বাংলাদেশের ফুটবলে আসছেন দুই নক্ষত্র। একজন এসেছেন ইংল্যান্ডের প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব লেস্টার সিটি থেকে, অন্যজন কানাডার ক্যাভালরি এফসির ঘাসে গড়া অভ্যস্ত মাঠ পেরিয়ে। তাদের পায়ে ইউরোপ ও আমেরিকার ফুটবলের ছোঁয়া, চোখে বাংলাদেশকে আলোকিত করার অঙ্গীকার। হ্যাঁ, তারা হামজা চৌধুরী ও শমিত শোম। যেখানে হামজাকে বলা যায় রক্ষার প্রাচীর, প্রতিপক্ষের সুযোগ নষ্টের কারিগর। আর শমিত মাঝ মাঠের শিল্পী, আক্রমণের স্থপতি। তাদের দুজনের কেউই গোল করেন না, তবে গোলের সুযোগ তৈরি করে দেন তারাই।
সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ১০ জুন মতিঝিলের জাতীয় ফুটবল স্টেডিয়ামে সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে খেলতে নামবেন দুজনে। যেই ম্যাচে বাংলাদেশের ফুটবলের মাঝমাঠ থাকবে এই দুই প্রবাসী ফুটবলারের দখলে। যেখানে হামজা থাকবেন লড়াই, রক্ষা আর ইস্পাত কঠিন আত্মবিশ্বাসে। আর শমিতের মধ্যে থাকবে ছন্দ, বুদ্ধি ও নকশা করা আক্রমণ। এ যেন একটি দেশের ফুটবলকে নতুনভাবে দেখানোর জন্য মাঠে রূঢ় বাস্তবতা আর সৃজনশীল কল্পনার সম্মিলন।
হামজা চৌধুরীর ক্লাব ফুটবলের অভিজ্ঞতা তাকে বাংলাদেশের জন্য এক অমূল্য সম্পদে পরিণত করেছে। ইংল্যান্ডের লেস্টার সিটির হয়ে প্রিমিয়ার লিগে খেলেছেন ৫০টিরও বেশি ম্যাচ। এরপর ওয়াটফোর্ড ও শেফিল্ড ইউনাইটেডের হয়ে চ্যাম্পিয়নশিপেও খেলেছেন নিয়মিত। ক্যারিয়ারে ১৭০-এর বেশি ম্যাচে অংশ নিয়ে বল কাটার দক্ষতায় নিজেকে বারবার প্রমাণ করেছেন। প্রিমিয়ার লিগে তার গড়ে প্রতিম্যাচে ছিল অন্তত ২-৩টি সফল ট্যাকল, পাস সাফল্যের হার ছিল প্রায় ৭৮ শতাংশের কাছাকাছি। যদিও গোল সংখ্যা মাত্র ১, তবে তার মূল কাজ গোল ঠেকানো ও খেলার ছন্দ গড়ে তোলা। বাংলাদেশের হয়ে ভারতের বিপক্ষে অভিষেক ম্যাচে ৯০ মিনিট মাঠে থেকে তিনি ছিলেন দলের কৌশলগত কেন্দ্রে—৪টি ট্যাকল, ২টি ইন্টারসেপশন এবং ৩টি ব্লক করে প্রমাণ করেছেন, তিনি শুধু নামেই বড় নন, পারফরম্যান্সেও নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন।
অন্যদিকে শমিত শোমের উপস্থিতি বাংলাদেশের মাঝমাঠে এনে দেবে একধরনের সৃজনশীল ভারসাম্য। কানাডার এফসি এডমন্টন দিয়ে যাত্রা শুরু করলেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন মন্ট্রিয়াল ইমপ্যাক্ট এবং ক্যাভালরি এফসির মতো ক্লাবে। কানাডিয়ান প্রিমিয়ার লিগে তার গড় কী পাস ছিল প্রতি ম্যাচে ১.৮-এর কাছাকাছি, যা প্রমাণ করে তিনি প্রতিপক্ষ রক্ষণভাগকে ভেঙে দেওয়ার জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ পাস দিতে পারেন। মোট ১৭০টিরও বেশি ক্লাব ম্যাচে অংশ নিয়ে গোল করেছেন মাত্র ৪টি, কিন্তু অ্যাসিস্ট ও সুযোগ তৈরির সংখ্যায় তিনি ছিলেন সতীর্থদের ভরসার নাম। বল কন্ট্রোল, শর্ট পাস ও পজিশনিংয়ে তার খেলার পরিণততা তাকে বাংলাদেশ দলের গেমমেকিংয়ে রাখবে অনন্য এক উচ্চতায়।
