বাংলাদেশের শঙ্কা অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও কূটনীতিতে

ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সাম্প্রতিক উত্তেজনা যুদ্ধের দিকেই এগোচ্ছে। দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে পূর্ণমাত্রার সংঘর্ষের আশঙ্কায় বাংলাদেশেও শুরু হয়েছে নানা আলোচনা। বিশ্লেষকরা বলছেন, সরাসরি যুদ্ধে না জড়ালেও এর বহুমুখী প্রভাব বাংলাদেশে পড়তে পারে। বিশেষ করে বাংলাদেশের অর্থনীতি, কূটনীতি, নিরাপত্তা এবং অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার ওপরও তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক, কূটনীতিক ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ হলে পুরো এশিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তবে বাংলাদেশে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বেশি। রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিক সংকট তৈরি হবে। চাপে পড়বে অর্থনীতিও। দুই পক্ষ থেকেই বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট করার চাপ আসবে।

সরকারের অবস্থান : এরই মধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ভারত পাকিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতি বাংলাদেশ পর্যবেক্ষণ করবে। গতকাল বুধবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়, বাংলাদেশ সরকার ভারত ও পাকিস্তানের উদ্ভূত পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। বাংলাদেশ এ পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছে এবং উভয় দেশকে শান্ত থাকার, সংযম প্রদর্শনের এবং এমন কোনো পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানাচ্ছে যা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করতে পারে। আঞ্চলিক শান্তি, সমৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতার চেতনায় বাংলাদেশ আশাবাদী যে কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে উত্তেজনা প্রশমিত হবে এবং এ অঞ্চলের জনগণের কল্যাণে শান্তি ফিরে আসবে।

ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ হলে তা বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি আঞ্চলিক উত্তেজনাই নয়, বরং একটি বহুমুখী সংকটের কারণ হয়ে উঠতে পারে। বাংলাদেশকে এখনই প্রস্তুতি নিতে হবেÑ সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার, বিকল্প আমদানি উৎস খোঁজা, জ্বালানি মজুদ, কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা এবং জনসচেতনতা বাড়ানো এই ছয়টি খাতে জরুরি পরিকল্পনা গ্রহণ না করলে পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে উঠতে পারে।

সীমান্ত ও নিরাপত্তা ঝুঁকি : যুদ্ধের পরিস্থিতিতে ভারত তার পূর্ব সীমান্তে নিরাপত্তা বাড়াতে পারে। এতে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে চলাচলে কড়াকড়ি আরোপ হতে পারে, বিশেষ করে মেঘালয়, আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ সংলগ্ন এলাকাগুলোতে। বিজিবি-বিএসএফের নজরদারি বৃদ্ধির ফলে সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে জনজীবন ব্যাহত হতে পারে।

আন্তর্জাতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) ড. মনিরুল ইসলাম আকন্দ বলেন, ভারত-পাকিস্তান যতটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে তারচেয়েও আমরা যারা তাদের প্রতিবেশী হয়ে আছি বা সারা বিশ্বে এর প্রভাব পড়বে। এটা আমাদের অর্থনীতির ওপর বিশাল প্রভাব ফেলবে। দ্রব্যমূল্যে বেড়ে যাবে।

এ মুহূর্তে সামরিক ঝুঁকিতে না থাকলেও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে অভিমত তার। তবে পরিস্থিতির অবনতি হলে নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়বে দেশ।

অর্থনৈতিক অভিঘাত : বাংলাদেশ-ভারতের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার। যুদ্ধ শুরু হলে এ বাণিজ্য চরমভাবে বিঘ্নিত হবে। বিশেষ করে ওষুধ, কাঁচামাল ও কৃষিপণ্য আমদানিতে বড় ধাক্কা আসবে।

রপ্তানি শঙ্কা : ভারত হয়ে বাংলাদেশ-ভুটান ও বাংলাদেশ-নেপাল ট্রানজিট ব্যবস্থাও ঝুঁকিতে পড়বে।

রেমিট্যান্স ঝুঁকি : মধ্যপ্রাচ্যে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে প্রবাসীদের আয় হ্রাস পেলে রেমিট্যান্সে প্রভাব পড়তে পারে।

জ্বালানি সংকট ও মূল্যস্ফীতি : যুদ্ধ শুরু হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে যেতে পারে। এতে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বাড়বে, পরিবহন খরচ বাড়বে এবং সাধারণ মানুষের ওপর দ্রব্যমূল্যের চাপে বাড়তি বোঝা তৈরি হবে।

শরণার্থী সংকটের আশঙ্কা : ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বিশেষ করে আসাম ও পশ্চিমবঙ্গে বসবাসরত মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়তে পারে। এর ফলে সীমান্ত দিয়ে অনুপ্রবেশের আশঙ্কা থেকে যায়। ১৯৭১ সালের অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে বাংলাদেশকে মানবিক ও নিরাপত্তা দুই দিকেই প্রস্তুত থাকতে হবে।

কূটনৈতিক চাপ ও নীতিগত ভারসাম্য : ভারত ও পাকিস্তান উভয়েই চাইবে বাংলাদেশ তাদের পক্ষে অবস্থান নিক বা কমপক্ষে নিরপেক্ষ থাকুক। এক্ষেত্রে চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও মুসলিম বিশ্ব সব দিক থেকেই বাংলাদেশকে কূটনৈতিক চাপ সামলাতে হতে পারে। বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের উচিত হবে নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রেখে আঞ্চলিক শান্তির পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা পালন করা। জাতিসংঘ বা সার্কের মাধ্যমে শান্তি উদ্যোগে অংশগ্রহণ কূটনৈতিকভাবে লাভজনক হতে পারে।

বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজার : যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ এশিয়ার ঝুঁকি বাড়বে যার ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশের শেয়ারবাজার থেকেও সরে যেতে পারেন। ডলার সংকট, রপ্তানি হ্রাস ও আমদানি বিল বাড়লে দেশের অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়বে। গতকালই বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে দিল্লি-ইসলামাবাদ পরিস্থিতির নেতিবাচক প্রভাব লক্ষ করা গেছে।

শেয়ারবাজারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, পাকিস্তানে ভারত হামলা চালানোর ঘটনায় দেশের শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। এই আতঙ্কের কারণেই লেনদেনের শুরুতে শেয়ারবাজারে বড় দরপতন দেখা যাচ্ছে।

ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সাবেক সভাপতি ও ডিএসইর পরিচালক রিচার্ড ডি রোজারিও বলেন, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সৃষ্টি হওয়া পরিস্থিতির কারণে শেয়ারবাজারে এমন দরপতন দেখা দিয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, আমাদের শেয়ারবাজার এমনিতেই এখন বটম লাইনে রয়েছে। এখান থেকে বাজার খুব নিচে নামার সম্ভাবনা কম। আশা করছি, বাজার ঘুরে দাঁড়াবে।’

সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া : যুদ্ধ পরিস্থিতি ঘিরে সামাজিক মাধ্যমে বিভ্রান্তিমূলক প্রচার, গুজব ও আবেগের বন্যা বইতে পারে। ভারত-বিরোধী বা পাকিস্তানপন্থি প্রচার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। রাজনৈতিক দলগুলোও বিষয়টিকে নিজ নিজ স্বার্থে ব্যবহার করতে পারে, যা অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলবে।

ঢাকাগামী তিন ফ্লাইটের রুট পরিবর্তন : ভারত-পাকিস্তান সীমান্তে মঙ্গলবার দিবাগত মধ্যরাতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে বাংলাদেশগামী তিনটি ফ্লাইট তাদের নির্ধারিত রুট পরিবর্তন করেছে। তিনটি ফ্লাইটেরই পাকিস্তানের আকাশপথ দিয়ে ভারত হয়ে বাংলাদেশে আসার কথা ছিল। ফ্লাইট তিনটি হচ্ছে তুরস্ক থেকে আগত টার্কিশ এয়ারলাইনস (টিকে-৭১২) এবং কুয়েত সিটি থেকে ঢাকাগামী জাজিরা এয়ারওয়েজের দুটি ফ্লাইট জে৯-৫৩১ এবং জে৯-৫৩৩।

শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন কামরুল ইসলাম বলেন, ভারত-পাকিস্তান আকাশপথ বর্তমানে অনিরাপদ বিবেচিত হওয়ায় বাংলাদেশগামী তিনটি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট তাদের রুট পরিবর্তন করেছে। তুরস্ক থেকে ঢাকাগামী ফ্লাইটটি পাকিস্তানের আকাশপথ এড়িয়ে ওমানের মাসকাট আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। জাজিরার জে৯-৫৩১ ফ্লাইটটি ঢাকায় না এসে দুবাইয়ে অবতরণ করে। অপর ফ্লাইট জে৯-৫৩৩ কুয়েত থেকে উড্ডয়নের পর কুয়েতে ফিরে যায়।

কামরুল ইসলাম বলেন, আজ সকাল থেকে স্বাভাবিকভাবেই ডাইভার্টেড ফ্লাইটগুলো ঢাকায় পৌঁছাতে শুরু করেছে।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, আমাদের আশা থাকবে যে, বড় আকারে যুদ্ধে তারা যেন না যায়। বড় আকারে যুদ্ধ গেলে যে সাপ্লাই লাইনগুলো আছে, সেগুলো আরও ব্যাহত হবে। সাপ্লাই (সি লাইন) লাইনগুলো যদি ব্যাহত হয় তাহলে আরও বড় ক্ষতি হবে। আমাদের পক্ষ থেকে আশা থাকবে, তারা যেন শান্তির পথ বেছে নেয়। তারা কূটনৈতিক আলোচনার মধ্যে যেন যায়।

অধ্যাপক আমেনা মহসিন ভারত-পাকিস্তানের উত্তেজনার প্রভাব পুরো দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে পড়বে উল্লেখ করে বলেন, আমরা আন্তঃসংযোগের কথা বলছি, সার্কের কথা বলছি। এই উত্তেজনার কারণে তো এখন এসব বিষয় আড়ালে চলে যাবে। এটা একটা বড় ব্যাপার। আবার যেসব গোষ্ঠী এই ধরনের হামলা চালায়, তাদের তো নির্দিষ্ট কোনো বাউন্ডারি বা বর্ডার থাকে না। তাই আমাদেরও সতর্ক হতে হবে।

বাংলাদেশ সম্পর্কে ভারতের নেতিবাচক প্রচারণার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনা সাম্প্রদায়িক রূপ নেওয়ার ব্যাপারটিও আছে। গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ভারতে বাংলাদেশ সম্পর্কে এক ধরনের নেতিবাচক প্রচারণার বিষয় লক্ষ করা গেছে। এখন এই উত্তেজনা ঘিরে সেটা আরও বাড়তে পারে।