আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে হেফাজতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হওয়া মামলা প্রত্যাহারের যে দাবি তা সহসা আলোর মুখ দেখছে না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগে যেসব কর্মকর্তা মামলার তদন্ত করেছেন তারা এখন সংশ্লিষ্ট থানায় নেই। ফলে নতুন করে তদন্ত কর্মকর্তা নিযুক্ত না হওয়ায় মামলাগুলোর সুরাহা হচ্ছে না। এখনো মামলা প্রত্যাহারের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকেও পুলিশ সদর দপ্তরে কোনো নির্দেশনা আসেনি।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আশার আলো দেখে আসছিল হেফাজত নেতারা। কিন্তু এখনো কার্যত কোনো কিছু দৃশ্যমান না হওয়ায় অনেকটা হতাশ দলটির নেতা-কর্মীরা। তবে বর্তমান সরকার আশ্বাস দিয়েছে, হেফাজতের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলো প্রত্যাহারের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এই নিয়ে স্বরাষ্ট্র ও আইন মন্ত্রণালয় কাজ করছে বলেও জানা গেছে।
হেফাজতে ইসলামের দাবি, এক সময় তাদের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলাকে স্বার্থের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছে হাসিনা সরকার। তখন মামলা যেন ছিল জিম্মি করার হাতিয়ার। ওইসময় দেনদরবার করেও মামলা থেকে রেহাই মেলেনি তাদের। উল্টো আওয়ামী লীগ সরকারকে সহায়তা করতে একের পর এক নাটক করে চাপ প্রয়োগ করা হতো। তদন্তের নামে ঝুলিয়ে রাখা হতো মামলা নামের ভয়।
পুলিশসংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগের তদন্ত কর্মকর্তারা সংশ্লিষ্ট থানায় না থাকায় বিপাকে পড়তে হচ্ছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তদন্তকারী কর্মকর্তারা বদলি হয়ে অন্য জেলায় চলে গেছেন। আবার ওইসব তদন্তকারী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে জুলাই আন্দোলনে ছাত্র-জনতা হত্যার মামলা হয়েছে। কেউ কেউ আটকও হয়েছেন। সব মিলিয়ে স্থবির হয়ে আছে তদন্ত কার্যক্রম।
বিষয়টি নিয়ে হেফাজত নেতারা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, মামলাগুলো প্রত্যাহার করতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক করা হয়েছিল। তারা কথা দিয়েও তা রক্ষা করেনি। আওয়ামী লীগ সরকার আমাদের জিম্মি করে ফায়দা নিয়েছে। কোনো প্রতিবাদ করা যায়নি। কোনো কিছু বললেই তারা মামলার ভয় দেখাত। নেতা-কর্মীদের নানাভাবে হয়রানি করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, ২০১৩ সালে ৫ মে শাপলা চত্বরের ঘটনায় ঢাকাসহ সারা দেশে ৮৩টি মামলা হয়। তাছাড়া ২০২১ সালে সবচেয়ে মামলা হয় সারা দেশে। ওই বছর ১৫৪টি মামলা হয়েছে। এসব মামলার মধ্যে মাত্র ২৫টি মামলার অভিযোগপত্র (চার্জশিট) ও ২টি মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছে। আওয়ামী লীগ হেফাজতের মামলা! সরকারের পতনের পর মামলাগুলো নিষ্পত্তি করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও রহস্যজনক কারণে প্রত্যাহার হচ্ছে না। এ নিয়ে হেফাজত নেতারা সরকারের কাছে মামলা প্রত্যাহার করতে দাবি জানিয়েছে। গত শনিবারও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত সমাবেশ থেকেও মামলা প্রত্যাহার করতে জোর দাবি জানান হেফাজত নেতারা।
জানা যায়, ২০১৩ সালের ৫ জানুয়ারি ও ২০২১ সালে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংঘর্ষের পর ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মামলা হয়। মামলায় হেফাজতসহ আওয়ামী লীগ বিরোধীদলগুলোর শীর্ষপর্যায়ের নেতা-কর্মীদের আসামি করা হয়। কিছু মামলার চার্জশিট দেওয়া হলেও বেশিরভাগ মামলা ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে।
