বাবার ভুলের জন্য ক্ষমা চাইলেন উপদেষ্টা আসিফ

একদিকে বাবার ঠিকাদারি লাইসেন্সের খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া, অন্যদিকে দুদিন আগেই নিজের এপিএসের অব্যাহতির প্রজ্ঞাপন জারি। এ দুই নিয়ে বেশ চাপের মধ্যে পড়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে স্থানীয় সরকার উপদেষ্টার এপিএস দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত এমন সংবাদও প্রকাশ করেছে। ফলে উপদেষ্টা এ দুই ঘটনার ব্যাখ্যা দিয়েছেন নিজের ভেরিভায়েড ফেসবুক পেজের পোস্টে।

গতকাল বৃহস্পতিবার বাবার ঠিকাদারি লাইসেন্স নিয়ে অবস্থান ব্যাখ্যা করেন উপদেষ্টা। গত মঙ্গলবার এপিএস মোয়াজ্জেম হোসেনের পদত্যাগের ব্যাখ্যা দেওয়া পোস্টটিও শেয়ার করেন তিনি।

গতকাল ফেসবুক পোস্টে বাবার ভুলের জন্য ক্ষমা চেয়েছেন উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। তিনি লেখেন, ‘প্রথমেই আমার বাবার ভুলের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করছি। গতকাল রাত ৯টার দিকে একজন সাংবাদিক কল দিয়ে আমার বাবার নামে ইস্যুকৃত ঠিকাদারি লাইসেন্সের বিষয়ে জানতে চাইলেন। বাবার সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হলাম তিনি জেলাপর্যায়ের (জেলা নির্বাহী ইঞ্জিনিয়ারের কার্যালয় থেকে ইস্যুকৃত) একটি লাইসেন্স করেছেন।’

তিনি আরও লেখেন, ‘বিষয়টি উক্ত সাংবাদিককে নিশ্চিত করলাম। তিনি পোস্ট করলেন, নিউজও হলো গণমাধ্যমে। নানা আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে, তাই ব্যাখ্যা দেওয়ার প্রয়োজনবোধ করলাম।’

অন্তর্বর্তী সরকারের এই উপদেষ্টা তার ফেসবুক পোস্টে লেখেন, ‘আমার বাবা একজন স্কুলশিক্ষক। আকুবপুর ইয়াকুব আলী ভূঁইয়া পাবলিক উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। স্থানীয় একজন ঠিকাদার কাজ পাওয়ার সুবিধার্থে বাবার পরিচয় ব্যবহার করার জন্য বাবাকে লাইসেন্স করার পরামর্শ দেন। বাবাও তার কথায় জেলা নির্বাহী ইঞ্জিনিয়ার থেকে একটি ঠিকাদারি লাইসেন্স করেন।’

আসিফ মাহমুদ লেখেন, ‘রাষ্ট্রের যেকোনো ব্যক্তি ব্যবসা করার উদ্দেশ্যে যেকোনো লাইসেন্স করতেই পারেন। তবে আমি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বরত থাকা অবস্থায় বাবার ঠিকাদারি ব্যবসায় জড়ানো স্পষ্টভাবেই কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট। বিষয়টি বোঝানোর পর আজ (গতকাল) বাবার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে লাইসেন্সটি বাতিল করা হয়েছে।’

ফেসবুক পোস্টে তিনি আরও লেখেন, ‘বাবা হয়তো কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্টের বিষয়টি বুঝতে পারেননি, সেজন্য বাবার পক্ষ থেকে ক্ষমা প্রার্থনা করছি। উল্লেখ্য, মধ্যবর্তী সময়ে ওই লাইসেন্স ব্যবহার করে কোনো কাজের জন্য আবেদন করা হয়নি।’

