বিএনপির কেন্দ্রীয় আইনবিষয়ক সম্পাদক ও জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের মহাসচিব ব্যারিস্টার কায়সার কামাল রাজনীতি শুরু করেন গত শতকের নয়ের দশকের মধ্যভাগে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতা হিসেবে। ওয়ান-ইলেভেনের সময় বিএনপি নেতাদের পক্ষে আইনি লড়াইয়ে ছিলেন তিনি। আওয়ামী লীগের আমলে বিএনপি চেয়ারপারসন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ নেতাকর্মীদের মামলা পরিচালনা করেছেন। সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টে তার চেম্বারে দেশের রাজনীতি, বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা, আদালত প্রভৃতি বিষয়ে দেশ রূপান্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন উৎপল রায়
দেশ রূপান্তর: প্রায় ১৬ বছর বিএনপির শীর্ষ থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীরা রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলা, জামিন, সাজা, আপিল প্রভৃতি বিষয়ে আদালতে ঘুরেছেন। আপনারাও ব্যস্ত ছিলেন আদালতে। বিএনপি ক্ষমতায় গেলে একই চিত্র দেখতে হবে কি?
কায়সার কামাল: বিএনপি আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারে বিশ্বাস করে। দলটির শীর্ষ নেতারা বিশেষ করে চেয়ারপারসন দেশনেত্রী খালেদা জিয়া ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান আওয়ামী লীগের সময়ে সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী ছিলেন। দেশে আইনের শাসন না থাকলে যে কেউ যেকোনো সময় ভুক্তভোগী হতে পারেন। যদি দেশের জনগণ নির্বাচিত করে দেশসেবার সুযোগ দেয় তাহলে বিএনপির প্রথম কাজ হবে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা। এটি হলে প্রত্যেকটা রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, কবি, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিককর্মী তথা সমাজের সর্বস্তরের মানুষ এর বেনিফিট পাবে। গত ১৫-১৬ বছরে কোনো পেশার মানুষই রক্ষা পায়নি। কারণ দেশে আইনের শাসন ছিল না। ছিল শেখ হাসিনার শাসন। বিএনপির ৬০ লাখ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। মামলার ব্যথা বিএনপি বোঝে।
দেশ রূপান্তর: বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এখন সাজামুক্ত। কিন্তু বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিরুদ্ধে দুদকের একটি মামলায় ৯ বছরের সাজা রয়েছে। আইনজীবীদের ভাষ্য, সাজা থেকে নিষ্কৃৃতি পেতে হলে হয় তাকে আদালতে আসতে হবে নয়তো ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১ ধারায় আবেদন করতে হবে। আপনাদের ভাবনা কী?
কায়সার কামাল: ওয়ান-ইলেভেনের সময় দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এ মামলায় তারেক রহমান ও তার সহধর্মিণী ডা. জোবাইদা রহমানকে সাজা দেওয়া হয়েছে। তারেক রহমানকে সামাজিকভাবে হেয় করার জন্য শুধু মামলা নয়, বিভিন্ন প্রোপাগান্ডাও চালানো হয়েছে। মামলাটিতে দীর্ঘদিন উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ ছিল। ২০১৩ সালে আওয়ামী লীগ সরকার তড়িঘড়ি করে বিচার শুরুর উদ্যোগ নেয়। মাত্র ৯ দিনে শুনানি করে ৫৬ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৭ জনের সাক্ষ্য নিয়ে রাতের আঁধারে মামলাটি ওনারা সম্পন্ন করে সাজা দেন। এ সাজা আইনগতভাবে হতেই পারে না। তারেক রহমান আইনের শাসনে বিশ্বাসী। তার দেশে আসার ক্ষেত্রে মামলা বাধা নয়। দেশের প্রচলিত আইনে ও সংবিধানের আলোকে ওনার মামলাগুলোর নিষ্পত্তি করা হবে।
দেশ রূপান্তর: আওয়ামী লীগের আমলে উচ্চ ও অধস্তন আদালতকে ব্যবহার করে বিরোধী রাজনৈতিক দল ও মতকে ঘায়েল করার অভিযোগ শোনা যায়। বিএনপি ক্ষমতায় গেলে আপনারা আদালতকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখতে কতটুকু আন্তরিক থাকবেন?
