সর্বাত্মক সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার আগেই যুদ্ধবিরতিতে গেল ভারত ও পাকিস্তান। গত শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় এ যুদ্ধবিরতি শুরু হয়। দুই দেশ বিষয়টি নিশ্চিত করার আগেই সেদিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পই প্রথমে জানান দুই দেশের মধ্যকার চলমান সংঘাত নিরসনের সম্মতির কথা। পরে দুই দেশের পক্ষ থেকেই বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। এরপরই দুই দেশের নাগরিকরা আনন্দ উদযাপনও করেছেন। অবশ্য যুদ্ধবিরতির ঘোষণার দুই দেশের কিছু জায়গায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। তার পরিপ্রেক্ষিতেই দুপক্ষই যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের দাবি করেছে। তবে এর পর গতকাল রবিবার সকাল থেকে দুই দেশের অনেক কিছু স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। ভারতের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর এবার নিজেদের আকাশসীমা সব ধরনের উড়োজাহাজের জন্য খুলে দিয়েছে পাকিস্তান। অন্যদিকে ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরেও পরিস্থিতি ক্রমে স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। খুলছে দোকানপাট।
কিন্তু এখন প্রশ্ন হচ্ছে, দুই দেশ যুদ্ধংদেহী মনোভাব প্রকাশ করে এলেও শেষ পর্যন্ত কেন তারা এত তাড়াতাড়ি যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হলো?
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের প্রতিবেদন বলছে, এর পেছনে ছিল উদ্বেগজনক গোয়েন্দা তথ্য। এ তথ্য পাওয়ার পরই দুই দেশের যুদ্ধ থামাতে তৎপর হয় যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ফোন করে যুদ্ধবিরতির আলোচনা শুরু করতে উৎসাহিত করেন। গত শুক্রবার সকালে যুক্তরাষ্ট্র ওই উদ্বেগজনক গোয়েন্দা তথ্য পায়। এ তথ্য পেয়ে ভ্যান্স আশঙ্কা করেন যে, ভারত-পাকিস্তানের মধ্যকার সংঘাত বড় যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। এরপরই এ সংঘাত থামানোর জন্য ভূমিকা নিতে বাধ্য হন ভ্যান্সসহ মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও অন্তর্বর্তীকালীন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মার্কো রুবিও এবং হোয়াইট হাউজের চিফ অব স্টাফ সুসি উইলিস।
জেডি ভ্যান্স প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে এ বিষয়ে তার পরিকল্পনা জানান এবং এরপর শুক্রবার দুপুরে তিনি সরাসরি ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করেন। ফোনালাপে ভ্যান্স ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে স্পষ্ট করেই বলেন, সংঘাত থামানো না গেলে তা মারাত্মক রূপ নেওয়ার প্রবল আশঙ্কা আছে। তিনি মোদিকে পাকিস্তানের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করে উত্তেজনা কমানোর পথ খুঁজে বের করতে বলেন।
ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা সিএনএনকে এমন কথাই জানিয়েছেন। তারা জানান, মার্কো রুবিওসহ মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তারা পরে ভারত-পাকিস্তান উভয়পক্ষের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গেই রাতভর যোগাযোগ চালিয়ে গেছেন।
ট্রাম্প প্রশাসনের ভূমিকা ছিল মূলত দুপক্ষকে আলোচনায় আনা, যুদ্ধবিরতি চুক্তি করানো নয়। মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, মোদির সঙ্গে ভ্যান্সের ফোনালাপ ছিল যুদ্ধবিরতি প্রক্রিয়ায় নাটকীয় মোড়। কিন্তু এর নেপথ্যে ছিল যে উদ্বেগজনক গোয়েন্দা তথ্য, সে সম্পর্কে খোলাসা করে কিছু বলেননি মার্কিন কর্মকর্তারা। স্পর্শকাতরতার কারণে তথ্যটি কী ছিল বা কী ধরনের ছিল, তা জানাতে অস্বীকৃতি জানান তারা।
