সময় তখন প্রায় মধ্যরাত ছুঁই ছুঁই। আলিয়াঞ্জ অ্যারেনার নিচতলায় ছোট একটি জানালাবিহীন কক্ষে বসে আছেন হ্যারি কেন। মাঠের বাইরে তখন ফানুস, আতশবাজি আর উল্লাসের হুল্লোড়। বায়ার্ন মিউনিখ তাদের ৩৪তম লিগ শিরোপা জয়ের আনন্দে মত্ত। কিন্তু এই কক্ষে যেন এক আলাদা প্রশান্তি। কারণ যিনি বসে আছেন, তার মুখে এক নতুন চেহারা—না, কেবলমাত্র সোনালি মেডেল নয়, বরং হারিয়ে যাওয়া বেদনার ছাপ মুছে এবার যেন ফিরে এসেছে স্বস্তির এক প্রশান্ত হাসি।
বলা হচ্ছিল হ্যারি কেইনের কথা। দীর্ঘদিন ধরে শুধু অন্যদের হাতে ট্রফি উঠতে দেখেছেন। ইংল্যান্ডের জার্সিতে গোলের পর গোল, টটেনহ্যামের হয়ে রেকর্ড ভাঙা নৈপুণ্য—সবই ছিল, কেবল একটিই ছিল না, ক্লাব ট্রফির স্বাদ। বারবার ফাইনালে গিয়ে ফিরতে হয়েছে খালি হাতে। এবার সেই চিত্র পাল্টেছে। সেই স্বাদ পূরণের পর অনুভূতি জানিয়েছেন দ্য গার্ডিয়ানকে। দেশ রূপান্তরের পাঠকদের জন্য সেটাই তুলে ধরা হলো:-
প্রশ্ন: এতদিন পর ক্লাব ট্রফির স্বাদ পেলেন। কেমন লাগছে এই অনুভূতি?
হ্যারি কেইন: এটা দারুণ একটা অনুভূতি। সত্যি বলতে, এত বছর ধরে অন্যদের ট্রফি জিততে দেখেছি, এবার নিজেই সেই অনুভবটা নিতে পেরেছি—এটা আলাদা কিছু। আমি অনেক ট্রফি উৎসব দেখেছি, এবার আমি নিজে অংশ নিতে পেরে দারুণ উচ্ছ্বসিত।
প্রশ্ন: বুন্দেসলিগা জয়টা আপনার জীবনে কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
হ্যারি কেইন: এটা আমার ক্যারিয়ারের এক বড় মাইলফলক। আমি সবসময় চেয়েছি নিজেকে বড় মঞ্চে প্রমাণ করতে। স্পার্সে থাকতে আমি গোল করতাম ঠিকই, কিন্তু বড় ম্যাচ, বড় ট্রফি—সেগুলোর অভাব ছিল। এবার অন্তত একটা অর্জন হলো, এটা শুরু মাত্র।
প্রশ্ন: ট্রফি জয় কি আপনাকে একজন খেলোয়াড় হিসেবে বদলে দিয়েছে?
হ্যারি কেইন: না, আমি আগেও যেমন ছিলাম, এখনও তেমনই। তবে এটা বলতে পারি, যাদের বলার ছিল ‘ও তো কিছুই জেতেনি’—তাদের কথার পরিসমাপ্তি কিছুটা হলেও হলো। তবে ফুটবলে তো সবসময়ই কেউ না কেউ কিছু বলবেই!
প্রশ্ন: প্রথম ট্রফি জয় মানে কি চাপ কমে যাওয়া?
হ্যারি কেইন: খানিকটা তো বটেই। চাপ সবসময় ছিল—নিজের উপর নিজেই চাপ দিতাম। প্রতিবার ভাবতাম, ‘এইবার বুঝি পারব’। এতদিনে যে তা সম্ভব হলো, তা আমার জন্য একটা স্বস্তি।
প্রশ্ন: স্পার্স ছাড়ার সিদ্ধান্তটা কতটা কঠিন ছিল?
