বাংলাদেশে মহিলা মাদ্রাসার পথিকৃৎ

মাওলানা সৈয়দ আবদুল মালেক হালিম বাংলাদেশে স্বতন্ত্র কওমি মহিলা মাদ্রাসা শিক্ষাধারার পথিকৃৎ। সত্তরের দশকে মহিলা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি নারী শিক্ষায় এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেন। তার চিন্তা, কর্ম ও নেতৃত্ব কওমি অঙ্গনে বিপ্লবী পরিবর্তন এনেছে। দ্বীনি শিক্ষা, দাওয়াত ও তাবলিগ, সমাজ সংস্কার, রাজনীতি ও লেখালেখির মাধ্যমে তিনি পরিণত হয়েছেন অনন্য ব্যক্তিত্বে। এই মনীষীকে নিয়ে লিখেছেন হাফেজ মুহাম্মদ আবুল মঞ্জুর

মাওলানা সৈয়দ আবদুল মালেক হালিম ১৯৪১ সালের ২১ মার্চ চট্টগ্রামের বাঁশখালী থানার পুকুরিয়ায় এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মাওলানা আবদুল হক (রহ.)-ও ছিলেন ফাজেলে দারুল উলুম দেওবন্দ এবং একজন প্রতিভাধর আলেমে দ্বীন। তার বংশধারা মদিনা শরিফের প্রখ্যাত আনসারি সাহাবি হজরত আবু আইয়ুব আনসারি (রা.)-এর বংশের সঙ্গে মিলিত হয়েছে। মাওলানা সৈয়দ আবদুল মালেক হালিমের জীবন জুড়ে রয়েছে বহু বিস্ময়কর অধ্যায় ছাত্রজীবনে প্রখর মেধা, শিক্ষকতায় নিষ্ঠা, দাওয়াতে আন্তরিকতা, লেখনীতে প্রজ্ঞা, রাজনীতিতে চেতনার দীপ্তি এবং সমাজ সংস্কারে অক্লান্ত শ্রম। তার কর্মের পরিধি শুধু দেশেই নয়, ছড়িয়েছে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও। দ্বীন, সমাজ ও রাষ্ট্রচিন্তার সংমিশ্রণে গঠিত তার চিন্তাধারা ও কর্মকাণ্ড তাকে পরিণত করেছে একটি প্রতিষ্ঠানস্বরূপ আলেমে দ্বীনে।

নিজ পিতা মাওলানা আবদুল হক (রহ.)-এর হাতে তার শিক্ষা জীবনের সূচনা হয়। পিতা একজন বিজ্ঞ আলেম হওয়ায় শৈশবেই দ্বীনি ইলম অর্জনের প্রবল স্পৃহা সৃষ্টি হয় তার মধ্যে। এই আগ্রহের প্রেক্ষিতে পিতা তাকে আল-জামিয়া আল-ইসলামিয়া পটিয়ায় ভর্তি করিয়ে দেন। বহুমুখী প্রতিভা ও প্রখর মেধাশক্তির কারণে তিনি ওস্তাদদের সুপ্রিয় ছাত্র হয়ে ওঠেন এবং প্রতিষ্ঠাতা মুফতি আজিজুল হক (রহ.)-এর স্নেহছায়া পেয়ে ধন্য হন। তিনি সুদীর্ঘ ১২ বছর কৃতিত্বের সঙ্গে লেখাপড়া করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম এ ইসলামি শিক্ষাকেন্দ্র থেকে দাওরায়ে হাদিস পাস করেন। আল-জামিয়া আল-ইসলামিয়া পটিয়ার একজন অন্যতম কৃতী ছাত্র হিসেবে মাওলানা আবদুল মালেক হালিমও ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। সেখানে তার প্রখ্যাত উস্তাদদের মধ্যে ছিলেন মুফতি আজিজুল হক (রহ.), খতিবে আজম ছিদ্দিক আহমদ (রহ.), ইমাম আহমদ (রহ.), আমির হুসাইন (রহ.), হাজি মুহাম্মদ ইউনুছ (রহ.), ইসহাক আল-গাজী (রহ.), আলি আহমদ বোয়ালভি (রহ.), নুরুল ইসলাম কদিম (রহ.) প্রমুখ।