কায়সার কামাল: বিএনপি ও আওয়ামী লীগের তুলনা ঠিক নয়। আওয়ামী লীগ একটা ফ্যাসিবাদী দল। আওয়ামী লীগের জন্মলগ্ন থেকেই এটা দেখাতে পারবেন না যে, তারা জনগণের স্বার্থে কাজ করেছে। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের গণপরিষদের অধিবেশনে ডেপুটি স্পিকার শাহেদ আলীকে চেয়ার দিয়ে পিটিয়ে মারা হয়েছিল। আওয়ামী লীগের নেতারা, এমপিরা কাজটি করেছিলেন এবং নেতৃত্বে কে ছিলেন সেটা ইতিহাস ঘাঁটলেই পাওয়া যাবে। আওয়ামী লীগের নেতারা যেমন এখন সদলে ভারতে পালিয়েছেন মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ও তারা সদলে ভারতে পালিয়েছিলেন। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে সাধারণ মানুষকে ও সেনাবাহিনীকে এক কাতারে নিয়ে এসেছিলেন। আওয়ামী লীগের কোনো নেতাকর্মীর ভূমিকা মুক্তিযুদ্ধে ছিল না। শেখ মুজিব ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে ’৭৩-এ ডাকসুর ব্যালট বাক্স ছিনতাই, পরে একদলীয় বাকশাল কায়েম, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণ, বিচার বিভাগ ও বিচারপতিদের নিয়ন্ত্রণের মতো কাজ করেছেন। তাদের সঙ্গে বিএনপির তুলনা চলে না। বিএনপির জন্মই হয়েছে রাষ্ট্র সংস্কারের মাধ্যমে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মাধ্যমে বিএনপি গঠনের মাধ্যমে দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ফিরে আসে। মাল্টি পার্টি সিস্টেম চালু হয়। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও জাতীয়তাবাদের স্বকীয়তা ফিরে আসে। খালেদা জিয়া ১৯৯১ সালে দেশে গণতন্ত্রের পুনঃপ্রবর্তন করেন। আওয়ামী লীগ গণতন্ত্রকে হরণ করে, বিএনপি পুনঃস্থাপন করে।
দেশ রূপান্তর: গণঅভ্যুত্থানে ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলো। তখন থেকেই দ্রুত নির্বাচনের দাবি আপনাদের। এ নিয়ে আপনাদের আশঙ্কাও আছে। বিষয়টি ব্যাখ্যা করবেন কি?
কায়সার কামাল: ৫ আগস্টের পর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছিলেন, এ সরকারকে নির্বাচনের জন্য একটা যৌক্তিক সময় দেওয়া হবে। যৌক্তিক সময়ের অর্থ কী, সচেতন মহলের অনেকেই বোঝেন। আশা করি, শাসন ক্ষমতায় যারা আছেন তারাও বুঝতে পারবেন; তাহলে রাজনৈতিক দল ও জনগণের মধ্যে এখন যে সংশয়, শঙ্কা বা হতাশা তা থাকবে না।
দেশ রূপান্তর: আইন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ৮ হাজার ৮৩২ রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারের উদ্যোগ নিয়েছে, যেগুলোতে প্রায় পাঁচ লাখ নেতাকর্মী রয়েছেন। বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?
কায়সার কামাল: অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচিত নয়। যে রাজনৈতিক দলের মতামতের ভিত্তিতে এ সরকার সেই রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধেই বিমাতাসুলভ আচরণ করছে তারা। ওনারা বলেছিলেন, শুধু বিএনপি নয়, সব রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহার করা হবে। কিন্তু তাদের আচরণে রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা হতাশ, ক্ষুব্ধ। দেশের মানুষ ক্ষুব্ধ। মামলা প্রত্যাহার খুব ধীরগতিতে চলছে। যেটা উচিত নয়। ওনাদের উচিত ছিল আরও আগেই আমাদের ৬০ লাখ নেতাকর্মীসহ আরও যে রাজনৈতিক দল রয়েছে তাদের বিরুদ্ধের মামলাগুলোও প্রত্যাহার করা।
দেশ রূপান্তর: জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের শীর্ষ কয়েকজন আইনজীবীর মধ্যে মতের অমিল, কোন্দলের কথা প্রায়ই শোনা যায়। বিষয়টির সত্যতা কতটুকু?
কায়সার কামাল: রাজনৈতিক দলের নেতাদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ‘ডেমোক্রেটিক প্র্যাকটিস’-এর অংশ। এটা হেলদি প্র্যাকটিস। আইনজীবীরা সমাজের দর্পণ। তারা বিজ্ঞজন। বিজ্ঞজনরা যদি একজন আরেকজনকে একটু বিজ্ঞতার পরিচয় না দেন তাহলে কীভাবে হবে (হাসি)? তাদের মধ্যে যদি প্রতিযোগিতা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা না থাকে তাহলে আইনজীবীসমাজ যে বিজ্ঞ তার প্রমাণ থাকে না।
দেশ রূপান্তর: অভ্যুত্থানের পর আওয়ামীপন্থি শীর্ষ আইনজীবীদের অনেকেই আদালতে আসছেন না। অনেকে আত্মগোপনে। তারা আদালতে এসে শুনানি করতে চাইলে আপনারা কি বাধা দেবেন?
