যুদ্ধের ভবিষ্যৎ ইসলামাবাদের হাতে!

ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের বৈরিতা একটি বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। গত ২২ এপ্রিল ভারত-শাসিত কাশ্মীরের পেহেলগামে একটি সন্ত্রাসী হামলায় ২৬ জন নিহত হওয়ার পর থেকে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনা ক্রমশ তীব্র হয়েছে। এই হামলার জন্য ভারত পাকিস্তানকে দায়ী করলেও, পাকিস্তান অভিযোগ অস্বীকার করে নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে। গত ৬ মে ভারতের ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর মাধ্যমে পাকিস্তানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর পাকিস্তানের পাল্টা হামলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এই প্রেক্ষাপটে, যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত পাকিস্তানি রাষ্ট্রদূত রিজওয়ান সাইদ শেখের বক্তব্যে জাতীয় নিরাপত্তা পর্ষদ পর্যায়ে যোগাযোগের কথা উঠে এসেছে, যা শান্তির সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।  তবে কয়েক দশকের মধ্যে ভারত ও পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় সংঘাত দেখার পর দুই দেশের সীমান্তবর্তী কোটি কোটি মানুষের মতো অনেকেরই মনে এখন একটা প্রশ্ন এরপর কী ঘটতে পারে? এমন ‘জিজ্ঞাসার’ বিষয়ে বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ বলছে, এরপর কী ঘটবে, তার ‘বেশির ভাগটাই’ নির্ভর করছে ইসলামাবাদের সিদ্ধান্তের ওপর। ভারতের হামলার পর প্রতিশোধ নেওয়ার হুমকি দিলেও পাকিস্তান সীমান্তে গোলাবর্ষণ ছাড়া এখন পর্যন্ত বড় ধরনের সামরিক পদক্ষেপ নেয়নি। তবে বৃহস্পতিবার রাতে ভারত দাবি করেছে, কাশ্মীরের জম্মু ও উদামপুরে এবং পাঞ্জাবে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ ও ড্রোন পাঠিয়ে হামলা চালিয়েছে পাকিস্তান।

সংঘর্ষের পর দুপক্ষই নিজেদের বিভিন্ন পদক্ষেপের ভিত্তিতে বিজয়ী দাবি করেছে। তবে বৈরিতা বাড়ছেই। দুই দেশের মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয় গত মঙ্গলবার মধ্যরাতে। যুদ্ধের দামামা বেজে ওঠার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয় পাকিস্তানে ভারতের আক্রমণে। প্রতিবেশী রাষ্ট্রের নয় স্থানে সুনির্দিষ্ট ‘সন্ত্রাসীদের আস্তানায়’ ভারতের হামলার পর দেশটির বেশ কয়েকটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার দাবি তোলে পাকিস্তান।

হামলার দুই দিন পর পাকিস্তানের দাবি, তারা ভারতের ৫০টির বেশি সামরিক ড্রোনও ভূপাতিত করেছে। তারা এসব ড্রোনকে আখ্যা দিয়েছে ভারতের ‘বিপজ্জনক উসকানি’ হিসেবে।

সার্বিক পরিস্থিতিতে, এখন সবাই একটা ভয়ই পাচ্ছেন। সেটা হলো নতুন করে কোনো ধরনের সংঘর্ষ হলে তা দুই দেশকে সর্বাত্মক যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি নিয়ে কাজ করা মার্কিন বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যান বলছেন, ‘সবার চোখ এখন পাকিস্তানের দিকে। যদি তারা মুখরক্ষার সিদ্ধান্ত নেয় এবং ভারতের বিমান ধ্বংস করার ঘটনায় নিজেদের বিজয়ী দাবির মাধ্যমে এখানেই ইতি টানে, তবে উত্তেজনা প্রশমনের একটা সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।’

তবে সতর্ক করে দিয়ে এই বিশ্লেষক বলেন, ‘যদি পাকিস্তান পাল্টা হামলার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে সব সম্ভাবনাই নস্যাৎ হয়ে যাবে।’

সিএনএন বলছে, বুধবারের হামলার পর ভারতীয় সংবাদমাধ্যম উচ্ছ্বসিত ছিল।

অন্যদিকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ জনসমক্ষে যে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন, সেটাও ‘আক্রমণাত্মক’। ভারতের হামলায় ৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে দাবি করে তিনি ‘প্রতিশোধ’ নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন। তবে ভারতের যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার ঘটনাকে কেন্দ্র করে নিজেদের বিজয়ী ঘোষণা করেন তিনি। জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেন, ‘শত্রুকে মাথা নত করাতে মাত্র কয়েক ঘণ্টা লেগেছে।’

ভারত বলছে, তারা ইসলামপন্থি দুটি গোষ্ঠী লস্কর-ই- তৈয়্যবা ও জইশ-ই-মুহাম্মদের অবকাঠামোতে হামলা চালিয়েছে। গোষ্ঠী দুটির বিরুদ্ধে ভারতে প্রাণঘাতী কিছু জঙ্গি হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।