জানতে চাইলে হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে অনুরোধ করেছি হেফাজতের বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলো সুরাহা করতে। আমরা আশ্বাস পেয়েছি। আশা করি, দ্রুত সময়ের মধ্যে সবকটি মামলা সুরাহা করা হবে। এসব মামলা নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার আমাদের সঙ্গে অভিনয় করেছে। তারা মামলাগুলো প্রত্যাহারের কথা বললেও তা করেনি।’
নাম প্রকাশ না করে পুলিশ সদর দপ্তরে কর্মরত অতিরিক্ত আইজিপি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হওয়ার পর হেফাজতের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তারা বদলি হয়ে গেছেন। ফলে নতুন করে তদন্তকারী কর্মকর্তা দেওয়া হয়নি। তাছাড়া সরকারের পক্ষ থেকেও মামলাগুলোর বিষয়ে কোনো নির্দেশনা আসেনি। আমরা অপেক্ষায় আছি কখন নির্দেশনা আসে। হেফাজতের মামলাগুলো ছিল রাজনৈতিক। আওয়ামী লীগ সরকার এসব মামলা তুরুপের ত্রাস হিসেবে ব্যবহার করে হেফাজতকে চাপের মধ্যে রেখেছিল। আমরা যতটুকু জানি বর্তমান সরকার মামলাগুলোর নিষ্পত্তির বিষয়ে আন্তরিক। তবে মামলাগুলো প্রত্যাহার করতে হলে কিছু আইনগত বিষয় আছে। আইনের দিকগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
হেফাজতের এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, কেন মামলাগুলো প্রত্যাহার বা সুরাহা করা হচ্ছে না তা বুঝতে পারছি না। মামলাগুলোতো ছিল রাজনৈতিক। আওয়ামী লীগ সরকার আমাদের নেতা-কর্মীদের হত্যা করে উল্টো মামলা দিয়ে আমাদের কাবু করে। বর্তমান সরকার মামলা প্রত্যাহারের বিষয়ে আশার বাণী জানিয়েছে। আমরা সরকারের হাইকমান্ডের সঙ্গে কথা বলেছি।
তিনি আরও বলেন, সরকার আওয়ামী লীগ আমলে দায়ের করা রাজনৈতিক মামলাগুলো প্রত্যাহার করার উদ্যোগ নিলেও আমাদের মামলাগুলো কবে নিষ্পত্তি হবে তা বুঝতে পারছি না। দ্রুত সময়ে মামলাগুলো সমাধানের উেেদ্যাগ নেবে বলে আমরা আশা করছি।
পুলিশ সূত্র জানায়, হেফাজতের মামলাগুলো নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের শীর্ষ নেতাদের পাশাপাশি একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা নাটক করেছেন। তারা সরকারকে খুশি করতে এসব মামলা করে হেফাজত নেতা-কর্মীদের নানাভাবে হয়রানি করেছে। ২০১৩ সালের ৬ মে বাগেরহাটে হেফাজতের কর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে হেফাজতের দুজন কর্মী মারা যান। ওই ঘটনায় ফকিরহাটে ৪টি ও সদর থানায় দুটি মামলা করে পুলিশ। এতে হেফাজত, জামায়াত, স্থানীয় বিএনপির নেতা-কর্মীসহ অন্তত ১২ হাজার নানা পেশার লোকজনকে আসামি করা হয়। তারমধ্যে একটি মামলার বিচার হয়েছে। রায়ে আসামিরা খালাস পেয়েছেন।
২০১৩ সালের ৫ মে সংঘর্ষের পর ঢাকাসহ ৭টি জেলায় ৮৩টি মামলা হয়। এসব মামলায় ৩ হাজার ৪১৬ জনের নামসহ ৮৪ হাজার ৯৭৬ জনকে আসামি করা হয়। দুটি মামলার অভিযোগ প্রমাণ করতে না পেরে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছে পুলিশ। আর ২৫টি মামলার অভিযোগপত্র দিলেও এর বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়নি। শাপলা চত্বরের ঘটনার পর ২০২১ সালে বেশি মামলা হয়েছে হেফাজতের বিরুদ্ধে। তারমধ্যে ঢাকার মতিঝিল, পল্টন ও যাত্রাবাড়ী থানায় ১৪টি মামলা হয়। তাছাড়া চট্টগ্রামে ১১টি, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পুলিশ বাদী হয়ে সদর থানায় ১২টি, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে ৩৭টি, সরাইল থানা পুলিশ বাদী হয়ে ২টি, আশুগঞ্জ থানা পুলিশ বাদী হয়ে ১টি, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে ৩টি ও আখাউড়া রেলওয়ে পুলিশ ১টি, নারায়ণগঞ্জে ৮টি, মুন্সীগঞ্জে ১০টি, কিশোরগঞ্জে ৪টি মামলা দায়ের করা হয়।