তিনি মুফতি আজিজুল হক (রহ.)-এর দিকনির্দেশনায় চট্টগ্রামের প্রসিদ্ধ দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দোহাজারী মাদ্রাসায় শিক্ষকতায় যোগদানের মাধ্যমে কর্মজীবনের সূচনা করেন। পরে তিনি সৌদি আরবে মসজিদের ইমামতিসহ ইলমে দ্বীনের খেদমত ও দাওয়াতি কর্মসূচি আঞ্জাম দেন। এ সময় তিনি সৌদি আরবসহ অন্যান্য আরব দেশে মহিলাদের জন্য স্বতন্ত্র ইসলামি শিক্ষাব্যবস্থা দেখে অনুপ্রাণিত হন এবং স্বতন্ত্র কওমি মহিলা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেন। সেই সময়ে পবিত্র কাবা শরিফের একজন ইমামও বাংলাদেশ সফরকালে তাকে একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল মহিলা মাদ্রাসা শিক্ষাধারা প্রবর্তনে অনুপ্রাণিত করেন।

এখানে লক্ষণীয় যে, বাংলাদেশে ইসলামি শিক্ষাধারার সূচনার ইতিহাস অনেক প্রাচীন হলেও মহিলাদের জন্য প্রকৃত ইলমে দ্বীন অর্জনের তেমন কোনো বিশেষ প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা ছিল না। ফলে অসংখ্য মুসলিম পরিবারের মেয়েরা ইলমে দ্বীনের আলো থেকে বঞ্চিত ছিল। একটি সমাজের অর্ধেক জনশক্তি যদি ইলমের আলো থেকে বঞ্চিত থাকে, তবে সে জাতির জাগরণ পূর্ণতা পায় না। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দীর্ঘকাল মেয়েদের জন্য ইসলামি শিক্ষার ক্ষেত্রে ছিল সীমাবদ্ধতা। এমন প্রেক্ষাপটে সত্তরের দশকে যুগবিপ্লবী সংস্কারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন কীর্তিমান আলেম আবদুল মালেক হালিম। ১৯৭২ সালে অনেক প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে তিনি দক্ষিণ চট্টগ্রামের আনোয়ারায় ঐতিহ্যবাহী আল-জামেয়া আরবিয়া হাইলধর বালক-বালিকা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করে ইসলামি শিক্ষা বিস্তারে অনন্য অবদান রাখেন। কালের পরিক্রমায় এ মাদ্রাসা হয়ে ওঠে দেশে স্বতন্ত্র কওমি মহিলা মাদ্রাসা শিক্ষাধারার সূতিকাগার। আর প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা মহাপরিচালক মাওলানা আবদুল মালেক হালিম হয়ে ওঠেন কওমি মহিলা মাদ্রাসা শিক্ষাধারার জীবন্ত কিংবদন্তি। ১৯৭৪ সালে উত্তরা মডেল টাউনের ১০ নম্বর সেক্টরে ওয়াকফকৃত জমিতে আল-মাদরাসাতুল আজিজিয়া দারুল উলুম নামে একটি মহিলা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। পরে এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় জামিয়া ইসলামিয়া রানাভোলা। এটি রাজধানী ঢাকার সর্বপ্রথম ও সর্ববৃহৎ মহিলা মাদ্রাসা। বর্তমানে এই মাদ্রাসায় দেড় হাজারের বেশি শিক্ষার্থী পড়ালেখা করছে।

সমাজ ও রাষ্ট্রচিন্তক বিদগ্ধ আলেম আবদুল মালেক হালিম দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বহির্বিশ্বেও ইসলামি রাজনীতি ও শিক্ষা-

সংস্কৃতির মিশন নিয়ে সফর করেছেন। তার সফরকৃত দেশগুলোর মধ্যে সৌদি আরব, পাকিস্তান, ভারত, আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, ইয়েমেন, ওমান অন্যতম। এছাড়াও তিনি মদিনা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়, কিং সাউদ বিশ্ববিদ্যালয়, দারুল উলুম দেওবন্দ, দারুল উলুম করাচিসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শন করেন।

