পোটনের পেটে বিএডিসির দুই লাখ টন সার

নরসিংদী-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য কামরুল আশরাফ খান পোটনের বিরুদ্ধে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পোটন ট্রেডার্সের মাধ্যমে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) এক লাখ ৮৪ হাজার মেট্রিক টন সার আত্মসাতের প্রমাণ মিলেছে। এ পরিমাণ সারের মূল্য এক হাজার ৮৪ কোটি টাকার বেশি। তার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ  কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের ৫৮২ কোটি টাকা মূল্যের ৭২ হাজার টন সার আত্মসাতের অভিযোগের প্রমাণও পাওয়া গেছে।

দুদক সূত্রে জানা গেছে, বিএডিসির সার আত্মসাতের বিষয়টি দুদকের তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে। সংস্থাটি পোটনের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

জানা গেছে, ২০২১-২০২২ অর্থবছরে জি টু জি চুক্তির আওতায় বেলারুশ, কানাডা, রাশিয়া ও মরক্কো থেকে ৮টি লটে এমওপি, টিএসপি এবং ডিএপি সার আমদানি করা হয়। এ সার চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর থেকে খালাস করা হয়। খালাসকৃত সার তাদের বিভিন্ন গুদামে সরবরাহের জন্য মেসার্স পোটন ট্রেডার্সের সঙ্গে চুক্তি করে বিএডিসি। পরিবহন ঠিকাদার হিসেবে বিএডিসিতে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে সরবরাহের কাজ পায় পোটন ট্রেডার্স, যার স্বত্বাধিকারী কামরুল আশরাফ খান পোটন।

চুক্তি অনুসারে উভয় বন্দর থেকে সব সার নির্ধারিত তারিখের মধ্যে বিএডিসির গুদামে সরবরাহ করার বাধ্যবাধকতা ছিল মেসার্স পোটন ট্রেডার্সের। কিন্তু মেসার্স পোটন ট্রেডার্স অধিকাংশ সার বিএডিসির গুদামে সরবরাহ করলেও ৮টি লটের ১ লাখ ৮৪ হাজার ৭১ মে.টন সার সরবরাহ না করে আত্মসাৎ করেছে। আনুষঙ্গিক খরচসহ এ পরিমাণ সারের আমদানি মূল্য ১ হাজার ৮৪ কোটি টাকার বেশি।

২০২২ সালের নভেম্বরে মেসার্স পোটন ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী পোটন ও তার কর্মচারীর সার আত্মসাৎ করার বিষয়ে তদন্ত করার জন্য বিএডিসির তৎকালীন সার ব্যবস্থাপনা বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মো. মোজাম্মেল হককে আহ্বায়ক করে ৫ সদস্যের একটি কমিটি করা হয়।

বিএডিসি সূত্রে জানা গেছে, ক্ষমতাধর পোটনের চাপে কমিটি ঠিকভাবে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছিল না।

পরে ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে বিএডিসির তৎকালীন সদস্য পরিচালক মো. মোস্তাফিজুর রহমানকে আহ্বায়ক করে তদন্ত কমিটি পুনর্গঠন করা হয়। এ কমিটি ফেব্রুয়ারির ২৬ তারিখে বিএডিসির চেয়াম্যানের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। তাতে দেখা যায়, মেসার্স পোটন ট্রেডার্স আমদানি করা ৮টি লটের সারের মধ্যে ১৩৪৬৮৯.৮০০ মে.টন এমওপি, ২০,৯৮০.৪০০ মে.টন টিএসপি এবং ২৮,৪০১.৬০০ মে.টন ডিএপি সার বিএডিসির গুদামে পৌঁছে দেয়নি, যার মূল্য এক হাজার ৮৪ কোটি টাকার বেশি। আত্মসাতের জন্য মেসার্স পোটন ট্রেডার্সই দায়ী।

দুদক বলছে, পোটন ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী কামরুল আশরাফ খান পোটন আমদানিকৃত এমওপি, টিএসপি ও ডিএপি সার সরবরাহের চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করেছেন। বরাদ্দকৃত সার সরবরাহ না করে পোটন ট্রেডার্সের মহাব্যবস্থাপক মো. শাহাদত হোসেন (নিপু), মহাব্যবস্থাপক মো. নাজমুল আলম (বাদল), উত্তরবঙ্গ প্রতিনিধি মো. সোহরাব হোসেন, খুলনা ও নওয়াপাড়া প্রতিনিধি মো. আতাউর রহমানের সহযোগিতায় আত্মসাৎ করেছেন পোটন।

