প্রথম দিনেই শিক্ষকের পরিবর্তে শিক্ষকতা

ড. আমিনুল ইসলাম দর্শনের খ্যাতিমান অধ্যাপক, লেখক, প্রাবন্ধিক। দর্শন বিষয়কে মনে করা হয় নিছক তত্ত্বে আবৃত রসকষহীন শাস্ত্র। কিন্তু ড. আমিনুল ইসলামের বক্তৃতা শুনলে ও লেখা পাঠ করলে এ ধারণা বদলে যেতে বাধ্য। বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা তত্ত্বীয় আলোচনার সঙ্গে প্রাসঙ্গিক করে উপস্থাপন, সাহিত্য-সংগীত-ইতিহাস সব বিষয়ে সহজাত জ্ঞান ও তার উপস্থাপন তার বিশ্ববিদ্যালয়ে তার ক্লাস, অনুষ্ঠানে তার বক্তৃতা ও কাগজের পাতায় তার লেখাকে করে তুলেছিল অনবদ্য, রসময়।

ড. আমিনুল ইসলাম ছিলেন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের বিগত শতাব্দীর ষাটের দশকের দর্শন বিভাগের শিক্ষার্থী। চূড়ান্ত ফল প্রকাশের পর তিনি একই বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। ব্যক্তিগত জীবনে সুরসিক হলেও অপরিচিত বিশেষ করে নারী সহপাঠীদের সামনে অপ্রস্তুত হয়ে পড়তেন। ফলে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়ে কীভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুরন্ত শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে বশ মানাবেন তা নিয়ে দুশ্চিন্তা ছিল। এর আরেকটি কারণ ছিল, তিনি দেখতে খুবই হাল্কা-পাতলা ছিলেন। কিন্তু খুব বেশি না ভেবে প্রথম দিন শিক্ষক হিসেবে বিভাগে যোগ দিয়েছিলেন। তখনো জানতেন না কিছুক্ষণ পরেই তার চরম পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে আর এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তিনি মনের ভেতর এমন আত্মবিশ্বাস অর্জন করবেন, যার বদৌলতে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষাদান সম্পর্কিত ভীতি তাকে ছেড়ে চলে যাবে সারাজীবনের মতো। সেদিন ছিল ১৯৬৫ সালের ১ মার্চ। যোগদানের কিছুক্ষণের মধ্যেই দর্শনের বিখ্যাত শিক্ষক ড.  জি. সি. দেব তার কক্ষে এসে উপস্থিত হন। ভূমিকা ছাড়াই তিনি বললেন, ‘আজ এগারোটায় এমএ ফাইনালের সঙ্গে আমার লজিকের ক্লাস। তখনই আবার উপাচার্যের সঙ্গে এক জরুরি মিটিং। ভাবছি ক্লাসটি তুমি নিয়ে নিলে কেমন হয়।’

ড. জি সি দেবের এমন প্রস্তাবে হতচকিয়ে যান আমিনুল ইসলাম। যোগদানের প্রথম দিনেই ক্লাস নেওয়া, বিভাগের সবচেয়ে সিনিয়র শিক্ষার্থীদের তাও আবার ডাকসাইটে অধ্যাপক ড. জি সি দেবের স্থলাভিষিক্ত হয়ে? ভয় পাওয়াই স্বাভাবিক। তা ভয় তিনি পেয়েছিলেনও। তবে শিক্ষককে ‘না’ বলাটা ভব্যতাসিদ্ধ নয়। তা ছাড়া অর্পিত দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতাও তার চরিত্রে ছিল না। ফলে ক্লাসও নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে মানসিকভাবে নিজেকে প্রস্তুত করতে শুরু করলেন। হঠাৎ আশার আলো দেখতে পেলেন। কিছুদিন আগেই চূড়ান্ত পরীক্ষা দিয়েছেন এবং তাতে বেশ ভালো ফল অর্জন করেছেন। ফলে একদম অকূলে পড়তে হবে না তা তিনি বুঝলেন। সেই আশাবাদ সম্বল করেই উপস্থিত হলেন এমএ ফাইনাল ইয়ারের শিক্ষার্থীদের সামনে ব্র্যাডলির লজিক পড়াতে।

ক্লাসে উপস্থিত হয়ে নাটকীয় পদ্ধতিতে বললেন, ‘নির্ধারিত শিল্পীর (ড. দেব) অনুপস্থিতিতে রেকর্ডের গান বাজানো নয়, ব্র্যাডলির লজিক নিয়ে আলোচনার জন্যই আমার এই আকস্মিক আগমন।’ এই হাস্যরসাত্মক ঘোষণার কারণে ক্লাসে হাসির এক হিল্লোল বয়ে গেল। আমিনুল ইসলামেরও আড়ষ্টতা কেটে গেল। গল্প-কৌতুক, উপমা-উৎপ্রেক্ষার মাধ্যমে কথার তুবড়ি ছুটিয়ে যে ক্লাসটি নিলেন তাকে বলা যায় একমেবাদ্বিতীয়ম। ক্লাসের পরে সবাই তাকে অভিনন্দন জানালেন এবং তখন আলোচনা সূত্রে উঠে এলো প্রথম দিন শিক্ষককে বিব্রত করার জন্য যথেষ্ট প্রস্তুতি ছিল এমএ ফাইনাল ইয়ারের শিক্ষার্থীদের। কিন্তু তার প্রয়োগ করে উঠতে পারেননি তারা। শুধু প্রথম দিনের প্রথম ক্লাস নয়, আমিনুল ইসলামের শিক্ষক জীবনের প্রতিটি ক্লাসই হয়ে উঠেছিল এমন আনন্দময়।

সুলতানা রাজিয়া

(ড. আমিনুল ইসলামের ‘দর্শন বিভাগের কিছু স্মৃতি’ নিবন্ধ অবলম্বনে)