গত ২২ এপ্রিল কাশ্মীরের পেহেলগামে জঙ্গি হামলা কেন্দ্র করে ভারত ও পাকিস্তানের পাল্টাপাল্টি হামলার চার দিন পর শনিবার অনেকটা আকস্মিকভাবেই দুই দেশ যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছে।
সিএনএন লিখেছে, অস্ত্রবিরতির কথা প্রথম ঘোষণা করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প; এ সফলতার কৃতিত্বও তিনি দাবি করেন, তবে এ সমঝোতার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততার মাত্রা নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের ভাষ্য সাংঘর্ষিক।
সংবাদমাধ্যমটি বলছে, অস্ত্রবিরতির ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা বাদে তা লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে উভয়পক্ষ; তাতে এই সমঝোতা কতদিন স্থায়ী হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ভারত ও পাকিস্তানে যখন সন্ধ্যা নামছিল, তখন ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যাল পোস্টে অস্ত্রবিরতির ঘোষণা দেন। তিনি লেখেন, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় রাতভর দীর্ঘ আলোচনার পর, আমি আনন্দের সঙ্গে ঘোষণা করছি যে, ভারত ও পাকিস্তান একটি ‘পূর্ণ ও তাৎক্ষণিক অস্ত্রবিরতিতে’ সম্মত হয়েছে। দুই দেশের নেতাদের ‘কাণ্ডজ্ঞান ও গভীর বুদ্ধিমত্তার’ প্রশংসা করে তাদের অভিনন্দন জানান তিনি।
খানিকবাদে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও দাবি করেন, ভারত ও পাকিস্তান শুধু অস্ত্রবিরতিতেই সম্মত হয়নি, সেই সঙ্গে ‘একটি নিরপেক্ষ স্থানে বিস্তৃত পরিসরে আলোচনা শুরু করতেও’ রাজি। রুবিও বলেন, দুদিন ধরে তিনি ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স দুই দেশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলার পর এ অস্ত্রবিরতি সম্ভব হয়েছে।
এক মিনিট পরই পাকিস্তান জানায়, যুদ্ধবিরতি তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হয়েছে। এর পরপরই ভারতের তরফেও তা নিশ্চিত করা হয়। সমঝোতাটি ‘দুই দেশের মধ্যে সরাসরি সম্পাদিত হয়েছে’ বলে ভারতের তথ্য মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য। এভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা খাটো করে ট্রাম্পের দাবিকে কার্যত অস্বীকার করা হয়। ভারতের তথ্য মন্ত্রণালয় বলেছে, আরও আলোচনা করার কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। কিন্তু পাকিস্তানি কর্মকর্তারা ওয়াশিংটনের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। দেশটির প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ বলেছেন, এ অঞ্চলের শান্তির জন্য নেতৃত্বদান ও সক্রিয় ভূমিকার জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে আমরা ধন্যবাদ জানাই।
আলোচনায় সম্পৃক্ত এক পাকিস্তানি সূত্র সিএনএনকে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র, বিশেষ করে মার্কো রুবিও এ চুক্তি সম্পাদনে মুখ্য ভূমিকা রেখেছেন। অস্ত্রবিরতি কার্যকর হওয়ার আগমুহূর্ত পর্যন্ত আলোচনায় অনিশ্চয়তা ছিল।
সিএনএন লিখেছে, দুই পুরনো প্রতিদ্বন্দ্বীর অস্ত্রবিরতি প্রক্রিয়া নিয়ে পরস্পরবিরোধী ভাষ্যে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। বিশ্লেষকদের মতে, নিজেদের উদীয়মান পরাশক্তি হিসেবে দেখা ভারত সবসময় আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতা এড়িয়ে চলে। অন্যদিকে, বিদেশি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল পাকিস্তান মধ্যস্থতাকে স্বাগত জানায়।
