বিপিসির মুনাফা হচ্ছেই তবু কমছে না জ্বালানি তেলের দাম

বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমায় প্রতিদিন ২০ কোটি টাকা মুনাফা করছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। এরপরও দেশে তেলের দাম কমানো হচ্ছে না।

গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর আলোচনা সভায় এ মন্তব্য করেন সংগঠনটির জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম।

তিনি বলেন, ‘বিদ্যুতের অবকাঠামো ও সংযোগে অগ্রগতি হলেও গঠনগত অনেক সমস্যা এখনো রয়ে গেছে। বাংলাদেশে বর্তমানে ৯৮ শতাংশ পরিবারে বিদ্যুৎ সংযোগ রয়েছে। তবে বিদ্যুৎ থাকা মানেই জ্বালানি-সুবিচার নয়। অনেক গ্রামীণ ও নিম্ন আয়ের পরিবার ঘন ঘন লোডশেডিং, ভোল্টেজ সমস্যা ও চড়া মূল্যে বিদ্যুৎ কিনতে বাধ্য হচ্ছে।’

দীর্ঘদিন পর গত ৪ মে সরকারি এলপি গ্যাসের দাম বাড়িয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। এ প্রসঙ্গে শামসুল আলম বলেন, ‘গণশুনানি ছাড়া এলপি গ্যাসের দাম বাড়িয়ে বিইআরসি আইন লঙ্ঘন করেছে। তারা আদালতের আদেশকেও অবমাননা করেছে। কারণ গণশুনানির মাধ্যমে এলপি গ্যাসের দাম নির্ধারণের আদেশ মুনাফা হচ্ছেই, তবু জ্বালানি তেলের দাম কমছে না

হাইকোর্টের। আইন লঙ্ঘন ও কোর্টের অবমাননা করার জন্য আমরা চাই তারা সসম্মানে পদত্যাগ করুক, না হলে সরকার তাদের অপসারণ করুক। না হলে ক্যাব তাদের বিরুদ্ধে আদালতে যাবে।’ বিইআরসি জানিয়েছে, আইন মেনেই তারা সরকারি এলপি গ্যাসের মূল্য নির্ধারণ করেছে।

ক্যাবের ‘জ্বালানি সুবিচারে বাংলাদেশ জ্বালানি রূপান্তর নীতি ২০২৪’ শীর্ষক আলোচনা সভায় শামসুল আলম বলেন, ‘বাংলাদেশে জ্বালানির সুবিচারের সংকট শুধু একটি কারিগরি সমস্যা নয়। এটি অধিকার, সাম্য ও সুশাসন ব্যবস্থাবিষয়ক প্রশ্নও বটে। দুর্নীতি, ব্যয়বহুল সেবা, পরিবেশ ধ্বংস ও বর্জনমূলক নীতি সেসব মানুষকে প্রান্তিক করে দিচ্ছে, যাদের জন্য জ্বালানির উন্নয়ন বা রূপান্তর হওয়া উচিত। নইলে সে রূপান্তর ন্যায্য হয় না, জ্বালানি-সুবিচার ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। ক্যাব চায় ভোক্তাবান্ধব জ্বালানি নীতি তৈরিতে সরকারকে সহায়তা করতে।’

তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি শিল্প প্রতিষ্ঠানের গ্যাসের দাম বাড়ানোর বিষয়ে গণশুনানি করা হয়। সেখানে ক্যাবসহ সব পক্ষ শিল্পে দুই ধরনের দাম নিয়ে আপত্তি তোলে। সবার মত উপেক্ষা করেই নতুন শিল্পে গ্যাসের দাম ৩৩ শতাংশ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। কমিশন কেন জনগণের কথা শুনতে পারে না? নাকি তারা অন্যের ভয়ে জনগণের বিপক্ষে কাজ করে? লুণ্ঠনমূলক ব্যয় বন্ধ করা গেলে দাম কমানোর সুযোগ রয়েছে।’

ক্যাবের পক্ষ থেকে সরকারের উদ্দেশে ছয় দফা দাবি জানিয়ে এ জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘বিগত সরকারের সময়ে কী পরিমাণ লুণ্ঠনমূলক ব্যয় সমন্বয় করা হয়েছে, তা অংশীজনদের নিয়ে চূড়ান্ত করতে হবে। লুণ্ঠনমূলক ব্যয় ও মুনাফা কমিয়ে, সরকারের রাজস্ব কমিয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যহার ও ভর্তুকি কমানোর সুযোগ রয়েছে। জ্বালানি-অপরাধীদের বিচারের জন্য বিইআরসি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের ব্যবস্থা করতে পারে; প্রজাতন্ত্রের কোনো কর্মকর্তা বিইআরসির লাইসেন্সি বোর্ড সদস্য বা পরিচালক হতে পারবেন না। বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতের সব কোম্পানির জন্য মুনাফা সুবিধা নিষিদ্ধ করতে হবে। ক্যাব প্রস্তাবিত জ্বালানি রূপান্তর নীতির ভিত্তিতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে সেবা খাতে রূপান্তর করতে হবে।’

ক্যাবের কো-অর্ডিনেটর প্রকৌশলী শুভ কিবরিয়া বলেন, ‘জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে যাওয়ার নামই জ্বালানি রূপান্তর, নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে জীবাশ্ম জ্বালানির দিকে যাওয়া নয়। আমরা সুন্দর বাসোপযোগিতার জন্য ডার্টি এনার্জি তথা জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে ক্লিন এনার্জি তথা নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে যেতে চাই। কিন্তু সরকারের মধ্যে এ ব্যাপারে সদিচ্ছা লক্ষ করা যাচ্ছে না।’

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন-বাপার সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবির বলেন, ‘স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও জ্বালানি বা পরিবেশের জন্য একটি কাঠামো তৈরি করা সম্ভব হয়নি। এটা অবশ্যই সরকারের  ব্যর্থতা। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিবেশ বা সুন্দরবনের জন্য যে ক্ষতিকর, সে কথা বলে আমরা প্রতিবাদ করেছি। তারপরও পরিবেশের ক্ষতি করা হয়েছে, দুর্নীতির পথ তৈরি করা হয়েছে।’

ক্যাবের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট হুমায়ুন কবীর ভূঁইয়া বলেন, ‘আমলারা পদে থাকা অবস্থায় তোষামোদি করে প্রাইজ পোস্টিং হিসেবে বিইআরসি ও দুদকের চেয়ারম্যান ও কমিশনার হন। দক্ষ ও যোগ্য লোকদের স্থান হয় না। এ কারণে সঠিক সেবা পাওয়া যাচ্ছে না।’

আলোচনায় অংশ নেন ক্যাবের সাংগঠনিক সম্পাদক ড. সৈয়দ মিজানুর রহমান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান, ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ, প্রান্তজনের নির্বাহী পরিচালক তৌহিদুল ইসলাম প্রমুখ।