সংশ্লিষ্টরা জানায়, ২০১৩ সালে শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন চলাকালে কথিত নাস্তিক ব্লগারদের শাস্তিসহ ১৩ দফা দাবিতে সক্রিয় হয় হেফাজতে ইসলাম। ওই বছরের ৫ মে ঢাকার ৬টি প্রবেশমুখে অবরোধ করে। একপর্যায়ে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে অবস্থান নেয় তারা। এ সময় হেফাজতের বিপুলসংখ্যক কর্মী-সমর্থক বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে যানবাহন ভাঙচুর করে এবং বিভিন্ন স্থাপনায় অগ্নিসংযোগ করা হয়। এসব সহিংসতায় হতাহতের ঘটনা ঘটে। আবার ২০২১ সালে মার্চ মাসে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশ সফরে আসেন। এই সময় তার সফরের বিরোধিতা করে মাঠে নামে হেফাজতে ইসলাম। ২৬ মার্চ বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ এলাকায় বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ ও পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ হয়। একপর্যায়ে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চট্টগ্রামের হাটহাজারী, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, কিশোরগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে। সংঘর্ষে ১৯ জনের মৃত্যু ও পুলিশসহ সহস্রাধিক নেতাকর্মী আহত হন। হামলা-ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ করা হয় সরকারি-বেসরকারি স্থাপনায়। এসব ঘটনায় সারা দেশে ১৫৪টি মামলা দায়ের করা হয়। তবে কোনো মামলারই তদন্তের পাশাপাশি অভিযোগপত্রই দেওয়া হয়নি। শাপলা চত্বরের ঘটনাও হতাহতের ঘটনা ঘটে। কতজন মারা গেছে সেই পরিসংখ্যান উদঘাটনের চেষ্টা চলছে।
ডিএমপির মতিঝিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মেজবাহ উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, হেফাজতে ইসলামের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে হওয়া মামলাগুলোর মধ্যে মাত্র একটি আমার থানায় আছে। অন্য সব মামলা বিভিন্ন সংস্থার কাছে চলে গেছে। আমাদের কাছে থাকা মামলাটি তদন্ত কওে শেষ করব।
যাত্রাবাড়ী থানার হওয়া মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলেন, মামলাগুলো তদন্ত চলমান আছে। এই মামলার বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে কোনো ধরনের নির্দেশনা এখনো আসেনি।
সংগঠনটির প্রচার সম্পাদক মুফতি কেফায়েত আযহারী দেশ রূপান্তরকে বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করেছে। তারা জিম্মি করে রেখেছিল আমাদের। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করা হয়। তারা দ্রুত সময়ের মধ্যে মামলা প্রত্যাহার করার আশ্বাস দিয়েও তা করেনি। আমাদের নামে মিথ্যা মামলা দিয়েছে আওয়ামী লীগ সরকার।
তিনি আরও বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার আমাদের আশ্বাস দিয়েছে মামলাগুলো সুরাহা করবে। আশা করি, তাড়াতাড়ি মামলাগুলা মীমাংসা কওে দেবে সরকার। গত ২৬ নভেম্বর রাজধানীর শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে হত্যার ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক পুলিশ প্রধান বেনজীর আহমেদ, সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদ, শেখ হাসিনার সাবেক প্রতিরক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিকীসহ ৫০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করা হয়।