দীর্ঘ কর্মময় জীবনে তিনি বহু প্রখ্যাত মনীষীর ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য পেয়েছেন। তাদের মধ্যে হাকিমুল ইসলাম কারি তৈয়ব (রহ.), বিশ্বসমাদৃত আরবি সাহিত্যিক সৈয়দ আবুল হাসান আলি নদভি (রহ.), শাইখুল হাদিস যাকারিয়া (রহ.), সৌদি আরবের সাবেক গ্র্যান্ড মুফতি শায়খ বিন বায (রহ.), মুফতি মুহাম্মদ তাকি ওসমানি উল্লেখযোগ্য। আধ্যাত্মিক অঙ্গনেও তিনি একজন রাহবার। তিনি শাহ আলি আহমদ বোয়ালভি হুজুর (রহ.)-এর কাছ থেকে খেলাফত লাভে ধন্য হন।

প্রাজ্ঞ আলেমে দ্বীন আবদুল মালেক হালিম দরস-তাদরিসের সঙ্গে সঙ্গে উম্মাহর কল্যাণে গবেষণা ও লেখনীর ময়দানেও গঠনমূলক ভূমিকা পালনে ব্রতী হন। তার রচিত ও অনুদিত গ্রন্থসমূহের মধ্যে রয়েছে, ‘কাদিয়ানিরা মুসলিম নয়’, ‘ইসলাম ও কমিউনিজম’, ‘ইসলাম ও পুঁজিবাদ’, ‘ইসলামে ভূমি ব্যবস্থা’, ‘মাদ্রাসা শিক্ষা সংস্কারের সাত দফা’ ইত্যাদি।

তিনি শায়খুল ইসলাম আতহার আলি (রহ.), সৈয়দ মুসলেহ উদ্দিন (রহ.), খতিবে আজম ছিদ্দিক আহমদ (রহ.)-সহ উপমহাদেশের কীর্তিমান বুজুর্গানে দ্বীনের সান্নিধ্য সৌরভে রাজনৈতিক ময়দানেও কৃতিত্বের নজির স্থাপন করেন। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে ইসলামি অঙ্গনের রাজনৈতিক শক্তির পুনর্জাগরণে তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা অবিস্মরণীয়। তার চেতনাদীপ্ত ভাষণে জমাট বাঁধা হতাশার কালো মেঘ কেটে গিয়ে উন্মোচিত হয় উৎসাহ-উদ্দীপনার নতুন দিগন্ত।

আশির দশকে বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির সভাপতি হিসেবে রাজনীতির ময়দানে ছিল তার ইমানদীপ্ত বিচরণ। ১৯৮৬ সালে তিনি নেজামে ইসলাম পার্টির গ্রার্থী হিসেবে চট্টগ্রাম বাঁশখালী আসনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বই মার্কায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। বর্তমানেও তিনি নেজামে ইসলাম পার্টির উপদেষ্টা পদে নিয়োজিত আছেন। পুঁজিবাদী রাজনীতির ময়দানে দিগ্ভ্রান্ত ছাত্রসমাজকে সঠিক পথের দিশা দিতে তিনি বাংলাদেশ ইসলামি ছাত্রসমাজের পুনরুজ্জীবনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

সর্বোপরি জাতীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক ব্যানারে তিনি দ্বীনি আন্দোলন-সংগ্রামে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। মুহাম্মদুল্লাহ হাফেজ্জি হুজুর (রহ.)-এর নেতৃত্বে তৎকালীন দেশের সাড়া জাগানো সংগঠন সম্মিলিত সংগ্রাম পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে তিনি রেখেছেন সংগ্রামী অবদান। বার্ধক্যে এসেও তিনি বাতিল অপশক্তির মোকাবিলায় সদা সোচ্চার। তিনি দেশের সর্ববৃহৎ অরাজনৈতিক দ্বীনি সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার অন্যতম উদ্যোক্তা। সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা নির্বাহী মহাসচিব এবং কিছুদিন পর প্রায় বছরের অধিক সময় মহাসচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

অত্যন্ত সাহসী, মুখলিস, কর্মোদ্যমী, উম্মাহর জন্য সর্বদা চিন্তামগ্ন এবং বিরল প্রতিভার অধিকারী সংগ্রামী এই আলেমে দ্বীন অসুস্থতা ও বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন। অনেকদিন ধরে তিনি শয্যাশায়ী। মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করি যেন তাকে পরিপূর্ণ সুস্থতা দান করেন এবং দীর্ঘ হায়াত নসিব করেন। আমিন।