বাংলাদেশের উন্নয়নকে তুলনামূলক হিসেবে ন্যস্ত করা যায় প্রতিবেশীদের সঙ্গে। বিশেষ করে জানতে ইচ্ছা হয়, সমাজের এক শ্রেণির ‘সেই প্রিয় পাকিস্তানের’ তুলনায় বাংলাদেশ ভালো না খারাপ আছে? অথবা ভারতের চেয়ে কেমন আছে আমার দেশ? সমাজবিজ্ঞানী বিনায়ক সেনের কিছু পরিসংখ্যান ধার করে বলছি। ধরুন, নব্বইর দশকের শুরুতে বাংলাদেশের মাথাপিছু জিএনআই পাকিস্তানের মাথাপিছু জিএনআইয়ের ৫৫ ভাগ ছিল অথচ ২০১০ দশকের শেষের দিকে পাকিস্তানের চেয়ে ১০ শতাংশ বেশি বাংলাদেশের মাথাপিছু জিএনআই। অন্যদিকে নব্বইর দশকের শুরুতে বাংলাদেশের মাথাপিছু জিএনআই ছিল ভারতের ৮৭ শতাংশ, পার্থক্যটা বৃদ্ধি পেয়ে ২০০০ দশকে দাঁড়ায় ৭৪ শতাংশ কিন্তু ২০০০-এর শেষ দিকে হ্রাস পেয়ে ৮২ শতাংশ ‘ক্যাচিং আপ’ ইন্ডিয়া সিন্ড্রোম! কতটুকু সত্য জানি না, কিছুদিন আগে শুনেছি বাংলাদেশ বিশ্ব দরবারে উন্নয়ন ব্যতিক্রম বা উন্নয়ন ধাঁধা হিসেবে বিবেচিত ছিল। তার আগে অর্থাৎ স্বাধীনতার শুরুতে ছিল, হেনরি কিসিঞ্জারের ‘তলাবিহিন ঝুরি’ এবং ইউস্ত ফ্যালেন্দ ও যে পারকিন্সনের; টেস্ট কেস অব ডেভেলপমেন্ট। বাংলাদেশের উন্নয়ন নিয়ে শুরুতে হতাশার যে সুর শোনা গিয়েছিল, তা মূলত তিনটি ক্ষেত্রকে কেন্দ্র করে যথা (ক) কৃষিক্ষেত্রে প্রযুক্তি প্রসারের ঘাটতি, বৈষম্যমূলক কৃষি কাঠামো এবং তীব্র খাদ্য স্বল্পতা ও গণ-দারিদ্র্য; (খ) জনমিতিক জগতে নব্য-ম্যালথুসিয়ান নিরাশা, নারীর নিচু শিক্ষা, সামাজিক বা পেশাগত অবস্থান এবং ভয়েস এবং (গ) বাজার ব্যবস্থার দুর্বলতা ব্যক্তি উদ্যোক্তার অভাব, দুর্বল রাষ্ট্রে দুর্বল শিল্প নীতি, প্রাথমিক পণ্যের আধিক্যে রপ্তানি হতাশা ইত্যাদি।
দুই. স্বাধীনতা-পরবর্তী ‘ভয়ংকর ভবিষ্যদ্বাণী’র প্রেক্ষিতে বর্তমান বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন বিবরণী আরব্য রজনীর আখ্যান মনে হতেই পারে। প্রথমে ধরা যাক, বাংলাদেশ বনাম পাকিস্তানের তুলনা। পাকিস্তান আমলে বিচ্যুতি ছিল অগ্রগতিতে পশ্চিম এগিয়ে ছিল আর পূর্ব অনেক পিছিয়ে। যার ফলে স্বাধীন বাংলাদেশ। এখনো বিচ্যুতি লক্ষণীয় বস্তুত বাড়ন্ত বিচ্যুতি, তবে এবার উল্টো দিকে অর্থাৎ বাংলাদেশ অগ্রগামী পাকিস্তানের চেয়ে নানান নির্দেশকে। স্বাধীনতার সময় প্রায় সব আর্থসামাজিক নির্দেশকে বাংলাদেশ পাকিস্তান থেকে পিছিয়েছিল; ২০১০ শতকের শেষে এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পাকিস্তানকে টপকে গেছে বলে ধারণা । বাংলাদেশ বনাম ভারতের তুলনাটা এ রকম : কিছু ক্ষেত্রে ছুঁইছুঁই, অন্য ক্ষেত্রে এগিয়ে। যেমন জিডিপিতে ম্যানুফেকচারিং খাতের অবদান, শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণের হার, নগরায়ণের হার ইত্যাদিতে ভারতের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ এবং অন্যান্য নির্দেশকে দ্রুত ধাবমান সেই দেশটির সমান হতে।