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান হাডসন ইনস্টিটিউটের ভারত ও দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক গবেষক ড. অপর্ণা পান্ডে বলেন, ভারত কোনো বিরোধে কখনই মধ্যস্থতা মেনে নেয়নি, তা ভারত-পাকিস্তান বিরোধ হোক, ভারত-চীন বিরোধ হোক বা অন্য যেকোনো বিষয় হোক না কেন। অন্যদিকে পাকিস্তান সর্বদাই আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতা চেয়েছে, তাই তারা মধ্যস্থতার প্রশংসা করবেই। তিনি বলেন, কাশ্মীর ইস্যু নিয়ে আলোচনা ও সমাধানের জন্য ভারতের ওপর চাপ তৈরি করাই তাদের একমাত্র উপায়।
শনিবারের অস্ত্রবিরতির আগে যে লড়াই হয়েছে, তাতে উভয়পক্ষই দাবি, পাল্টা দাবি ও বিভ্রান্তিকর তথ্য জুগিয়েছে। এখন সংঘাত থেমে যাওয়ায় দুপক্ষই লড়াইয়ের অর্জন ও সমাপ্তি প্রক্রিয়া নিয়ে জনমত গঠনে জোর চেষ্টা চালাচ্ছে।
সিএনএন বলছে, শনিবার সকালের তীব্র লড়াইয়ের পর সন্ধ্যায় যুদ্ধবিরতির ঘোষণা ছিল বেশ বিস্ময়কর।
পাকিস্তান শনিবার ভোররাতে দাবি করে, ভারত তাদের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিমান ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। তাদের দাবি, পাকিস্তানশাসিত কাশ্মীর থেকে রাজধানী ইসলামাবাদের কাছাকাছি একটি সামরিক ঘাঁটি পর্যন্ত এ হামলা হয়েছে। এর জবাবে ভারতের সামরিক বিমান ঘাঁটিগুলোতে পাল্টা হামলা চালানোর কথাও বলেছে ইসলামাবাদ। কয়েক ঘণ্টা বাদে ভারতশাসিত কাশ্মীরের বৃহৎ শহর শ্রীনগর ও জম্মুতে বিস্ফোরণের খবর আসে। প্রধানমন্ত্রী শরিফ বলেন, ভারতীয় আগ্রাসনের ‘জোরালো জবাব’ দিয়েছে পাকিস্তান।
চার দিন ধরে একে অন্যের ভূখণ্ডে সরাসরি সামরিক হামলা চালানোয় অনেকেই আশঙ্কা করছিলেন, কার্যকর আন্তর্জাতিক চাপ না থাকলে এ পাল্টাপাল্টি হামলা আরও বাড়বে।
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীনতা লাভের পর থেকে ভারত ও পাকিস্তানের উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে রয়েছে কাশ্মীর নিয়ে বিরোধ।
ব্রিটিশ ভারতের রক্তাক্ত বিভাজনে হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় ভারত এবং মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা নিয়ে পাকিস্তান গঠিত। দুই দেশই কাশ্মীরকে সম্পূর্ণভাবে নিজেদের দাবি করে, যদিও কাশ্মীরের দুই অংশ দুই দেশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। স্বাধীনতা লাভের কয়েক মাসের মধ্যেই তারা ওই ভূখণ্ড নিয়ে যুদ্ধে জড়ায়, যা ছিল তিনটি যুদ্ধের মধ্যে প্রথম।
গত ২৬ এপ্রিল ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের পাহাড়ি পর্যটনস্থল পেহেলগামে একদল দর্শনার্থীর ওপর বন্দুকধারীরা গুলি চালায়। এ হামলায় অন্তত ২৫ ভারতীয় নাগরিক ও একজন নেপালি নিহত হন।
নয়া দিল্লি তাৎক্ষণিভাবে আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাসবাদে সমর্থনের অভিযোগ তুলে ইসলামাদের ওপর এ ঘটনার দায় চাপায়। পাকিস্তান হামলায় কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা প্রত্যাখ্যান করে।
পেহেলগাম হত্যাকাণ্ডের দুই সপ্তাহ পর গত বুধবার পাকিস্তান ও তাদের নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর অঞ্চলে ধারাবাহিক হামলা চালায় ভারত। ওই অভিযানের নাম তারা দেয় ‘অপারেশন সিঁদুর’। এরপরের সংঘাতের পরিধি আগের লড়াইগুলোর চেয়ে অনেক বিস্তৃত হয়, উভয়পক্ষই একে অন্যের ভূখণ্ডের গভীরে হামলা চালায়।
দুই দেশই একে অন্যের বিরুদ্ধে ভিসা স্থগিত ও বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপের মতো ব্যবস্থা নেয়। ভারত একটি গুরুত্বপূর্ণ পানিবণ্টন চুক্তি থেকে সরে আসার কথা জানায়। এ পদক্ষেপগুলো প্রত্যাহার করা হবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।