আত্মসাতের ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর বিএডিসিকে নানাভাবে ম্যানেজ করার চেষ্টা করেন পোটন। বিএডিসিকে তিনি জানান, সারগুলো ট্রানজিটে রয়েছে। পোটন জালিয়াতি ও প্রতারণার মাধ্যমে সরকারি সার লুট করে দ-বিধির ৪০৯/৪২০/১০৯ ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন বলে দুদকের তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে।

পারস্পরিক সহযোগিতায় অবৈধভাবে লাভবান হওয়ার উদ্দেশ্যে অন্যত্র সরকারি সার বিক্রি করে দেন পোটন ও পোটন ট্রেডার্সের কর্মকর্তারা। অথচ তারা মিথ্যা তথ্য দিয়ে বিএডিসিকে জানান, সার ট্রানজিটে রয়েছে। এতে করে দন্ডবিধির ৪০৯/৪২০/১০৯ ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন পোটন ট্রেডার্সের কর্ণধার। উল্লিখিত ধারায় মামলা করতে যাচ্ছে দুদক।

পোটন ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী কামরুল আশরাফ খান পোটন এবং তার সহযোগী ৪ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা এজাহার দায়ের করা হয়েছে।

দুদকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, ‘তদন্ত কার্যক্রমে পোটন ও তার মালিকানাধীন পোটন ট্রেডার্সের ৪ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। দ্রুতই তাদের নামে মামলা করা হবে।’

সরকারের সার আত্মসাতের ঘটনা পোটনের জন্য নতুন নয়। এর আগে একইভাবে বিসিআইসির ৫৮২ কোটি টাকা মূল্যের ৭২ হাজার মে.টন ইউরিয়া সার আত্মসাৎ করেছেন পোটন। কয়েক দফায় ইউরিয়া সার ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েও তা দিতে পারেননি। বরং সার ফেরত চাওয়ায় বিসিআইসির বিরুদ্ধেই বেশ কয়েকটি মামলা করেছিলেন পোটন, যদিও মামলা টেকাতে পারেননি তিনি। দুদকের মামলায় গত বছরের মাঝামাঝি পোটনকে কারাগারে পাঠিয়েছিল আদালত। গত বছরেরই ৬ ডিসেম্বর আদালত থেকে জামিন পান তিনি।

তবে দুদক বিসিআইসির সার আত্মসাতের ঘটনার মামলার চার্জশিট চূড়ান্ত করেছে। প্রধান আসামি পোটন। বিসিআইসিও ১১৬৩ কোটি ১৬ লাখ টাকার ক্ষতিপূরণ মামলা দায়ের করেছে পোটন ট্রেডার্সের বিরুদ্ধে। ২০২৩ সালে মামলাটি দায়ের করা হয়।

বিসিআইসির তথ্য বলছে, মেসার্স পোটন ট্রেডার্স সবচেয়ে বেশি পরিমাণ সার পরিবহনের দায়িত্বে থাকায় প্রতিষ্ঠানটির কাছে সবসময়ই ট্রানজিটে সার থাকত। তবে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণের সার তারা কখনোই সরবরাহ করত না।

দেশে সারের সংকট তৈরি হলেও প্রতিষ্ঠানটিকে বারবার তাগাদা দিয়েও ট্রানজিটে থাকা সারগুলো আদায় করতে পারেনি বিসিআইসি। যেমন ২০২০ সালের জুনে ৮৮৬৮৮.২০ মে.টন এবং ২০২১ সালের জুনে ৭১১৬১ মে.টন সার ট্রানজিটে ছিল। তাগাদা দিয়েও তা আদায় করা যায়নি, এ কারণে বিসিআইসির সন্দেহ হয়। পরে তদন্তে জানা যায়, প্রতিষ্ঠানটি ৭২ হাজার মে.টন সার আত্মসাৎ করেছে।

কামরুল আশরাফ খান পোটন ২০১৪ সালে নরসিংদী-২ আসনে জাসদের প্রার্থী জায়েদুল কবিরকে হারিয়ে সংসদ সদস্য হন। জায়েদুল মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করেন। কামরুল আশরাফ খানও আওয়ামী লীগের রাজনীতি করেন। ২০১৮-এর নির্বাচনে পোটনের ভাই আনোয়ারুল আশরাফ খান আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন।

পোটন দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশন (বিএফএ)-এর সভাপতি ছিলেন। বিসিআইসির সার আত্মসাতের ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

সার আত্মসাতের বিষয়ে মুঠোফোনে চেষ্টা করেও পোটনের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।