আকস্মিকভাবে যুদ্ধে জড়িয়েছে বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিবেশী ভারত ও পাকিস্তান। দুই পরমাণু শক্তিধর দেশের মধ্যে এই যুদ্ধ কতদিন স্থায়ী হবে তা অনিশ্চিত। দেশ দুটির সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য রয়েছে। ভারত বাংলাদেশের দ্বিতীয় প্রধান আমদানির উৎস। পাকিস্তানের সঙ্গেও সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের বাণিজ্যের অংশীদারত্ব বাড়ছে। দেশটির অনেক উদ্যোক্তা বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেছে। এমন অবস্থায় দুই প্রতিবেশীর মধ্যে যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও বাণিজ্যের ওপর তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করেন দেশের বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীরা। গতকাল একান্ত আলাপচারিতায় তারা দেশ রূপান্তরকে এ আশঙ্কার কথা জানান।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে আশপাশের সব দেশেই তার প্রভাব পড়বে। এরই মধ্যে দুই দেশ তাদের আকাশসীমা বন্ধ করে দিয়েছে। দেশ দুটির সমুদ্রসীমা ব্যবহারও সংকুচিত হয়ে পড়বে। এর ফলে সমুদ্র পথে বাংলাদেশের পণ্য পরিবহনে ব্যয় বাড়বে।
তিনি বলেন, ‘ভারত থেকে বাংলাদেশ ১০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি মূল্যের পণ্য আমদানি করে। যুদ্ধ চলতে থাকলে ভারত রপ্তানি কমিয়ে পণ্য মজুদের দিকে ধাবিত হতে পারে। ফলে যেসব নিত্যপণ্য ভারত থেকে আমদানি করা হয়, বাংলাদেশে সেগুলোর সংকট দেখা দিতে পারে।
এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘যুদ্ধের সময় সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মনোযোগ যুদ্ধের দিকেই নিবদ্ধ হয়। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে গুরুত্ব কমে যায়। বাংলাদেশ ভারত ও পাকিস্তান উভয়েরই বাণিজ্যিক অংশীদার। যুদ্ধ প্রলম্বিত হলে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও বাণিজ্য ক্ষতির মুখে পড়বে। কাজেই যুদ্ধ যত দ্রুত নিষ্পত্তি হয়, ততই মঙ্গল।’
এ যুদ্ধের ফলে সীমান্ত বাণিজ্যে বড় সমস্যা দেখা দেবে বলে মনে করেন বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যুদ্ধ যেকোনো দেশ ও অঞ্চলের জন্যই ক্ষতিকর। ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে যে অবস্থা শুরু হয়েছে, তাতে দুই দেশই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা ও অন্য প্রতিবেশী দেশগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’
তিনি বলেন, ‘ভারত থেকে আমাদের ডাইস কেমিক্যাল আসে এবং অনেক আনুষঙ্গিকও আসে। এ ক্ষেত্রে বাণিজ্যে কিছু সমস্যা হতে পারে। তবে সীমান্ত বাণিজ্যে বড় সমস্যা হবে। কারণ যুদ্ধে যেকোনো দেশ তার প্রতিবেশী দেশের সীমান্তে কড়াকড়ি আরোপ করে। এ ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম হবে না। তখন আমাদের নিত্যপণ্যের বাণিজ্যে ও সীমান্ত বাণিজ্যে অসুবিধা হতে পারে। শিল্প বাণিজ্যে তেমন সমস্যা না হওয়ার কারণ হলো বেশিরভাগ পণ্যই নদীপথে আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় হয়ে থাকে। বিশেষ প্রয়োজনে বিমানের মাধ্যমে আমদানি করা সম্ভব।’
ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি ও ইটিবিএল সিকিউরিটি অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রিজওয়ান রাহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রতিবেশীর সমস্যায় অন্য প্রতিবেশীর কল্যাণ হয় না। ভারত আমাদের বড় প্রতিবেশী এবং পাকিস্তান ভারতের প্রতিবেশী; সার্ক রাষ্ট্রগুলো সবাই সবার সঙ্গে সম্পর্কিত। এখন যুদ্ধের যে আয়োজন চলছে তাতে দুই দেশই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ তারা উভয়েই পারমাণবিক শক্তিধর দেশ। পাশাপাশি এ অঞ্চলে পরাশক্তি চীন-রাশিয়া, উত্তর কোরিয়া-ইসরায়েল পারমাণবিক শক্তির ধারক। ভারত-পাকিস্তান সংঘাত দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় বড় ধরনের সমস্য তৈরি করবে, যা অর্থনীতিতে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। সেজন্য আমাদের সরকারকে সতর্ক অবস্থায় থেকে কূটনৈতিকভাবে এর প্রভাব মোকাবিলা করতে হবে। রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে কোনো পদক্ষেপ নিলে সেটি হবে বড় ধরনের ভুল। ভারত-পাকিস্তানের সমস্যা এক দিনের নয়। জন্মলগ্ন থেকে দুটি দেশেই ধর্ম ও অঞ্চল নিয়ে বিরোধ লেগে আছে।’
তিনি বলেন, ‘তাহলে সমাধান কীভাবে হবে? জাতিসংঘ এখন একটি অকার্যকর সংস্থা। সংস্থাটির আদেশ-নিষেধে কেউ তেমন গুরুত্ব দেয় না। বর্তমানে কমপক্ষে ৫৭টি দেশে যুদ্ধ বা গৃহযুদ্ধ চলছে। সেসব ক্ষেত্রে জাতিসংঘ ভূমিকা রাখতে পারছে না। ভারত-পাকিস্তান ইস্যুতে জাতিসংঘের থেকে ভালো ভূমিকা রাখতে পারবে দুই দেশের জনগণ। আন্তর্জাতিক পরিম-লের সহায়তায় সার্কভুক্ত সব দেশ যৌথভাবে কূটনৈতিক পদক্ষেপের মাধ্যমে এ সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নিতে পারে।’