সহিষ্ণুতা-নৈতিকতার ভূমি কতটুকু উর্বর

আপডেট : ১৭ আগস্ট ২০২৬, ১২:৪৬ এএম

রাজনীতি যখন আদর্শচর্চার পরিবর্তে কৌশল, সুবিধাবাদ এবং জনমত ব্যবস্থাপনার খেলায় পরিণত হয়, তখন সবচেয়ে দ্রুত পরিবর্তিত হয় কিছু মানুষের ভাষা। কিন্তু ধীরগতিতে পরিবর্তিত হয়, মানসিকতা ও চরিত্র। আমরা প্রায়ই এমন বিচিত্র রাজনৈতিক নাট্যমঞ্চে বৈপরীত্যের সাক্ষী হই, যেখানে গতকাল পর্যন্ত যারা তর্জন-গর্জনে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত করছিল- তারা স্বার্থের অনুকূলে সহিষ্ণুতা, সংলাপ, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রবক্তা সেজে মানবতাবাদী ও গণতন্ত্রকামী রাজনৈতিক মতাদর্শগত কথায় জনসমক্ষে আবির্ভূত হন। যিনি একসময় ভিন্নমতকে শত্রু হিসেবে দেখতেন, প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করার ভাষায় কথা বলতেন, সমালোচনাকে বিদ্বেষ বলে উড়াতেন- তিনি হঠাৎ জাতীয় ঐক্য, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহাবস্থানের গুরুত্ব নিয়ে বক্তৃতা শুরু করেন। রাজনীতির এমন আকস্মিক রূপান্তর দেখে সাধারণ মানুষ বিস্মিত হয়। তারা কখনো হাসে, উপহাস করে, কখনো বিভ্রান্ত হয়। প্রকৃত অনুতাপ মানুষকে বিনয়ী করে। কিন্তু ‘রাজনৈতিক সুবিধাবাদ’ শুধু ভাষা বদলাতে শেখায়। ক্ষমতায় থাকাকালে গণতন্ত্রের নামে বাড়তি ক্ষমতা দখল করলেও, গণতন্ত্র চর্চার প্রয়োজন নেই। তখন প্রয়োজন অন্ধ আনুগত্য এবং বিরোধীদের দমন ও নিপীড়নের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ, সংলাপের বদলে নির্দেশ, সমঝোতার পরিবর্তে চাপ এবং মতবিনিময়ের বিপরীতে ভিন্ন প্রচারণা প্রধান হাতিয়ার। কিন্তু ক্ষমতার সমীকরণ যখন বদলে যায়, তখন গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায় তারা সংলাপের গুরুত্ব তৈরি করেন। হঠাৎ করে উপলব্ধি করেন, ‘ভিন্নমত’ গণতন্ত্রের অপরিহার্য উপাদান, মানবাধিকার মৌলিক বিষয় এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ রাষ্ট্রের নাগরিক। আর পরমতসহিষ্ণুতাকে তারা গণতন্ত্রের ‘মৌলিক ভিত্তি’ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেন- যেটা ক্ষমতায় থাকাকালে কখনো মনে করেননি।

রাজনৈতিক ইতিহাসে ‘মৌসুমি সহিষ্ণুতা’ নতুন ঘটনা নয়। যুগে যুগে দেখা গেছে রাজনৈতিক সুবিধা যেখানে, ‘নৈতিকতার ভাষা’ অনেক সময় সেখানে অবস্থান নেয়। ক্ষমতায় থাকলে কঠোরতা, ক্ষমতার বাইরে গেলে উদারতা- এ যেন কিছু রাজনৈতিক চরিত্রের অলিখিত সূত্র। ফলে নীতি নয়, অবস্থান। আদর্শ নয় ভাষা আর চরিত্র নয়, মুখোশ বদলায়। সত্যিকারের সহিষ্ণুতা মৌসুমি হয় না। সেটা ক্ষমতায় থাকলেও, না থাকলেও। প্রকৃত গণতান্ত্রিক মানসিকতা তখন বোঝা যায়, যখন একজন ব্যক্তি বিরুদ্ধ মত প্রকাশের অধিকার দেয়। প্রকৃত গণতান্ত্রিক উদারতা তখনই প্রমাণিত, যখন ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় বিরোধী কণ্ঠ দমন করা হয় না। কারণ সহিষ্ণুতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা, ক্ষমতাহীন অবস্থায় নয় ক্ষমতাবান অবস্থায়। দুঃখজনকভাবে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে প্রায়ই দেখা যায়, অনেকে গণতন্ত্রকে ভালোবাসেন না, বরং গণতন্ত্রকে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার জন্য প্রয়োজন মনে করেন। যখন গণতন্ত্র তাদের জন্য সুবিধাজনক, তখন গুণকীর্তন করেন। যখন গণতন্ত্র তাদের স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, তখন তারা নানা ব্যাখ্যা দিয়ে তাকে সীমিত করার চেষ্টা করেন। ফলে গণতন্ত্র মূল্যবোধ নয়, তাদের কাছে রাজনৈতিক কৌশল মাত্র। নাগরিকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলো, রাজনৈতিক বক্তব্যের মোহে না পড়ে রাজনৈতিক চরিত্র মূল্যায়ন করা। কারণ অন্যের জন্য ভাষণ রচনা করা সহজ কিন্তু বিশ্বাস, নৈতিকতা ও প্রাত্যহিক জীবন-চর্চার মাধ্যমে চরিত্র নির্মাণ কঠিন। একটি বক্তৃতা কয়েক মিনিটে দেওয়া যায়, কিন্তু বিশ্বাসযোগ্য রাজনৈতিক ঐতিহ্য গড়ে তুলতে প্রয়োজন অনেক বছর। তাই কে, কী বলছে এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কে, কী করেছে, কীভাবে করেছে এবং কেন করেছে?