হ্যারি কেইন: খুব কঠিন। আমি স্পার্সেই থাকতে পারতাম, প্রিমিয়ার লিগে গোল করে যেতে পারতাম। কিন্তু আমি চেয়েছিলাম নিজেকে চ্যালেঞ্জ করতে, বড় মঞ্চে খেলতে। সেই লক্ষ্যেই বায়ার্নে আসা। ট্রফি জয়ের স্বাদ পাওয়ার জন্যই এই সিদ্ধান্ত।
প্রশ্ন: বায়ার্নে এসে প্রথম মৌসুমে কিছুই জেতা হয়নি। তখন হতাশ হয়েছিলেন?
হ্যারি কেইন: অবশ্যই হতাশা ছিল। এমন সফল ক্লাবে এসে কিছু না জেতা সত্যিই দুঃখজনক ছিল। কিন্তু আমি হাল ছাড়িনি। এবার তার ফল পেলাম।
প্রশ্ন: পরিবার ও পুরোনো কোচদের সঙ্গে উদযাপন কেমন ছিল?
হ্যারি কেইন: অসাধারণ! স্ত্রী, সন্তান, এমনকি টটেনহ্যামের পুরোনো কোচ টিম শেরউড আর একাডেমি প্রধান জন ম্যাকডারমট পর্যন্ত উপস্থিত ছিলেন। এতদিনের পথচলার সঙ্গীদের সঙ্গে এই মুহূর্ত ভাগাভাগি করতে পারাটা সত্যিই স্পেশাল।
প্রশ্ন: আপনি একসময় নরউইচ ও লেস্টারে গিয়ে সুযোগই পাচ্ছিলেন না। সেই সময়গুলো নিয়ে ভাবলে কেমন লাগে?
হ্যারি কেইন: সেই সময়গুলোই আমাকে গড়ে তুলেছে। তখন বাড়তি অনুশীলন করতাম, অনেকে হাসাহাসি করত—‘কেন এত কষ্ট করছো?’ কিন্তু আমি জানতাম, এই ছোট ছোট চেষ্টাগুলোই একদিন বড় পার্থক্য গড়ে দেবে।
প্রশ্ন: টম ব্র্যাডির গল্প আপনাকে কতটা অনুপ্রেরণা দিয়েছে?
হ্যারি কেইন: অনেকটা। ব্র্যাডি যেমন আন্ডারডগ ছিল, আমিও ছিলাম। ওর গল্প দেখে বুঝেছি—পরিশ্রম, অধ্যবসায়, আর নিজের উপর বিশ্বাস থাকলে কিছুই অসম্ভব নয়।
প্রশ্ন: মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করার পেছনে কারণ কী?
হ্যারি কেইন: আমি নিজেই এমন সময়ের ভেতর দিয়ে গেছি, যখন মানসিকভাবে শক্ত থাকা কঠিন ছিল। আমি চাই, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বুঝুক—নিজেকে বুঝে নেওয়া, কথা বলা কত জরুরি। তাই হ্যারি কেইন ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে এই বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে চাই।
প্রশ্ন: তরুণদের উদ্দেশ্যে আপনার পরামর্শ কী?
হ্যারি কেইন: কখনো হাল ছেড়ো না। জীবনে ভালো-মন্দ দুটোই থাকবে। সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে নিজের উপর বিশ্বাস রাখা কঠিন, কিন্তু সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পরিবার, বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলো, নিজের আবেগ ভাগ করে নাও। কথা বলাই সবচেয়ে ভালো ওষুধ।
প্রশ্ন: আপনি কি মনে করেন, সমালোচকরা এখন চুপ করবে?
হ্যারি কেইন: ফুটবলে তো কেউ কখনো থামে না। আজকে বলবে—‘একটা ট্রফি পেয়েছে, কিন্তু এটা পায়নি।’ আমি জানি, এমন চলবে। তবে এখন একটা কথাই বলি—আমি ঠিক পথেই আছি।