গত মঙ্গলবার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া তার সহকারী একান্ত সচিবের (এপিএস) দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পাওয়া মো. মোয়াজ্জেম হোসেনের একটি পোস্ট শেয়ার করেন। ওই পোস্টে মোয়াজ্জেম দাবি করেন, তাকে অপসারণ করা হয়নি। স্থায়ী চাকরির চেষ্টা করছেন তিনি। এজন্য পদত্যাগ করেছেন। গণমাধ্যমে তার পদত্যাগকে অপসারণ হিসেবে ভুলভাবে উত্থাপন করা হয়েছে।

নিজের ফেসবুক আইডিতে দেওয়া এক পোস্টে এসব কথা লিখেছেন মোয়াজ্জেম হোসেন। সেই সঙ্গে পদত্যাগের কারণ তুলে ধরেছেন তিনি। মোয়াজ্জেম হোসেন তার পদত্যাগপত্র ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অব্যাহতিপত্রের প্রজ্ঞাপনের ছবি পোস্ট করে ফেসবুকে যা লিখেছেন ‘আমার পদত্যাগ প্রসঙ্গ’ ‘২০১৮ সালের কোটা আন্দোলনের সময় আমি প্রথম বর্ষের ছাত্র। সেই আন্দোলনে যোগদান করি এবং পরে ছাত্ররাজনীতি করতে গিয়ে পরিষদের সথেঙ্গ যুক্ত হই। মাগুরা জেলা ছাত্র অধিকার পরিষদের আহ্বায়ক, পরে সভাপতি ছিলাম। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও পরে কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক হই। ২০২৩ সালে নিজের ক্যারিয়ার গড়তে রাজনীতি ছেড়ে বিসিএস প্রিপারেশন নিই। ৪৬তম বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষা পাস করি। একই সঙ্গে ব্যাংকের অফিসার ক্যাশের প্রিলি পাস করি। জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের সময় আমার ব্যাংকের লিখিত পরীক্ষা হয় এবং আমি অংশগ্রহণ করি। আন্দোলন-পরবর্তী সরকারে আসিফ মাহমুদ দায়িত্বে আসার পর আমাকে কাজ করার অফার করা হলে আমি স্পষ্টভাবে বলি, আমার স্থায়ী ক্যারিয়ারের প্রশ্নে যেকোনো সময় চাকরি ছেড়ে দেব। গত ১০ মার্চ ২০২৫ ব্যাংকের লিখিত পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করলে আমি উত্তীর্ণ হই। এরপর বিসিএস লিখিত পরীক্ষার তারিখ নির্ধারিত হয় ৮ মে এবং ব্যাংকের ভাইভার তারিখ ২২ মে। তাই আমি গত মার্চের ২৫ তারিখে উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের কাছে পদত্যাগপত্রটি জমা দিই। উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ ৮ এপ্রিল পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেন এবং যেহেতু নিয়োগ প্রদান ও বাতিল রাষ্ট্রপতি কর্তৃক হয়ে থাকে, এজন্য গত ২২ এপ্রিল প্রজ্ঞাপন হয়েছে। এরপর গণমাধ্যমে পদত্যাগকে অপসারণ হিসেবে ভুলভাবে উত্থাপন করা হয়। এসব নিয়ে একদল আমাকে আমেরিকার বাড়িওয়ালা, একদল দুবাইতে রিসোর্ট মালিক বানিয়ে ফেলছেন। কেউ কেউ আবার ৩০০ কোটি আবার কেউ ৩০০০ কোটি টাকার মালিক বানাচ্ছেন। আপনাদের জ্ঞাতার্থে বলি, গত ৫ আগস্টের পর আমি এবং আমার পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের কারও সম্পদ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে থাকলে আপনারা আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন অথবা অভিযোগ জানাতে পারেন। স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা নিজেই অভিযোগ আহ্বান করেছেন। দয়া করে সামাজিকভাবে কাউকে অযথা হয়রানি করবেন না। দায়িত্বে থাকাকালে অনেক পরিচিত প্রবাসী আমাকে পোশাক গিফট করেছেন। এমনকি আমার ফোনটাও কিনে দিয়েছেন আমার বিভাগের প্রবাসী অ্যালামনাই এবং সরকারে থাকাকালে প্রয়োজনবোধে সরকারি গাড়িও ব্যবহার করেছি। সুতরাং এগুলো দেখে আমাকে যদি ভুলভাবে উপস্থাপন করেন, তাহলে আমার প্রতি অন্যায় ছাড়া কিছুই করা হবে না। আজকে একজন ফোন করে বললেন, তার দলের বেশিরভাগ মানুষ আমার ওপর ক্ষ্যাপা। কারণ হিসেবে বলছেন, আমার আচরণ। অর্থাৎ দায়িত্বে থাকাকালে অ্যাপয়েন্টমেন্ট না নিলে দেখা করার সুযোগ দিতাম না কিংবা সবার দাবি পূরণ করা সম্ভব ছিল না। তাদের জন্য বলব, ভাই ওটা আমার দায়িত্ব ছিল, এত এত মানুষকে ম্যানেজ করা খুব সহজ কাজ ছিল না। অনেকেই অভিযোগ করছেন, আমার ভাব বেড়ে গিয়েছিল। কারণ আমি ফোন ধরতাম না, মেসেজের রিপ্লাই দিতাম না। এসব অভিযোগ কেন্দ্রীভূত হয়ে আমাকে চোর বানাচ্ছেন। অথচ এমন অসংখ্য দিন গেছে, দুপুরের খাবার বাসায় গিয়ে খেয়েছি। যাই হোক, আমি দেশের জন্য, মানুষের জন্য যা করেছি বা করার চেষ্টা করেছি, তার প্রতিদান আল্লাহ নিশ্চয়ই দেবেন ইনশাআল্লাহ।’

