জনদূরত্ব কমাতে নাগরিক সমাবেশ করবে পুলিশ

পুলিশের সঙ্গে বর্তমানে জনগণের সম্পর্কটা কেমন? জনতার প্রত্যাশা সাধারণত নিরাপত্তা, প্রশাসনিক সেবা, মানবিক সোহার্দ্য। কারণ নাগরিক জীবনযাপনে নিরাপত্তার ভরসা পুলিশ। কিন্তু সবসময় এমনটা ঘটে না। আবার জনসেবার কথা বলা হলেও ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর পুলিশ এখনো কতটা জনসম্পৃক্ত?

তবে জনগণের সঙ্গে দূরত্ব কমাতে আস্থা বাড়াতে আগামী জুলাই মাসে ঢাকায় সব শ্রেণির পেশার নাগরিকদের নিয়ে সমাবেশ করবে পুলিশ। নাগরিকরা পুলিশের কাছে কী চান সেই বিষয়ে মতামত নেওয়া হবে। এতে রিকশাচালকদেরও মতামত নেওয়া হবে। দুদিন আগে পুলিশ সদর দপ্তরে এ-সংক্রান্ত একটি বিশেষ বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে আইজিপিসহ ঊর্ধ্বতনরা উপস্থিত ছিলেন। তাছাড়া অনলাইনে যুক্ত ছিলেন রেঞ্জ ডিআইজি, ইউনিটপ্রধান ও জেলার পুলিশ সুপাররা। ওই বৈঠক থেকেই নাগরিক সমাবেশ করাসহ বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে পুলিশের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে।

বৈঠকসংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পুলিশের সঙ্গে জনগণের কিছুটা দূরত্ব রয়েছে। ফলে নাগরিকদের সঙ্গে বেশি বেশি বৈঠক করলে দূরত্ব অনেকাংশ কমে আসবে। থানায় ভুক্তভোগীরা গেলে তাদের সঙ্গে ভালো আচরণ করা হয় না বলে অভিযোগ আসছে। তাছাড়া ভুক্তভোগীরা পুলিশ কর্মকর্তাদের সরকারি মোবাইল নাম্বারে ফোন করলে তারা রিসিভ করেন না। ফলে এসব সমস্যার অনেকটা সমাধান করবে পুলিশের নাগরিক সমাবেশ।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পুলিশে ব্যাপক অস্থিরতা দেখা দিলেও ধীরে ধীরে তা নিরসন হচ্ছে। ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে পুলিশে। গত ১৬ বছর যেসব পুলিশ কর্মকর্তা অবহেলিত ছিলেন, তাদের পদোন্নতি থেকে শুরু করে ভালো স্থানে পোস্টিং দেওয়া হয়েছে। আইজিপিসহ ঊর্ধ্বতনরা দফায় দফায় বৈঠক করছেন। দিচ্ছেন নানা নির্দেশনা। লোকজনের সঙ্গে পুলিশের সমাবেশ করবে পুলিশ দূরত্ব কমিয়ে আনতে নেওয়া হয়েছে নানা পরিকল্পনা।

সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, বৈঠকে পুলিশ সপ্তাহ নিয়েও আলোচনা হয়েছে। পুলিশের আকর্ষণীয় অনুষ্ঠানটিতে কোনো ভুলত্রুটি ছিল কি না, তা আলোচনার স্থান পায়। পুলিশ কর্মকর্তারা বৈঠকে বলেছেন, অন্যান্য বছরের মতো এবার প্যারেড করতে পারলে ভালো হতো। তবে নতুনভাবে বিশিষ্ট নাগরিকদের সঙ্গে বৈঠক করায় পুলিশের উপকার হয়েছে। তবে নাগরিকদের কেউ কেউ কথা বলতে না পারায় অনেকে ক্ষোভ জানিয়েছেন।

বিশিষ্ট নাগরিকদের মধ্যে সাবেক আইজিপি, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, নানা শ্রেণির-পেশার নাগরিকসহ সমাজের প্রতিনিধিরা কথা বলেছেন। আলোচনায় পুলিশ সংস্কারের নানা দিক নিয়েও কথা হয়েছে। জনগণের সঙ্গে পুলিশের সম্পর্ক কেমন হওয়ার পাশাপাশি পুলিশের বলপ্রয়োগ নিয়ে কথা বলেন।

পুলিশ কর্মকর্তারা আরও বলেছেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পুলিশের সঙ্গে জনগণের কিছুটা দূরত্ব রয়েছে। ফলে নাগরিকদের সঙ্গে বেশি বেশি বৈঠক করলে দূরত্ব অনেকাংশ কমে আসবে। কোনো আন্দোলন হলে বলপ্রয়োগ না করতেও আইজিপির হস্তক্ষেপ কামনা করেন কোনো কোনো কর্মকর্তা। এখনো থানা বা পুলিশের কোনো স্টেশনে ভুক্তভোগীরা গেলে তাদের সঙ্গে ভালো আচরণ করা হয় না বলে অভিযোগ আসছে। তাছাড়া ভুক্তভোগীরা পুলিশ কর্মকর্তাদের সরকারি মোবাইল নাম্বারে ফোন করলে তারা রিসিভ করেন না। পরে আইজিপি বাহারুল আলম দিকনির্দেশনা দেওয়াসহ নানা বিষয়ে কথা বলেন।