নয়াদিল্লির দাবি, মঙ্গলবার রাতের হামলায় পাকিস্তানের কোনো সামরিক অবকাঠামো নিশানা করা হয়নি এবং কোনো বেসমারিক লোকের মৃত্যু হয়নি। সেদিন রাতে পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের একটি লক্ষ্যবস্তুতেও আঘাত হানে ভারত। দুই দেশের ১৯৭১ সালের যুদ্ধের পর এটি ছিল পাকিস্তানের সবচেয়ে বেশি ভেতরে হামলার ঘটনা।

বেশির ভাগ বিশ্লেষক মনে করেন, পারমাণবিক অস্ত্রধারী দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্র আরেকটি সর্বাত্মক যুদ্ধের ভার বইতে পারবে না। এরই মধ্যে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইশাক দারের বরাতে দেশটির সংবাদমাধ্যম ডন জানিয়েছে, দুই দেশের নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের মধ্যে যোগাযোগ হয়েছে। দুই দেশের মহাপরিচালকদের মধ্যে একটি হটলাইন চালু হওয়ার তথ্যও দিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

কাশ্মীর নিয়ে ভারত ও পাকিস্তান এরইমধ্যে তিনবার যুদ্ধে জড়িয়েছে। আরেকটি যুদ্ধ ধ্বংসাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে। সামরিক কিংবা অর্থনৈতিক দিক ভারতকে তুলনামূলক বেশি শক্তিশালী ধরা হয়। তবে যুদ্ধে জড়ালে ভারতকেও ‘কিছু না কিছু’ হারাতে হতে পারে বলে মনে করেন ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের ফরেন পলিসি প্রোগ্রামের জ্যেষ্ঠ গবেষক তানভি মদন। তিনি বলেন, আগের ঘটনাগুলোর আলোকে এটা বলা যায়, শেষমেশ দুই দেশই যুক্তিবাদী, যারা সর্বাত্মক যুদ্ধে জড়াতে চায় না।

আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেদের ভাবমূর্তি বাড়াতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বদ্ধপরিকর, যিনি ভারতে অলিম্পিক আয়োজনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন এবং চীনকে টপকে উৎপাদনের বৈশ্বিক কেন্দ্রবিন্দুতে পৌঁছাতে চান।

সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় দুই দেশ সর্বাত্মক যুদ্ধে না জড়ালে তাতে ‘অবাক হওয়ার’ কিছু দেখছেন না বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) সাবেক চেয়ারম্যান মুন্সি ফয়েজ।

সাবেক এ রাষ্ট্রদূত বুধবার বলেন, ‘ভারত বলেছে যে, তারা পাকিস্তানি কোনো সামরিক ঘাঁটি বা সামরিক স্থাপনায় আক্রমণ করেনি। তারা আক্রমণ করেছে সন্দেহভাজন সন্ত্রাসী স্থাপনাগুলোতে। তারা “উচিত শিক্ষা দিয়েছে”- এমন একটা কথা বলছে।’

‘আর পাকিস্তানের দিক থেকে হলো, তারা ভারতের কয়েকটি বিমান ভূপাতিত করেছে বলে আমরা খবর পাচ্ছি, দেখছি। সুতরাং দুপক্ষই কিছু বলার সুযোগ পাচ্ছে তাদের দেশের মানুষকে। একজন বলল, আমরা উচিত শিক্ষা দিয়ে দিয়েছি, আরেকপক্ষও বলছে, আমরা উচিত জবাব দিয়েছি।’ এখন দুপক্ষ এখান থেকে যুদ্ধের দিকে পা না বাড়িয়ে সরে এলে ‘আশ্চর্য হব না’ মন্তব্য করেন তিনি।

মঙ্গলবার রাতে পাকিস্তানে হামলার পর ভারত তাৎক্ষণিক একটা বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করে। সেটা হলো তারা পেহেলগাম হত্যার প্রতিশোধ নিতেই হামলাটি চালিয়েছে। তারা হামলায় ‘সংযম’ দেখিয়েছে এবং কোনো উত্তেজনা তৈরি করেনি।

দিল্লির শীর্ষ কর্মকর্তারাও যুক্তরাষ্ট্র, মধ্যপ্রাচ্য ও রাশিয়াসহ বেশ কিছু দেশের কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাৎক্ষণিক সাক্ষাৎ করেন।

তবে পাকিস্তানের প্রভাবশালী সেনাপ্রধান আসিম মুনির ঘোষণা দিয়েছেন, ভারতের যেকোনো আগ্রাসনের সমুচিত জবাব তারা দেবে। মোদির কট্টর হিন্দু জাতীয়তাবাদী অবস্থানের কঠোর সমালোচক হিসেবে পরিচিত মুনির।

অন্যদিকে মোদির হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল বহু বছর ধরেই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ‘বড় ধরনের আঘাত হানার’ দাবি জানিয়ে আসছে।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা রাখার সুযোগ দেখছেন কুগেলম্যান। তিনি বলেন, অতীতে এ ধরনের সংকটে যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে মধ্যস্থতা করেছে, এবারও তারা ভূমিকা রাখতে পারে। তবে ট্রাম্প প্রশাসন এ ক্ষেত্রে কতটা আগ্রহী, সেটা এখনো স্পষ্ট নয়।