তিন. ম্যানুফেকচারিং খাতের ক্রমবর্ধমান অবদান আছে এবং ২০১০ দশক শেষে এই হিস্যা প্রায় ২০ ভাগ দাঁড়ায়। এর বিপরীতে ভারত ও পাকিস্তানে ওঠানামা নিয়ে ম্যানুফেকচারিং খাতের অবদান যথাক্রমে ১৩ ও ১১ শতাংশ। এটা ব্যাখ্যা করে কী করে বাংলাদেশ আর্থসামাজিক নির্দেশকে আঞ্চলিক সহগামীর নাগাল ধরল। আর ম্যানুফাকচারিং খাতের সফলতা প্রতিফলিত হতে দেখা যায় নগরায়ণের সফলতায় নব্বইর দশকে সবচেয়ে কম নগরায়ণ থেকে আঞ্চলিক অংশীদারদের ছাপিয়ে যাওয়া কম ক্রিতিত্তের কথা নয় (অপরিকল্পিত যদিও এবং অন্যান্য সমস্যা থাকা সত্ত্বেও)। দ্বিতীয়ত, আঞ্চলিক প্রতিবেশীদের তুলনায় নারী শ্রমশক্তির অংশগ্রহণের সংগতিপূর্ণ হার বৃদ্ধি পাওয়ার পেছনে জ্বালানি জুগিয়েছে ম্যানুফাকচারিং খাতের সফলতা তুলনীয় সময়ে বাংলাদেশে প্রায় ২৫ থেকে ৩৬ শতাংশ, ভারতে ৩০ থেকে ২১ এবং পাকিস্তানে ১৪ থেকে ২৩ শতাংশ। এবার সামাজিক নির্দেশকের তুলনামূলক আলোচনায় একটু নির্দিষ্ট হওয়া যাক। নব্বইর দশকের শুরুতে ভারতের তুলনায় শিশুমৃত্যু হার বাংলাদেশে বেশি থাকা সত্ত্বেও ২০০০ পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ ভারত ও পাকিস্তানের নিচে শিশুমৃত্যু হার নামাতে পেরেছে (বাংলাদেশ প্রতি হাজারে ১০০ থেকে ২৬, ভারত ৯৯ থেকে ২৮ এবং পাকিস্তান ১০৭ থেকে ৫৫)। পাঁচ বছরের নিচে শিশুমৃত্যু হার হ্রাসে একই প্রবণতা লক্ষণীয় যেমনটি মোট প্রজননের ক্ষেত্রে নব্বইর শুরুতে প্রতিবেশী দুই দেশের তুলনায় বেশি থেকেও ইদানীং সবচেয়ে কম। খর্বকায় অনুপাত নব্বইর দশকে প্রতিবেশী দেশ দুটো থেকে বেশি নিয়ে যাত্রা শুরু কিন্তু ইদানীং বাংলাদেশের অগ্রগতি অন্যদের চেয়ে ভালো। নব্বইর দশকের শুরুতে প্রত্যাশিত আয়ু সবচেয়ে কম ছিল বাংলাদেশে ৫৮ বছর, এখন প্রায় ৭৩ বছর। আর সেই সময় পাকিস্তানে ছিল সবচেয়ে বেশি ৬০ বছর, এখন ৬৭ বছর; ভারত ৫৭ থেকে সত্তরে তুলতে পেরেছে। অর্থাৎ পাকিস্তান ও ভারতের তুলনায় বাংলাদেশের মানুষ বেশি দিন বাঁচে এখন । অপরদিকে মোট এবং নারী বয়স্ক সাক্ষরতায় ভারতের পেছনে থেকেও এখন ভারতকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। যেমনি