ফেনীতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীর সংকট দেখা দিয়েছে। নানা উদ্যোগ নিলেও বিদ্যালয়গুলোতে ভর্তির হার বাড়ছে না। এজন্য অভিভাবকদের মাদ্রাসা ও কিন্ডারগার্টেনে সন্তানকে ভর্তির আগ্রহকে দায়ী করছেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। তবে অভিভাবকরা বলছেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের থেকে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পড়াশোনার মান ভালো হওয়ায় তারা সন্তানদের এসব জায়গায় ভর্তি করাচ্ছেন।
ফেনী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, চলতি বছর ১ লাখ ৭১ হাজার ৯৪৬ জন শিশু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। গত বছর ছিল ১ লাখ ৮৩ হাজার ৫৭০ জন।
এদিকে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস থেকে প্রাপ্ত তথ্যের সঙ্গে উপজেলা শিক্ষা অফিস থেকে প্রাপ্ত তথ্যের কোনো মিল নেই। ফেনী জেলার ৬টি উপজেলায় চলতি বছরে ভর্তি শিশুর সংখ্যা ৭২ হাজার ৭৯৫ জন, যা জেলা তথ্য থেকে ৯৯ হাজার ১৫১ জন কম। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের ৯ এপ্রিলের আপডেট তথ্য অনুযায়ী, ফেনী সদর উপজেলায় ৭৪ হাজার ৪৮১ জন, সোনাগাজী উপজেলায় ২৯ হাজার ৯২৮ জন, দাগনভূঁঞা উপজেলায় ২৭ হাজার ৩৮৪ জন, ফুলগাজী উপজেলায় ১৫ হাজার ৩৩৩ জন, ছাগলনাইয়া উপজেলায় ১১ হাজার ৫০ জন, পরশুরাম উপজেলায় ১৩ হাজার ৭৭০ জন দেখানো হয়েছে। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ফেনী সদর উপজেলায় ২৩ হাজার ৩৮৪ জন, সোনাগাজী উপজেলায় ১৩ হাজার ৬৬৯ জন, দাগনভূঁঞা উপজেলায় ১৬ হাজার ৮২২ জন, ফুলগাজী উপজেলায় ৬ হাজার ৭৮৫ জন, ছাগলনাইয়া উপজেলায় ৪ হাজার ৮১৫ জন ও পরশুরাম উপজেলায় ৭ হাজার ৩২০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ফেনী জেলার ৫৩৪টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৫০ জনের নিচে ১২টি ও ১০০ জনের নিচে ১৬৮টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। প্রতিটি বিদ্যালয়ে ৩ থেকে ১২ জন শিক্ষক থাকলেও শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন করছেন অভিভাবকরা।
সরেজমিনে সোনাগাজীর পূর্ব বড়ধলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, শিশু শ্রেণিতে ৫ জন, প্রথম শ্রেণিতে ১ জন, ২য় শ্রেণিতে ৫ জন, ৩য় শ্রেণিতে ৩ জন, ৪র্থ শ্রেণিতে ১০ জন, ৫ম শ্রেণিতে ৩ জনসহ মোট ২৭ জন উপস্থিত রয়েছে। বিদ্যালয়ের মোট ছাত্রছাত্রী ৩৩ জন।
ফুলগাজীর দেবীপুর ফেরদৌস আক্তার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, ২২ জন ছাত্রছাত্রীর মধ্যে ২০ জন উপস্থিত রয়েছে। এ ব্যাপারে বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক জীবন চন্দ্র দাস বলেন, ‘বিদ্যালয়ে মাত্র তিন জন শিক্ষক। দূরত্বের কারণে শিক্ষকরা আসতে চান না।’ বিদ্যালয়ে মাত্র ২২ জন ছাত্রছাত্রীর কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা মাদ্রাসা ও কিন্ডারগার্টেনমুখী।’
সোনাগাজী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এস এম তাহেরুল ইসলাম বলেন, ‘উপকূলীয় চরাঞ্চলের শিশুরা বাবার সঙ্গে মাঠে কাজ করে। কিছু পরিবার ধর্মীয় শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে মাদ্রাসায় ভর্তি হয়ে যায়। তবে শিক্ষার্থী বৃদ্ধির জন্য শিক্ষকরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিক্ষার্থী সংগ্রহ, মা সমাবেশসহ শিক্ষার্থী বাড়ানোর জন্য নানামুখী কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।’
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ফিরোজ আহাম্মদ বলেন, ‘করোনার কারণে দীর্ঘ বন্ধ থাকার পর থেকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা কমতে শুরু করে। স্থানীয়ভাবে মক্তব বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মাদ্রাসার দিকে ঝুঁকছেন অভিভাবকরা।’ জেলা অফিসের তথ্যের সঙ্গে উপজেলা তথ্যের মিল না থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখান থেকে যে তথ্য দেওয়া হয়েছে তা বইয়ের চাহিদার জন্য তৈরি তথ্য। উপজেলা শিক্ষা অফিস থেকে এখনো ভর্তিকৃত ছাত্রছাত্রীদের তথ্য জেলা অফিস সংগ্রহ করেনি।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) ফাতিমা সুলতানা বলেন, ‘প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এ চিত্র হতাশাজনক। আমরা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেব।’