বাংলা সাহিত্যে শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় এক বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছেন। গোয়েন্দা গল্পের লেখক হিসেবে তিনি সমধিক জনপ্রিয় হলেও কথাসাহিত্যিকের প্রায় সব শাখায় তার বিচরণ ছিল। শৈশব পেরিয়ে যারা কৈশোরে অবতীর্ণ হয়েছে তারাই ছিলেন তার শিশুসাহিত্যের পাঠক। তাদের জন্য লিখেছেন শিহরণ জাগানিয়া সব লেখা। রহস্য, রোমাঞ্চ, ভূত-প্রেত-এলিয়েন, অশরীরী জীব হেন কোনো বিষয় নেই, যা নিয়ে তিনি হাজির হননি তার কল্পনাপ্রিয় কিশোর পাঠকদের সামনে।
তিনি বলতেন, ‘শিশুদের গল্প শোনানো কিন্তু সহজ কাজ নয়। শিশুরা বোঝে কোন গল্পটা ভালো, কোনটা মন্দ। যে গল্প তাদের ভালো লাগে সেটা তারা বারবার শুনতে চায়। গল্পের প্রত্যেকটি কথা তাদের মুখস্থ হয়ে যায়, একটু এদিক-ওদিক হওয়ার জো নেই। যারা গল্প বলেন তাদের খুব সাবধানে বলতে হয়।
গল্প সবাই বলতে পারে না, বিশেষত শিশুদের গল্প। যারা বয়সে বড় হয়েও নিজের শৈশবকাল ভুলে যাননি তারাই শিশুদের গল্প বলতে পারেন। তারা জানেন শিশুর মন কী চায়, কীসে আনন্দ পায়।
শিশুরা যখন একটু বড় হয়ে কৈশোরে পদার্পণ করে তখন আবার তাদের গল্পের চাহিদা বদলে যায়। তখন আর বাঘ-ভালুক, বুদ্ধ-ভুতুম, ব্যঙ্গমা-ব্যঙ্গমীর গল্পে মন ভরে না। জীবনের সঙ্গে পরিচয় শুরু হয়েছে, জীবনের অফুরন্ত সম্ভাবনা চোখের দৃষ্টিকে রঙিন করে তুলেছে। তারা চায় অ্যাডভেঞ্চার, বিজ্ঞান, বিচিত্র কাহিনী, নতুনত্বের স্বাদ, রোমান্সের গল্প। মানুষের মন কত রহস্যময়, কত রোমাঞ্চকর, তাই তারা সারা মন দিয়ে অনুভব করতে চায়।’
এই নতুন মনের খোরাক জোগাতে তিনি ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। গোয়েন্দা গল্প, পুরাণের কাহিনির ভেতর ঘটনা স্থাপন করে পরিবেশন প্রভৃতি কৌশলে তিনি ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে সচেতন করেছেন তার পাঠকদের, সাহিত্যরসে আন্দোলিত করার ব্যাপার তো আছেই। নিটোল গদ্যে পরিবেশন করতেন হাস্যরস, ফলে তার লেখা সহজেই পাঠকের মনকে আকৃষ্ট করত। শিশুদের জন্য নিয়ে লিখেছেন বিচিত্র বিষয়কে আশ্রয় করে। পোষা পশুপাখির মনের ভেতরে ঢুকে তাদের না বলা কথা যেমন কিশোর-কিশোরীদের সামনে হাজির করেছেন তেমনি লিখেছেন ভূত বা শরীরী অস্তিত্ব নেই তাদের রহস্যময় কিন্তু কৌতূহল জাগানিয়া জগৎ নিয়ে। কখন কিশোর চরিত্রকে নায়কোচিত গুণাবলি দিয়ে পরাভূত করেছেন পরাক্রমশালী