সামষ্টিক কল্যাণের জন্য, মানুষ পরিবর্তিত হতে পারে এমন বিশ্বাস সভ্য সমাজে অপরিহার্য। কিন্তু পরিবর্তনের দাবির সঙ্গে আত্মসমালোচনার সাহস থাকতে হবে। যারা অতীতে ভুল করেছে, তাদের উচিত, ভুলের দায় স্বীকার করা। ইতিহাস অস্বীকার, অতীত ধামাচাপা কিংবা স্মৃতিকে বিকৃত করে নতুন পরিচয় নির্মাণের চেষ্টা জনগণের আস্থা অর্জন করে না। কারণ জনতার স্মৃতি কখনো কখনো নীরব থাকলেও, সম্পূর্ণ বিলীন হয় না। পৃথিবীতে প্রচারণা-প্রযুক্তি, সামাজিক মাধ্যম এবং জনমত নির্মাণের যন্ত্রগুলো এতটা শক্তিশালী অনেক সময় বাস্তবতার চেয়ে বয়ান বেশি প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। ফলে কিছু মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করেন, বারবার একটি কথা বললেই তা সত্যে পরিণত হবে। কিন্তু ইতিহাসের নির্মম বৈশিষ্ট্য হলো দীর্ঘমেয়াদে মুখোশের চেয়ে মানুষের চরিত্রকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। তাই রাজনৈতিক সাধুত্বের হঠাৎ আবির্ভাব দেখলে, বিস্মিত হওয়ার আগে একটু থামা উচিত। দেখা উচিত, এটি কি আত্মশুদ্ধির ফল, নাকি পরিস্থিতির চাপে কৌশলগত রূপান্তর? এটি কি মূল্যবোধের পরিবর্তন, নাকি ভাষার পরিবর্তন? এটি কি অনুতাপের প্রকাশ, নাকি জনমত পুনর্দখলের প্রচেষ্টা? আমজনতার জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ সবসময় প্রকাশ্য প্রতিপক্ষ নয়; বরং সেই ব্যক্তি বা গোষ্ঠী, যারা রাজনৈতিক ছলাকলায় নিজের প্রকৃত রূপকে নীতির মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়।

রাজনৈতিক জীবনে সহিষ্ণুতা, সংলাপ, মানবিকতা ও গণতন্ত্রের ভাষা স্বাগত। কিন্তু সেই ভাষার সত্যতা যাচাই করতে হবে অতীত আয়না, বর্তমানের আচরণ এবং ভবিষ্যৎ কর্মে। কারণ সত্যিকারের গণতন্ত্রী চিনতে হলে বক্তব্যের দিকে নয়, ক্ষমতা ব্যবহারের ইতিহাসের দিকে তাকাতে হয়। আর সেখানেই লুকিয়ে থাকে মৌসুমি সহিষ্ণুতা ও প্রকৃত সহিষ্ণুতার মৌলিক পার্থক্য। একটি ক্ষমতার প্রয়োজন থেকে জন্ম নেয়, অন্যটি চরিত্রের গভীরতা থেকে। একটি মুখোশ, অন্যটি ব্যক্তিত্ব। একটি রাজনৈতিক অভিনয়, অন্যটি নৈতিক অবস্থান। একটু দেরিতে হলেও, ইতিহাস শেষ পর্যন্ত দুইয়ের পার্থক্য নির্ধারণ করে।

লেখক : ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য।

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত