বন্দরে পাল্টাপাল্টি নিষেধাজ্ঞা ভারত-পাকিস্তানের

ভারতশাসিত কাশ্মীরের পেহেলগামের বৈসরণ উপত্যকায় বন্দুকধারীদের গুলিতে ২৬ জন নিহত হওয়ার পর থেকে ভারত ও পাকিস্তান একটি সামরিক সংঘাতের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। পাল্টাপাল্টি নানা পদক্ষেপের পাশাপাশি কয়েক দিন ধরে সীমান্তে দুপক্ষের মধ্যে নিয়মিত গোলাগুলি হয়েছে। এর মধ্যে সবশেষ দুই দেশই তাদের বন্দরে জাহাজ ভিড়তে না দেওয়ার বিষয়ে পাল্টাপাল্টি নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। গতকাল রবিবার ভারত আবার পাকিস্তানে চেনাব নদীর পানিপ্রবাহ কমিয়ে দিয়েছে। এ ছাড়া উভয় দেশ পরস্পরের নাগরিকদের বহিষ্কার করেছে ও কূটনৈতিক মিশনগুলোও সীমিত করেছে। এর মধ্যে গতকালই ভারতীয় বিমানবাহিনীর প্রধান দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। অবশ্য সাক্ষাতে তাদের মধ্যে কী কী আলোচনা হয়েছে, তার বিস্তারিত জানা যায়নি। এদিকে দুই দেশের এমন পরিস্থিতির মধ্যে খবর এসেছে ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সামুদ্রিক নিরাপত্তা বাড়ানোর লক্ষ্যে ভারতের কাছে ১৩ কোটি ১০ লাখ ডলার মূল্যের সামরিক সরঞ্জাম বিক্রি করতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। এ-সংক্রান্ত একটি ফাইলে অনুমোদনও দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর।

বিশ্লেষকদের কেউ কেউ বলছেন, পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, দুপক্ষই পুরোপুরি যুদ্ধ প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। বর্তমান পরিস্থিতি যদি নিয়ন্ত্রণে না আসে, তবে এটি একটি পূর্ণাঙ্গ সামরিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে। পাকিস্তানের পারমাণবিক হুমকি এবং ভারতের আগ্রাসী অবস্থান পরিস্থিতি আরও জটিল করছে। তবে অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, আন্তর্জাতিক চাপ এবং কূটনৈতিক হস্তক্ষেপ প্রায়ই বড় সংঘাত এড়াতে সহায়ক হয়েছে।

খোদ পাকিস্তানের সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা (এনএসএ) মুইদ ইউসুফ বলেছেন, তিনি এখন দুই দেশের মধ্যে বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কা দেখছেন না। আলজাজিরাকে তিনি বলেন, আমি মনে করি না বড় ধরনের যুদ্ধ হবে। কিন্তু এ পরিস্থিতিতে কিছুই নিশ্চিত নয়। একটি ছোট ভুল-বোঝাবুঝি বা ভুল হিসাবও বড় সংঘর্ষে পরিণত হতে পারে।

তিনি বলেন, ভারত ও পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরেই সংকট ব্যবস্থাপনা নিয়ে সমস্যায় রয়েছে। তাদের মধ্যে কোনো দ্বিপক্ষীয় সংকট ব্যবস্থাপনা কাঠামো নেই, যা একটি মৌলিক উদ্বেগের বিষয়। ‘সংকট মোকাবিলার ক্ষেত্রে উভয় দেশের প্রধান কৌশল, তৃতীয়পক্ষের ওপর নির্ভর করা এ ধারণায় যে তারা উভয়পক্ষকে সংযত করার চেষ্টা চালাবে ও উত্তেজনা কমাতে সাহায্য করবে।

মুইদ ইউসুফ বলেন, এবার আমার মনে হয়, ভারত যে সমস্যায় পড়েছে, তা হলো তার পুরনো কৌশল অনুসরণ। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তৃতীয়পক্ষ যুক্তরাষ্ট্র তাদের সমর্থনে এগিয়ে আসেনি। দেখা যাচ্ছে, তারা (তৃতীয়পক্ষ) এখন পর্যন্ত নিরপেক্ষ ও সরাসরি জড়িয়ে পড়ার না নীতি বজায় রেখে চলেছে, যেমনটা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কয়েক দিন আগে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়া সরাসরি ভারতের প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে সংযুক্ত এবং ইতিহাসে সবসময় এমনই হয়েছে উভয় দেশ পাল্টাপাল্টি প্রতিক্রিয়া জানায়। এবারও অনেক শাস্তিমূলক পদক্ষেপ ঘোষণা করা হয়েছে। সমস্যা হলো, এমন পদক্ষেপ নেওয়া সহজ, কিন্তু পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে পক্ষগুলো চাইলেও সেসব বাতিল করা অত্যন্ত কঠিন।

আর সেগুলোই সংঘাত পরিস্থিতিতে আরও দীর্ঘায়িত করতে পারে। দুই দেশও যে সে অনুসারেই প্রস্তুতি নিচ্ছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। গতকাল নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন দেশটির বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল এ পি সিং। এর আগে গত শনিবার প্রধানমন্ত্রী মোদির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল দিনেশ কে ত্রিপাঠি। এ সময় আরব সাগরের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের সার্বিক পরিস্থিতির বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করেন নৌপ্রধান।

এর আগে সফররত অ্যাঙ্গোলার প্রেসিডেন্ট জোয়াও লরেনচোর সঙ্গে শনিবার বৈঠকের পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলেন, পেহেলগাম হামলার জন্য দায়ী সন্ত্রাসীদের এবং তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে ‘কঠোর ও চূড়ান্ত’ পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে ভারত অঙ্গীকারবদ্ধ। পেহেলগামে হামলার এক সপ্তাহের মাথায় গত ২৯ এপ্রিল ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেন। বৈঠকে ভারতের সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতার ওপর পূর্ণ আস্থার কথা জানান তিনি। মোদি বলেছিলেন, ভারতের পক্ষ থেকে জবাব দেওয়ার সময়, লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ এবং কোন প্রক্রিয়ায় জবাব দেওয়া হবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সশস্ত্র বাহিনীর পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে।

এদিকে বাগলিহার বাঁধের মাধ্যমে পাকিস্তানে চেনাব নদীর পানিপ্রবাহ কমিয়ে দিয়েছে ভারত। পাকিস্তানের সঙ্গে সিন্ধু পানিচুক্তি স্থগিতের পর এ পদক্ষেপ নিল নয়াদিল্লি। কিশানগঙ্গা বাঁধের মাধ্যমেও ঝিলম নদীর পানিপ্রবাহও একইভাবে নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা করছে ভারত। একটি সূত্রের বরাত দিয়ে গতকাল রবিবার ভারতের বার্তা সংস্থা পিটিআই এ তথ্য জানিয়েছে।

বিষয়টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্রটি বলেছে, চেনাব নদীর জম্মু অংশের (চন্দ্রভাগা) ওপর নির্মিত বাগলিহার জলবিদ্যুৎ বাঁধ এবং উত্তর কাশ্মীরে ঝিলম নদীর ওপর নির্মিত কিশানগঙ্গা বাঁধ পানি ছাড়ার বিষয়টি নিয়ন্ত্রণে ভারতকে সুযোগ করে দিয়েছে।

১৯৬০ সালে পানির ন্যায্য বণ্টন নিয়ে বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সিন্ধু পানিচুক্তি হয়েছিল। চুক্তি অনুযায়ী সিন্ধু অববাহিকার পূর্বাঞ্চলীয় তিনটি নদী ইরাবতী, বিপাশা ও শতদ্রুর পানি ব্যবহার করার অনুমতি দেওয়া হয় ভারতকে। আর পাকিস্তানকে পশ্চিমাঞ্চলের তিনটি নদনদী সিন্ধু, ঝিলম ও চেনাবের অধিকাংশ পানি ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়।

সিন্ধু পানিবণ্টন চুক্তি স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত জানাজানির পর পাকিস্তান আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ায় বলেছিল, এ চুক্তি লঙ্ঘন করে পানিপ্রবাহ সরিয়ে দেওয়া বা আটকে দেওয়াকে যুদ্ধের শামিল বলে বিবেচনা করা হবে। গতকাল দেশটি ভারতীয় জাহাজে নিষেধাজ্ঞা দেয়। পাকিস্তানের বন্দর ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের এক নির্দেশনায় বলা হয়, ‘পার্শ্ববর্তী দেশের সঙ্গে সাম্প্রতিক সামুদ্রিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’ নির্দেশনায় আরও বলা হয়, ভারতীয় পতাকাবাহী জাহাজগুলো পাকিস্তানি বন্দরগুলোতে প্রবেশ করতে পারবে না, একইভাবে পাকিস্তানি জাহাজগুলোও ভারতের বন্দরে যেতে পারবে না। তবে কোনো ব্যতিক্রম হলে তা ‘কেস বাই কেস’ ভিত্তিতে বিবেচনা করা হবে। এর আগে শনিবার ভারত জানায়, পাকিস্তানি পতাকাবাহী জাহাজগুলোকে আর ভারতের কোনো বন্দরে ভিড়তে দেওয়া হবে না। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় পাকিস্তানও একই ধরনের নিষেধাজ্ঞা জারি করে।

এমন পরিস্থিতিতে খবর এসেছে ভারত সামরিক সরঞ্জাম কিনছে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে। ভারতের বার্ত সংস্থা এএনআই জানিয়েছে, ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সামুদ্রিক নিরাপত্তা বাড়ানোর লক্ষ্যে ভারতের কাছে ১৩ কোটি ১০ লাখ ডলার মূল্যের সামরিক সরঞ্জাম বিক্রি করতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। এ-সংক্রান্ত একটি ফাইলে অনুমোদনও দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর। এসব সরঞ্জামের মধ্যে উন্নত সি-ভিশন সফটওয়্যার, প্রশিক্ষণ ও সহায়তা পরিষেবা রয়েছে। এএনআই জানিয়েছে, মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে একটি পোস্ট দিয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ‘পররাষ্ট্র দপ্তর ভারতের কাছে বিদেশি সামরিক সরঞ্জাম বিক্রিবিষয়ক একটি ফাইলের অনুমোদন দিয়েছে, যার আনুমানিক মূল্য ১৩ কোটি ১০ লাখ ডলার।’ এর আগে বুধবার মার্কিন প্রতিরক্ষা নিরাপত্তা সহযোগিতা সংস্থা জানায়, পররাষ্ট্র দপ্তর ভারতের কাছে বিদেশি সামরিক সরঞ্জাম বিক্রির অনুমোদনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কংগ্রেসকে এ বিষয়ে অবহিত করা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

প্রতিরক্ষা নিরাপত্তা সহযোগিতা সংস্থা আরও বলেছে, প্রস্তাবিত বিক্রয় যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতি এবং জাতীয় নিরাপত্তার লক্ষ্যগুলোকে সমর্থন করবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ভারত কৌশলগত সম্পর্ককে শক্তিশালী করবে এবং ভারতের প্রতিরক্ষা নিরাপত্তা উন্নত করতে সাহায্য করবে। এতে ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, শান্তি ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি ত্বরান্বিত হবে। তবে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে এ অস্ত্র দেওয়ার ঘোষণা অনেককে বিস্মিত করেছে।