এদিকে মোয়াজ্জেমের ফেসবুক পোস্ট নিজের ফেসবুক পেজে শেয়ার করেছেন উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ। সেই পেজের অ্যাডমিন লিখেছেন, ‘মাননীয় উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার সহকারী একান্ত সচিবের পদ থেকে পদত্যাগ করেন মো. মোয়াজ্জেম হোসেন। পদত্যাগপত্রটি গৃহীত হলে আদেশ কার্যকর করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। অপসারণ করা হয়েছে বলে গণমাধ্যমে যে সংবাদ প্রকাশিত হয়, তা সত্যি নয়। মাননীয় উপদেষ্টার সহকারী একান্ত সচিব মো. মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে যেকোনো অভিযোগ থাকলে তা অভিযোগ আহ্বান-সংক্রান্ত ইমেইলে পাঠানোর জন্য অনুরোধ করা যাচ্ছে।’

গত বছরের ১৪ আগস্ট উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের এপিএস হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন মোয়াজ্জেম হোসেন। নিয়োগের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছিল, ‘উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার অভিপ্রায় অনুযায়ী মো. মোয়াজ্জেম হোসেনকে; পিতা : মো. আজিজার ম-ল, মাতা : আনোয়ারা বেগম, গ্রাম-দক্ষিণপাড়া, ডাকঘর, বিনোদপুর, উপজেলা-মহম্মদপুর, জেলা-মাগুরা; জাতীয় বেতন স্কেল, ২০১৫ অনুযায়ী ২২০০০/ থেকে ৫৩০৬০/ টাকা বেতন স্কেলে (৯ম গ্রেড) তার সহকারী একান্ত সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলো। আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া যতদিন এ পদ অলংকৃত করবেন অথবা মো. মোয়াজ্জেম হোসেনকে সহকারী একান্ত সচিব পদে বহাল রাখার অভিপ্রায় পোষণ করবেন, ততদিন এ নিয়োগ আদেশ কার্যকর থাকবে।’

গত বছরের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া সংগঠন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ১৫৮ সদস্যের সমন্বয়ক টিমে ১৭ নম্বর সমন্বয়ক ছিলেন মোয়াজ্জেম হোসেন। ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার গঠন হওয়ার পর উপদেষ্টা পরিষদে যুক্ত হন আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। উপদেষ্টা হওয়ার পর নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু মোয়াজ্জেমকে সহকারী একান্ত সচিব হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন আসিফ।