দেশের আগামীর স্বপ্নের বাস্তবায়ন হবে এই চট্টগ্রামের মাধ্যমেই। ঢাকা দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক রাজধানী হতে পারে, কিন্তু চট্টগ্রাম আমাদের বিজনেস হাব। বাংলাদেশকে আগামীর ম্যানুফ্যাকচারিং হাব করার যে লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে আমরা এগুচ্ছি এতে চট্টগ্রামই হবে মধ্যমনি। আর তা বাস্তবায়ন হবে চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে। আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরের বে টার্মিনাল, লালদিয়া টার্মিনাল ও নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালে তিন বিলিয়ন ডলারের সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ আসছে। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) ও বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন (আশিক চৌধুরী) এমন মন্তব্য করেছেন ।
গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে লালদিয়া টার্মিনাল ও বে টার্মিনাল পরিদর্শনের পর বন্দরের ভেতরে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল এলাকা ঘুরে দেখেন বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান, প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব মোহাম্মদ শফিকুল আলম ও উপ প্রেস সচিব মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ মজুমদারসহ অন্য কর্মকর্তারা। তিনটি স্পট পরিদর্শনের পর পাঁচতারকা হোটেল র্যাডিসনে চট্টগ্রামের এলিট ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠকও করে প্রতিনিধিদল। আর সবশেষ সারা দিনের কর্মযজ্ঞ নিয়ে বিকেলে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেন আশিক চৌধুরী।
আগামীর বন্দরখ্যাত বে টার্মিনাল বিষয়ে আশিক চৌধুরী বলেন, এখানে কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণে পিএসএ সিঙ্গাপুর এবং দুবাইয়ের ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে সরকারের চুক্তি হয়েছে। এই দুটি প্রতিষ্ঠান সরাসরি এক বিলিয়ন করে দুই বিলিয়ন মার্কিন ডলার আমাদের এখানে বিনিয়োগ করবে। এ ছাড়া ব্রেক ওয়াটার ও রেললাইন এবং বিভিন্ন কানেকটিভিটির জন্য অর্থায়ন করছে বিশ্বব্যাংক।
তিনি আরও বলেন, বে টার্মিনালে আরও একটি মাল্টিপারপাস টার্মিনাল নির্মিত হবে। উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে বিদেশি কোনো প্রতিষ্ঠান হয়তো তা নির্মাণের সুযোগ পাবে। এ ছাড়া এ টার্মিনাল এলাকায় আমরা একটি অয়েল ট্যাঙ্কার টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে। মূল কথা বে টার্মিনাল একটি ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্প।
অপরদিকে লালদিয়ার চরে নেদারল্যান্ডের মায়ারসক এপি মুলার টার্মিনাল নির্মাণ করতে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে সরকারের সঙ্গে চুক্তিও হয়েছে। এ বিষয়ে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেন, এপি মুলার এখানে ৮০০ মিলিয়ন ডলার এবং এনসিটি কনটেইনার টার্মিনালে ২০০ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ আসবে।
আশিক চৌধুরী বলেন, তাহলে দেখা যাচ্ছে বে টার্মিনাল, লালদিয়া ও এনসিটিতে তিন বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ আসছে। শুধু বে টার্মিনাল ইস্যুতে প্রায় ২৫ হাজার লোকের কর্মসংস্থান হবে। এই ২৫ হাজারের সঙ্গে নির্ভরশীল সদস্যসহ প্রায় এক লাখ বাড়তি মানুষের আবাস হবে এই নগরে। তাই বাড়তি জনসংখ্যার শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও আবাসন নিয়ে এখনই পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
দেশে বিনিয়োগের প্রধান চ্যালেঞ্জ কি সংবাদকর্মীদের এমন প্রশ্নের জবাবে আশিক চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের কাছে এমনও বিনিয়োগকারী আসছে যারা এক বছরের মধ্যে উৎপাদনে যেতে চায়। কিন্তু এর জন্য যে রেডিমেড জায়গা এবং এর সঙ্গে সব ফ্যাসিলিটি নেই। আর এখানে আমাদের চ্যালেঞ্জ নিহিত। আমরা এসব চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করার চেষ্টা করছি।
এদিকে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায়ও উঠে এসেছে গ্যাসের সংকটের বিষয়টি। অনেক ব্যবসায়ী অভিযোগ করেছেন, গ্যাস না পাওয়ার কারণে রপ্তানিমুখী শিল্প বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সঠিক সময়ে পণ্য সরবরাহ হয় না বলে গার্মেন্টস শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ জন্য বন্দরের কনটেইনার জট কমানোর ওপরও ব্যবসায়ীরা গুরুত্বারোপ করেন।
অপরদিকে ২০৩০ এর মধ্যে সব প্রকল্পকে কার্যকর করতে হবে উল্লেখ করে আশিক চৌধুরী বলেন, বে টার্মিনাল, লালদিয়া ও এনসিটি টার্মিনাল ২০৩০ এর মধ্যে চালু করতে হবে। অন্যথায় আমরা যে স্বপ্ন নিয়ে আগাচ্ছি তা বাস্তবায়ন করা কঠিন হবে। এক সময় আমাদের এখানে ভূমি ছিল না। বিনিয়োগকারীদের ভূমি দিতে পারতাম না। এখন ভূমির সমস্যাটি আমরা সমাধান করেছি। এসব ভূমির সঙ্গে রাস্তার সংযোগ, পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংযোগ দেওয়াই চ্যালেঞ্জ। আর এগুলোর সঙ্গে রয়েছে দক্ষ শ্রমিকের ঘাটতি। চ্যালেঞ্জগুলো কাটিয়ে আমরা সামনে এগিয়ে যেতে চাই।
আশিক চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের মূল নীতি হলো, আমাদের দেশে বিশ্বের সেরা পরিচালিত বন্দর থাকতে হবে। আমাদের তো আসলে ৪৪টা বন্দর করার কোনো সুযোগ নেই। আমাদের হয়তো ৩টা, ৫টা, ৭টা এ কয়টা পোর্টের মধ্যে থাকতে হবে। এগুলো উন্নয়নের মাধ্যমে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।
চট্টগ্রামকে ঘিরে বিশাল সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, চট্টগ্রামে আমরা চাইনিজ ইকোনমিক জোনের ঘোষণা দিয়েছি। আনোয়ারাতে একটা কোরিয়ান ইপিজেড আছে। সেখানে কিছু প্রবলেম ছিল, সেগুলো আমরা সমাধান করেছি। মীরসরাইতে আমাদের ন্যাশনাল ইকোনমিক জোন যেটা আছে, আমরা মনে করছি যে বাংলাদেশে যত ইকোনমিক জোন আছে, তার মধ্যে এটা হচ্ছে ফ্ল্যাগশিপ ইকোনমিক জোন। ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশনের লংটার্ম ভিশন যেটা আমাদের, সেটা কিন্তু পুরোটাই চট্টগ্রামকে ঘিরে।
দিনভর পরিদর্শনে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান, বিভাগীয় কমিশনার ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদসহ সরকারের বিভিন্ন কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন।