস্থাপন করতে পারেননি।’