করে মেয়েদের প্রাথমিক স্কুলে অন্তর্ভুক্তিতে। তবে মাধ্যমিকে মধ্যখানে পা পিছলালেও আবার ঘুরে দাঁড়িয়ে ভারতকে পেছনে ফেলেছে বাংলাদেশ। গেল তিন দশকে চিত্তাকর্ষক চিত্র দারিদ্র্য হ্রাসের বেলায়– চরম দারিদ্র্য প্রকোপ ভারতের চেয়ে কম এই বাংলাদেশে। স্ববিরোধী মনে হলেও সত্যি যে, আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে কম কৃতিত্ব নিয়েও পাকিস্তানে দারিদ্র্যের হার ৪-৮ শতাংশ, যা গবেষকদের ভাবায়। সব মিলিয়ে, স্মরণ করতে হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং তার একনিষ্ঠ ধারক অমর্ত্য সেনকে : ‘আমাদের বাঁচিবার উপায় আমাদের নিজের শক্তি সর্বতোভাবে জাগ্রত করা। আমরা যে আমাদের পূর্বপুরুষদের সম্পত্তি বসিয়া বসিয়া ফুঁকিতেছি, ইহাই আমাদের গৌরব নহে; আমরা সেই ঐশ্বর্য বিস্তার করিতেছি, ইহাই যখন সমাজের সর্বত্র আমরা উপলব্ধি করিব, তখনই নিজের প্রতি যথার্থ শ্রদ্ধা সঞ্জাত হইয়া আমাদের মোহ ছুটিতে থাকিবে।’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (স্বদেশী সমাজ)। ‘... মাঝে মাঝেই আমরা প্রলুব্ধ হয়ে ভুল পথে এগিয়ে গেছি, কিন্তু তার মধ্যে ঠিক পথে যেটুকু এগিয়ে যাই তা যেন হারিয়ে না ফেলি। এখনো বহুপথ বাকি’ অর্মত্য সেন (জীবনযাত্রা ও অর্থনীতি)।
চার. সব আশাব্যঞ্জক গল্পের একটা অন্ধকার দিক থাকে। আশা এবং নিরাশার দোলাচলে আমরা প্রতিনিয়ত দোল খাই। বাংলাদেশের উন্নয়ন যাত্রা তেমনি এক আলো-আঁধারির খেলা হিসেবে বোধকরি ভুল হবে না। একদিকে উন্নয়নের ফলে দারিদ্র্য হ্রাস পেয়েছে। অন্যদিকে ধনী-গরিব বৈষম্য ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে । অর্থনীতিবিদ হারসম্যান ও রথচাইল্ড বলেছেন, টানেল প্রভাবের কথা : বিদ্যমান কাঠামোতে আয়-বৈষম্যের প্রতি যদি সহনশীলতা কম থাকে, তা হলে ‘আগে বাড়া, পরে বিতরণ’ এমন তত্ত্ব বিপজ্জনক হতে পারে। বাংলাদেশের বিদ্যমান বৈষম্য সহগ (গিনি সহগ) বিপদসীমার কাছাকাছি। বৈষম্য বেশি হলে দারিদ্র্য নিরসনে প্রবৃদ্ধির প্রভাব খাটো থাকে অর্থাৎ একই প্রবৃদ্ধির হার নিয়ে কম বৈষম্যের সমাজে দারিদ্র্য হ্রাসের হার বেশি হবে বেশি বৈষম্যের সমাজের চেয়ে। গেল চার দশকের বেশি সময় ধরে ‘অবিশ্বাস্য’ তথা অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধাঁধার আড়ালে-আবডালে অভাবনীয় উত্থান ঘটেছে কালো এক অর্থনীতির (আন্ডার গ্রাউন্ড ইকোনমি)। মূলত প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার কারণে ‘অর্থনৈতিক শয়তানের’ অভাবনীয় আবির্ভাব ঘটেছে । অন্ধকারে থাকা এই অর্থনীতি সরকারকে রাজস্ব থেকে বঞ্চিত রাখছে, রাজনীতিকে কলুষিত করছে, বিকৃত ভোগবাদী সমাজ সৃষ্টিতে জ্বালানি জোগাচ্ছে, সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটাচ্ছে। লেখাপড়ার উদ্দেশ্য এখন দুই হাতে টাকা কামাই করা। মোটা দাগে, এটা একটা টেকসই উন্নয়নের পথে প্রধান প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করছে। ক্ষেত্র বিশেষে এর ভেতরে অথবা পাশাপাশি অবস্থান নিয়েছে সর্বব্যাপী চরম দুর্নীতি । যদিও এদেশে দুর্নীতির ইতিহাস বেশ দীর্ঘ, তারপরও বিগত দশকগুলোতে, রাষ্ট্রীয় আনুকল্যে পুঁজিবাদ প্রসারণে, উত্থান ঘটেছে একশ্রেণির দাপুটে, ক্ষমতাবান দুর্নীতিবাজদের। বলা যায়, সমাজের অভিভাবক এখন তারাই। দুর্নীতি প্রতি বছর জিডিপির ২ শতাংশের মতো গিলে খায়। তা ছাড়া প্রতি বছর দেশ থেকে অবৈধ পথে পাচার হয় গড়ে ৭০০-৮০০ কোটি ডলার; ২০০৬ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত নাকি ৬০০০ কোটি ডলার পাচার হয়েছে বলা হচ্ছে।
পাঁচ. বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনীতির অবস্থা কিছুটা নাজুক, যদিও কোথাও ইতিবাচক এবং প্রশংসনীয় পদক্ষেপ লক্ষণীয়। রাজনৈতিক অস্থিরতায় অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়ছে প্রায়। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার সাড়ে তিন শতাংশের ঘরে প্রাক্কলিত, ৩০ লাখ নতুন দরিদ্র ইতিমধ্যে দরিদ্রের সাগরে যোগ দিয়েছে বলে বিশ্বব্যাংক বলছে, ব্যক্তি খাতে ঋণপ্রবাহ সর্বকালের সর্ব নিম্নে, কাঁচামাল কিংবা যন্ত্রপাতির আমদানি তলানিতে। চাঁদাবাজি, মাস্তানি এবং ‘ট্যাগ’-এর জের ধরে উদ্যোক্তারা আতঙ্কিত, গণমানস বিশেষত নারী সমাজ ভীতসন্ত্রস্ত। আইনের শাসনে ঘাটতি রয়েছে। একের পর এক কারখানা বন্ধ, বেকারত্ব ঊর্ধ্বগামী। শুধু রিজার্ভ ভালো দিয়ে অর্থনৈতিক গতিশীলতা ধরে রাখা সম্ভব নয়। চাই নিরপেক্ষতা, সততা এবং কঠোর হস্তে ‘শিষ্টের লালন, দুষ্টের দমন’। কবির কথায় : ‘অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ-পৃথিবীতে আজ,/ যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দ্যাখে তারা;/যাদের হৃদয়ে কোনো প্রেম নেই-প্রীতি নেই/ করুণার আলোড়ন নেই/পৃথিবী অচল আজ /তাদের সুপরামর্শ ছাড়া।’
লেখকঃ অর্থনীতি বিশ্লেষক ও সাবেক উপাচার্য জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
abdulbayes@yahoo.com