আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিষিদ্ধ ও বিচার ছাড়া দেশে কোনো নির্বাচন হতে দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতারা। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর বায়তুল মোকাররমে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের ও বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশে এ কথা বলেন তারা। গণহত্যার দায়ে আওয়ামী লীগের দলগত বিচার, নিবন্ধন বাতিল ও রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধের দাবিতে নতুন গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সমাবেশের মিছিলে দলে দলে যোগ দেন নেতাকর্মীরা।
বিক্ষোভ সমাবেশের মঞ্চে এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন। বায়তুল মোকাররম মসজিদের দক্ষিণ গেটের রাস্তায় সমাবেশ হয়। সমাবেশে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা ও তার দলীয় বিচার এবং দলের নিষিদ্ধের দাবিতে মূল বক্তব্য দেন এনসিপির আহ্বায়ক মো. নাহিদ ইসলাম। নাহিদ বলেন, ‘আওয়ামী লীগের বিষয়ে নিষ্পত্তি না করে কোনো নির্বাচন হতে পারে না। জুলাই সনদ দ্রুত ঘোষণা ও কার্যকর করতে হবে এবং এতে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার বিষয়টি সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে। এ দেশের ইতিহাসে বহুবার জনগণ রাস্তায় নেমেছে নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্য। ৪৭-এর পর আমাদের স্বপ্ন দ্রুতই ভেঙে যায়। আবার ৭১-এ আমরা নতুন স্বপ্ন দেখি, কিন্তু সেই স্বপ্নকে গলা টিপে হত্যা করে মুজিববাদী সংবিধান। যেখানে ধর্মনিরপেক্ষতার নামে মুসলমানদের ধর্মীয় মূল্যবোধ থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছে আর বাকশাল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে গণতন্ত্রের মুখে তালা দেওয়া হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ তিনটি জাতীয় নির্বাচন চুরি করেছে। ঘটিয়েছে শাপলা হত্যাকাণ্ড, সর্বশেষ করেছে জুলাই হত্যাকাণ্ড। অথচ এ ঘটনার ৯ মাস পার হলেও সরকার বিচার করতে ব্যর্থ হয়েছে। হত্যা মামলার আসামিদের মনোনয়নপত্রের বিষয়ে নির্বাচন সংস্কার কমিশনের সঙ্গে নির্বাচন কমিশন একমত হচ্ছে না।’
‘বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা প্রশ্ন করছেন হাসিনা গণহত্যা করেছেন কি না। আমি বলছি, আপনারা সাংবাদিক না। সারা বিশ্ব দেখেছে, হাসিনা গণহত্যা চালিয়ে ভারতে পালিয়ে গেছেন’ বলে মন্তব্য করেছেন নাহিদ ইসলাম।
আওয়ামী লীগের নাম নিবন্ধনের খাতা থেকে কেটে সন্ত্রাসীর খাতায় লিখতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন। তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ গণহত্যা করেছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে সমস্যা কোথায়? আওয়ামী লীগের নাম নিবন্ধনের খাতা থেকে কেটে সন্ত্রাসীর খাতায় লিখতে হবে।’
আওয়ামী লীগের বিষয়টি অমীমাংসিত রেখে নির্বাচন হতে দেওয়া হবে না জানিয়ে এনসিপি নেতা সারজিস আলম বলেন, ‘আওয়ামী লীগ জুলাই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। খুনিদের রাজনীতি করতে দেওয়া হবে না। আমরা মুষ্টিবদ্ধ হাত উঁচু করে সিদ্ধান্ত নিচ্ছি।’
দলটির আরেক কেন্দ্রীয় নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ‘ড. মুহাম্মদ ইউনূস আমরা সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিচ্ছি আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করতে হবে।’
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, ‘ইসি আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের চেষ্টা করছে। ১৫ বছর আপনারা আয়েশি জীবনে মত্ত ছিলেন। মানুষ জীবন দিয়েছে আর আপনারা নেগোসিয়েশন করেছেন।’
যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘আগে বিচার, এরপর সংস্কার, তারপর নির্বাচন। আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধে টালবাহনা মেনে নেওয়া হবে না।’
কেন্দ্রীয় নেতা জয়নাল আবেদিন শিশির বলেন, ‘দল হিসেবে আওয়ামী লীগ এবং খুনি হাসিনা ও তার দোসরদের বিচার অবশ্যই হতে হবে। এ দাবি আদায়ে এনসিপি মাঠে আছে, থাকবে।’
ডা. তাসনিম জারা বলেন, ‘জুলাই-আগস্টের সেই দুঃসহ সময়ের ক্ষত এখনো শুকায়নি। হাসপাতালগুলোতে এখনো আমাদের ভাইয়েরা কাতরাচ্ছে। কেউ চোখের আলো হারিয়েছে, কেউ আর কখনো হাঁটতে পারবে না। এতসব ঘটনার পরও এখন বলা হচ্ছে, সেই দল নির্বাচনে যাবে। এটা কি কোনো দেশের সঙ্গে, কোনো জাতির সঙ্গে উপহাস নয়?’
জুলাই শহীদ মুগ্ধের ভাই সিগ্ধ বলেন, ‘আপনারা কি আওয়ামী লীগকে ফেরত চান। গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতা রায় দিয়েছে আওয়ামী লীগের ফিরে না আসার। যারা শহীদ হয়েছেন, পঙ্গুত্ববরণ করেছেন তারা সিদ্ধান্ত নেবেন আওয়ামী লীগের নিষিদ্ধের বিষয়।’
সমাবেশে জুলাই শহীদ খালেদ সাইফুল্লাহর বাবা ডা. কামরুল হাসান বলেন, ‘হত্যার বিচার না হওয়া পর্যন্ত কোনো নির্বাচন হতে দেওয়া হবে না। আমি শেখ হাসিনার ফাঁসি চাই।’
উপস্থিত বক্তারা বলেন, নিজ দেশের মানুষকে যারা হত্যা করেছে তাদের রাজনীতি করার অধিকার নেই। অন্তর্র্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ না করলে জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হবে। আইন সংশোধন করে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের ব্যবস্থা করতে হবে। এ নিষিদ্ধের মাধ্যমে শহীদ ও আহতদের রক্তের বদলা নেওয়া হবে। বিচার হওয়ার আগে আওয়ামী লীগকে কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড করতে দেওয়া হবে না। এনসিপির অন্য নেতারাও আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে কঠোর বক্তব্য দেন। তারা দলটির নিবন্ধন বাতিল, বিচার নিশ্চিত করা এবং আগামী নির্বাচনের আগে সন্ত্রাসী রাজনীতি বন্ধ করার দাবি জানান। জুমার নামাজ শেষে রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মিছিল নিয়ে বিক্ষোভ সমাবেশে যোগ দেন এনসিপির নেতাকর্মীরা।