কায়সার কামাল: বিচারাঙ্গনে ওনাদের পাপের পরিমাণটা এত বেশি যে, ওনারা নিজেরাও জানেন না। যারা সুপ্রিম কোর্টে ভোটডাকাতি করেছেন, যারা জবরদখল করে সভাপতি, সম্পাদকের আসন ধরে রেখেছিলেন তারাই কিন্তু আসেন না। বিএনপি সহাবস্থানে বিশ্বাস করে। আওয়মীপন্থি অনেকেই কিন্তু মামলায় শুনানি করছেন। কেউ বাধা দিচ্ছে না। শুনানি করতে চাইলে বিএনপি থেকে কোনো বাধা অবশ্যই থাকবে না।
দেশ রূপান্তর: আওয়ামী লীগের আমলে নির্বাচন ও নানা ইস্যুতে সুপ্রিম কোর্টসহ সারা দেশের বারগুলোতে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে। বারগুলোর দলীয়করণের অভিযোগ উঠেছে। বারকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখতে আপনাদের কোনো ভূমিকা থাকবে কি?
কায়সার কামাল: শেখ হাসিনার রেজিমে সুপ্রিম কোর্টে বারের নির্বাচনকে হাইজ্যাক করা হয়েছিল। বিএনপি আইনের শাসনে ও নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে বিশ্বাসী। আমরা চাই দেশের প্রত্যেকটা বার এবং প্রত্যেকটা পেশাজীবী সংগঠন যেন তাদের মতামত ও অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। গত ১৫-১৬ বছরে বিএনপিসহ আইনজীবীরা অনেক কিছু থেকে বঞ্চিত হয়েছে। বঞ্চনার ব্যথা আমরা বুঝি। আমরা চাই, এ কষ্ট যাতে অন্য কেউ না পায়।
দেশ রূপান্তর: প্রতি বছরের মার্চের প্রথম সপ্তাহে সুপ্রিম কোর্ট বারের ভোট হয়। এ বছর মার্চ গিয়ে এপ্রিল চলে যাচ্ছে। ভোটের উদ্যোগ নেই। আইনজীবীদের মধ্যে এ নিয়ে নানা কথা রয়েছে।
কায়সার কামাল: বারের বিষয়টি একান্তই তাদের (বার)। জাতীয় সংসদ নির্বাচন দিতে কেন সময় নেওয়া হচ্ছে? কারণ যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে সেটা পুনর্গঠন করার জন্য একটা স্পেস দরকার। সে কারণেই সংসদ নির্বাচন হচ্ছে না। সুপ্রিম কোর্ট বার দেশের সর্বোচ্চ আদালতের বার। নির্দলীয় হলেও এখানে জাতীয় রাজনীতির অনেক কিছুই অন্তর্ভুক্ত। বারের নির্বাচন কখন হওয়া উচিত তা বারের নেতৃত্বে যারা ছিলেন বা এখনো আছেন তারা বলতে পারবেন।
দেশ রূপান্তর: একদিকে আপনারা নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন অন্যদিকে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বিএনপি, এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে অসহিষ্ণুতার খবর পাওয়া যাচ্ছে।
কায়সার কামাল: বিএনপির অঙ্গ সংগঠনগুলোর নেতাদের অধিকাংশেরই বয়স ৩০-এর নিচে। তাদের যখন ১২-১৩ বছর বয়স তখন থেকে তারা শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের লুটপাট দেখে আসছে। তারা দেখেছে পাশের বাড়ির একজন আওয়ামী লীগারের গাড়ি, দোতলা বাড়ি আছে। আমাদের রাজনৈতিক কৃষ্টি ও সংস্কৃতির অবস্থাটাই এমন। তারপরও তারেক রহমান এ ব্যাপারে জিরো টলারেন্সে আছেন বিধায় প্রায় সাড়ে তিন হাজার নেতাকর্মীকে সাংগঠনিক শাস্তির আওতায় নেওয়া হয়েছে। কেউ সমাজবিরোধী কাজ করলে তাকে পুলিশের হাতে তুলে দিতে বলা হয়েছে। স্বাধীনতার পর কোনো রাজনৈতিক দলের এত নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে এমন সাংগঠনিক শাস্তির সিদ্ধান্ত হয়েছে কি? এটাই বিএনপি।
দেশ রূপান্তর: আপনাকে ধন্যবাদ।
কায়সার কামাল: দেশ রূপান্তরকেও ধন্যবাদ।