ডাকাত, দস্যুদের। কিশোর-কিশোরীদের জন্য লিখেছেন বিস্তর। সেগুলো থেকে নির্বাচিত কিছু গল্প নিয়ে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র প্রকাশ করেছে ‘শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের সেরা কিশোর গল্প’। সম্পাদক জাকির তালুকদার এ সংকলনের জন্য মোট আটটি গল্প নির্বাচন করেছেন। গল্পগুলো হলো, পুষি-ভুলোর বনবাস, পরীর চুমু, মোক্তার-ভূত, সাপের হাঁচি, বিনুর জলপানি, জেলারেল ন্যাপলা, স্বামী চপেটানন্দ, ভালুকের বিয়ে।
গৃহকর্তার আচরণে দুঃখ পেয়ে বাড়ির পোষা বিড়াল আর কুকুর ঠিক করল তারা আর সে বাড়িতে থাকবে না। গ্রাম পার হয়ে বিপজ্জনক বনের শুরু। তারা ঠিক করল সেই বনেই চলে যাবে। তারা ভেবেছিল, তাদের হয়তো তাদের জাতভাই অর্থাৎ পশুশ্রেণি সাদরে বরণ করে নেবে। কিন্তু বনে গিয়েও শেষ রক্ষা হলো না। বরং বনের পশুদের কাছ থেকেই পেল নানা বিব্রতকর আচরণ। তারা যেন ফুটন্ত কড়াই থেকে জ¦লন্ত উনুনে পড়ল। কী আর করার, শেষ পর্যন্ত তারা আবার নানা কৌশল করে মনিবের বাড়িতে ফিরে এসে হাঁফ ছাড়ল। আসলে, একবার শিকড় ছাড়া হলে আর সেখানে ফিরে যাওয়া যায় না। জীবনের এই চরম সত্য হাসি-ঠাট্টার মধ্য দিয়ে সুন্দরভাবে তুলে ধরেছে শরদিন্দু।
‘পরীর চুমু’ গল্পটি মঞ্জু নামের একটি ছেলের আর সুধা নামের একটি পরীমেয়ের গল্প। মঞ্জুর বয়স বেশি না। মাত্র ছয় বছর। তার কোনো ভাইবোন ছিল না। একা একা তার ভালো লাগত না। কারও সঙ্গে যে খেলবে সে উপায়ও ছিল না। একদিন তার পরিচয় হয় সুধা নামের একটি পরীমেয়ের সঙ্গে। মাকে ছেড়ে থাকতে পারবে না বলে মঞ্জু পরী হলো না বটে, কিন্তু সুধা ডানা ফেলে মানুষ হয়ে বাস করতে লাগল মঞ্জুর সঙ্গে। কীভাবে সেটা হলো জানতে পড়তে হবে পরীর চুমু গল্পটি।
ছোটরা হয়তো জানে না, কিন্তু বড়রা বিলক্ষণ জানে কাউকে টাকা ধার দিয়ে সেটা আদায় করা কতটা কষ্টকর। তেমনি এক বিপদে পড়েছিল বেণী-মোক্তার। শিবু মোক্তার তার কাছ থেকে পঞ্চাশ টাকা ধার নিয়েছিল। বেঁচে থাকা অবস্থায় সে টাকা দেয়নি। তাই মৃত্যুর পরে ভূত হয়ে নানা কৌশলে সেই টাকা আদায় করার মজার গল্প মোক্তার ভূত।
হাল্কা-পাতলা একটি ছেলে নেপাল। রোগাপাতলা দেখতে বলে সবাই ন্যাপলা বললেও বুদ্ধির জোরে অন্য শক্তপোক্ত ধরাধায়ী করে হয়ে ওঠে জেনারেল ন্যাপলা। অন্য গল্পগুলো সাপের হাঁচি, বিনুর জলপানি, স্বামী চপেটানন্দ, ভালুকের বিয়ে গল্পগুলোও দারুণ মজার। শরদিন্দুর শিশুসাহিত্যের জগতে তোমরা স্বাগতম!