এই দুই তারকার খেলায় এক বিস্ময়কর মিল—তারা নিজেরা গোল করেন না। বরং গোল বানাতে পারদর্শী। হামজা যেমন প্রতিপক্ষের আক্রমণ ভেঙে নিজ দলের গঠন তৈরি করেন। শমিত তেমনই পাসিং, স্পেস তৈরি আর ডিফেন্স চিড়ে দেওয়া থ্রু-বলে আক্রমণ সাজান। তাদের একজন রাশ, অন্যজন নদী। একজন ভারসাম্য, অন্যজন রঙ। বাংলাদেশের মতো দলে, যেখানে স্ট্রাইকাররা সুযোগ পেলেও ফিনিশিংয়ে খেই হারিয়ে ফেলেন—সেখানে হামজা-শমিতের এই বল কন্ট্রোল ও বিল্ড-আপ প্লে হতে পারে নতুন আলো। তারা এমন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে পারেন, যেখানে স্ট্রাইকারদের কাজটা হবে সহজ ও নিশ্চিত—যদি তারা সুযোগটা কাজে লাগাতে পারেন।
তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—এই ছন্দে তাল মিলাবে কে? এই দুই খেলোয়াড় যে মানের ফুটবল খেলেছেন, সেখানে প্রতিটি সেকেন্ডে সিদ্ধান্ত, প্রতিটি পাসে নিখুঁত দৃষ্টিভঙ্গি ও গতি থাকা জরুরি। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের বর্তমান দলে যারা আছেন, তারা কি এই ছন্দে নিজেদের মানিয়ে নিতে পারবেন? অনেকেই এখনো আন্তর্জাতিক মানে অভ্যস্ত নন—তাদের ফার্স্ট টাচ, মুভমেন্ট বা পজিশনিংয়ের ঘাটতি মাঝেমধ্যেই চোখে পড়ে। তাই শমিত ও হামজার কল্পিত খেলা মাঠে বাস্তব রূপ নিতে গেলে দরকার হবে বাকি নয় জনেরও সেই একই গতি ও বোঝাপড়ার উন্নয়ন।
বাংলাদেশের আক্রমণভাগে ফিনিশিং দুর্বলতা আবার চোখে পড়েছে শিলংয়ে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচে। এই প্রেক্ষাপটে, ইতালির চতুর্থ স্তরের ক্লাব ওলবিয়া ক্যালসিও ১৯০৫-এর হয়ে খেলা ১৮ বছর বয়সী ফাহমিদুল ইসলাম হতে পারেন ভবিষ্যতের সম্ভাবনাময় সমাধান। ফেনী থেকে ইতালিতে পাড়ি দিয়ে স্পেজিয়া ও সাম্পদোরিয়ার যুব দলে প্রশিক্ষণ নেওয়া ফাহমিদুল, সাম্পদোরিয়ার অনূর্ধ্ব-১৮ দলে ২০২৩–২৪ মৌসুমে ২৫ ম্যাচে ৪ গোল করেছেন। এরপর সিনিয়র পর্যায়ে লিগর্না ও লিভোর্নোর হয়ে খেলার অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে বর্তমানে ওলবিয়ার হয়ে খেলছেন।
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ওলবিয়ার অনূর্ধ্ব-১৯ দলে অভিষেকেই হ্যাটট্রিক করে নজর কাড়েন। এরপর বাংলাদেশের জাতীয় দলের প্রাথমিক স্কোয়াডে ডাক পেয়ে সৌদি আরবে ক্যাম্পে অংশ নেন এবং একটি প্রস্তুতি ম্যাচে হ্যাটট্রিক করেন। তবে জাতীয় দলের কয়েকজন সিনিয়র ফুটবলারের কূটকৌশলের কারণে মূল স্কোয়াডে জায়গা হয়নি তার। তবে বাফুফে জানিয়েছে, ফাহমিদুল প্রতিভাবান এবং ভবিষ্যতে তাকে নিয়ে পরিকল্পনা রয়েছে।
হামজা ও শমিতের কৌশল, চিন্তায় বাংলাদেশের খেলায় বুদ্ধিমত্তা ও ভারসাম্য যোগ করতে। তাদের ছোঁয়াতেই শুরু হতে পারে বাংলাদেশের ফুটবলের নতুন ইতিহাস।