বৈঠকে উপস্থিত থাকা পুলিশের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, পুলিশকে আরও শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে হবে। প্রতিটি জেলায় পুলিশ সুপাররা নাগরিক সভা করবেন। ওই সভায় রেঞ্জ ডিআইজিসহ ঊর্ধ্বতনদের উপস্থিত থাকতে হবে। পাশাপাশি মহানগর এলাকায়ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় করতে হবে। ঈদের পর বিশেষ করে জুলাই মাসে ঢাকায় বড় ধরনের নাগরিক সভা করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে। ওই সভায় নানা পেশার লোকজন বক্তব্য রাখবেন। এমনকি রিকশাচালকদেরও মতামত নেওয়া হবে।

তিনি আরও বলেন, জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের ঘটনায় জনগণের সঙ্গে পুলিশের বড় ধরনের দূরত্বের পাশাপাশি আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে, তা পুরোপুরি সত্য। এখনো পুলিশ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে অন্য সদস্যদের বিরুদ্ধে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া, দুর্ব্যবহার করা থেকে শুরু করে নানা অভিযোগ আসছে। আইজিপি এসব নিয়েও কথা বলেন। মিথ্যা মামলা ও নিরীহ লোকজনকে আসামি করা নিয়ে কথা হয় বৈঠকে। আইজিপি পুলিশ কর্তাদের নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, ভুক্তভোগীদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করতে হবে। তাদের আস্থায় নিতে হবে। নাগরিকদের মধ্যে কেউ সমস্যায় পড়লে তাদের সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। মোবাইলে কেউ ফোন করলে তা রেসপন্স করতে হবে। জনতার পুলিশ হতে হবে। জনগণের সঙ্গে পুলিশের যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছিল, তা ঘোচাতে হবে।

পুলিশ সূত্র জানায়, ক্ষমতাধর পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে অনেকে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। আবার কেউ আছেন আত্মগোপনে। পুলিশের শীর্ষ কর্তাসহ এক হাজারজনের বেশির বিরুদ্ধে হত্যাসহ একাধিক মামলা হয়েছে। ইতিমধ্যে সাবেক আইজিপিসহ অর্ধশত কর্তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার গঠন হওয়ার পর শতাধিক পুলিশ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। এমনও ঘটনা ঘটেছে, গত ১৬ বছর ধরে সুযোগ-সুবিধা নিয়েও ভোল্ট পাল্টে পদোন্নতির পাশাপাশি ভালো স্থানে পোস্টিং নিয়েছেন। তারপরও পুলিশে নানা অনিয়ম চলে আসছে। আসামি বা যানবাহন ধরার নামে অর্থ কামাচ্ছেন কতিপয় দুর্নীতিবাজ পুলিশ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে কনস্টেবলরা। আর এসবের কারণে পুলিশে আরও আসছে বড় ধরনের শুদ্ধি অভিযান। যেসব কর্মকর্তা বা সদস্য দুর্নীতিতে জড়িত আছেন নতুন করে তাদের তালিকা করা হয়েছে। বর্তমান আইজিপিসহ ঊর্ধ্বতনরা পুলিশের নানা অপরাধমূলক কর্মকা- লাগাম টানার চেষ্টা চালাচ্ছেন। এ নিয়ে আইজিপি পুলিশ কর্মকর্তাদের নিয়ে বিশেষ বৈঠকও করছেন। বিভিন্ন ইউনিটপ্রধান, রেঞ্জ ডিআইজি, জেলার এসপিদের কাছে বিশেষ বার্তা পাঠানো হচ্ছে। সম্প্রতি একটি গোয়েন্দা সংস্থা গোপন প্রতিবেদন করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়া পুলিশ কর্মকর্তা ও অন্য সদস্যরা ঘাপটি মেরে আছে। নানারকম অপরাধ কর্মকা-ে জড়িয়ে পড়ছে পুলিশের কিছু সদস্য। পেশাদার অপরাধীর মতোই মাদক কারবার, চাঁদাবাজি করছে। যানবাহন থামিয়ে ‘উপরি’ ওঠাচ্ছে। মাঝেমধ্যে ধরা পড়ছে দুই-চারজন, বাকিরা থাকছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। আইজিপি দায়িত্ব নেওয়ার পরই পুলিশ সদস্যদের প্রতি কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, জনগণের পুলিশ হতে হবে। কোনো দুর্নীতি বা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত থাকলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যারা মাদক কারবারে জড়িত বা কারবারিদের সহায়তা করছেন, তাদের কঠোরভাবে দমন করা হবে। পুলিশকে দুর্নীতিমুক্ত, মাদকমুক্ত দেখতে চাই। ফোর্সের ডিসিপ্লিনের ব্যাপারে কঠোর হতে হবে। এ ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ছাড় বা শৈথিল্য দেখানো যাবে না।

কয়েকজন পুলিশ সুপার দেশ রূপান্তরকে বলেন, জেলায় নাগরিক সমাবেশ করার নির্দেশনা পেয়েছি। চলতি মাসে না পারলেও ঈদুল আজহার পর তা করা হবে। জনবান্ধব পুলিশ তৈরি করতে আমরা আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে আসছি। দুর্নীতিবাজ পুলিশ সদস্যদের অপরাধ ঠেকাতে জেলায় বিশেষ টিম গঠন করা হয়েছে। ইতিমধ্যে আমরা কাজ শুরু করেছি।