এনবিআর দুই ভাগ

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড  (এনবিআর) সংস্কারে গত বছর অক্টোবর মাসে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি পরামর্শক কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু ওই কমিটির প্রতিবেদন আমলে না নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় একতরফাভাবে এনবিআর বিলুপ্ত করে দুটি পৃথক বিভাগ গঠন করেছে। গত সোমবার রাতে বহুল আলোচিত ‘রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ’ জারি করা হয়। এই নিয়ে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। 

এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বলছেন, অধ্যাদেশ জারি করাকে কেন্দ্র করে যাতে কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি না হয়, সে জন্য রাতে অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে। এ অধ্যাদেশ বর্তমানে এনবিআরে কর্মরত কর ও শুল্ক কর্মকর্তাদের স্বার্থের পরিপন্থী বলে দাবি করেছেন তারা। অধ্যাদেশটি প্রত্যাহার করে পরামর্শক কমিটির প্রতিবেদন আমলে নিয়ে সব অংশীজনের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে নতুন করে অধ্যাদেশ জারির দাবিও জানানো হয়েছে। এ লক্ষ্যে তারা তিনদিনের কলম বিরতি ঘোষণা করা হয়েছে।

এদিকে এনবিআর ভাগ করার উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এনবিআর পৃথকীকরণের বিষয়ে স্পষ্টীকরণ করে গণমাধ্যমে বিবৃতি পাঠিয়েছে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়। তবে প্রশ্ন উঠেছে পরামর্শক কমিটির সুপারিশ কেন উপেক্ষা করা হলো।

বাংলাদেশের রাজস্ব কাঠামো সংস্কারের বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে পরামর্শ দিয়ে আসছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)।

সংস্থাটির শর্ত মেনে রাজস্ব আহরণে নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন কার্যক্রম পৃথক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। কোন প্রক্রিয়ায় এটি করলে ভালো হয়, তা নির্ধারণের জন্য একটি পরামর্শক কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটির প্রধান ছিলেন এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. আবদুল মজিদ। এছাড়া সদস্য হিসেবে ছিলেন সংস্থাটির আরেক সাবেক চেয়ারম্যান ড. নাসিরউদ্দিন আহমেদ, এনবিআরের সাবেক সদস্য দেলোয়ার হোসেন, ফরিদ উদ্দিন ও আমিনুর রহমান। ওই কমিটি একটি প্রতিবেদন প্রণয়ন করেছে। কিন্তু সেই প্রতিবেদন জনসম্মুখে প্রকাশ করা হয়নি। যদিও অন্যান্য সব সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। এমনকি পরামর্শক কমিটির সুপারিশ আমলে না নিয়েই অর্থ মন্ত্রণালয় নিজেদের মতো করে গত সোমবার গভীর রাতে এনবিআর বিলুপ্তির প্রজ্ঞাপন জারি করে।

এদিকে সরকারের এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছেন এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। গতকাল মঙ্গলবার তারা রাজধানীর আগারগাঁওয়ে এনবিআর ভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। এ সময় তারা অধ্যাদেশ বাতিলের দাবিতে আগামী তিন কার্যদিবস কলম বিরতি পালনের ঘোষণা দেন। ‘এনবিআর সংস্কার ঐক্য পরিষদ’ শীর্ষক এক প্ল্যাটফর্মের ব্যানারে ‘রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ’ বাতিলে দাবি জানানো হয়। এই প্ল্যাটফর্মের আওতায় এনবিআরের ক্যাডার ও নন-ক্যাডার উভয় পর্যায়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

গত সোমবার গভীর রাতে বহুল আলোচিত ‘রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ’ জারি করা হয়। অধ্যাদেশটিতে শুধুমাত্র রাজস্ব নীতি বিভাগের কার্যপরিধিতে সামান্য পরিবর্তন আনা হয়েছে। আর রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রশাসনিক পদগুলোতে প্রশাসন ক্যাডার কর্মকর্তাদের পাশাপাশি আয়কর ও কাস্টমস ক্যাডারের কর্মকর্তাদের রাখা হয়েছে।

অধ্যাদেশের খসড়ায় রাজস্ব নীতি বিভাগ কর আইন প্রয়োগ ও কর আদায় পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ পরিবীক্ষণ করবে। আর রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগে প্রশাসনিক অনুবিভাগের বিভিন্ন পদ প্রশাসন ক্যাডার ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগের মাঠপর্যায়ের কর্মরত কর্মচারীদের মাধ্যমে পূরণ করা হবে।

অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, রাজস্ব নীতি বিভাগ কর আইন প্রয়োগ এবং কর আহরণ পরিস্থিতি মূল্যায়ন করবে। অর্থাৎ ‘পরিবীক্ষণ’ শব্দের পরিবর্তে ‘মূল্যায়ন’ শব্দটি যোগ করা হয়েছে। আর রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগে প্রশাসনিক অনুবিভাগের বিভিন্ন পদ প্রশাসন ক্যাডারের পাশাপাশি আয়কর ও কাস্টমস ক্যাডারের কর্মকর্তা ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগের মাঠপর্যায়ে কর্মরত কর্মচারীদের মাধ্যমে পূরণ করা হবে।

মূলত এ অধ্যাদেশের ফলে প্রশাসনিক পদগুলোতে কর এবং শুল্ক ও আবগারি ক্যাডারের কর্মকর্তাদের পদায়নের সুযোগ সীমিত করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করে। এ বিষয়ে পরামর্শক কমিটি রাজস্ব বিভাগ পৃথক করা হলেও পৃথকীকৃত প্রতিষ্ঠানের সব পর্যায়ে কর ও শুল্ক বিভাগ থেকে জনবল নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছিল। কিন্তু সেই প্রতিবেদন আমলে নেওয়া হয়নি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পরামর্শক কমিটির সদস্য ড. নাসিরউদ্দিন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা যে প্রতিবেদন দিয়েছি, সেটি সরকার তেমন আমলে নেয়নি। তবে আমলে নেওয়া না নেওয়া সরকারের এখতিয়ার।’

প্রতিবেদনে কী ধরনের সুপারিশ করা হয়েছিল এমন প্রশ্নের জবাবে নাসিরউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আমরা এনবিআরকে নীতি ও বাস্তবায়ন দুই ভাগে ভাগ করার পাশাপাশি এর সব পদে কর ও শুল্ক ক্যাডারের কর্মকর্তাদের পদায়নের সুপারিশ করেছিলাম। যাতে করে এই দুই ক্যাডারের কর্মকর্তাদের ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট প্রক্রিয়াটা মসৃণ হয় এবং মেধাবীরা এসব ক্যাডারে আসতে উৎসাহিত হন। কিন্তু সেই প্রস্তাব রাখা হয়নি।’

নতুন অধ্যাদেশ অনুযায়ী, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের জনবল রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগে ন্যস্ত হবে। এই জনবল থেকে প্রয়োজনীয় জনবল রাজস্ব নীতি বিভাগে পদায়ন করা যাবে। এছাড়া অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ (আইআরডি) বিলুপ্ত হয়ে তার জনবল রাজস্ব নীতি বিভাগে ন্যস্ত হবে।

গতকাল অবস্থান কর্মসূচিতে বক্তব্য দেন যুগ্ম কর কমিশনার মোনালিসা শাহরিন সুস্মিতা ও কাস্টমসের অতিরিক্ত কমিশনার সাধন কুমার কু-ু। তারা বলেন, সরকার যে সংস্কার উদ্যোগ নিয়েছে, সে বিষয়ে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। আমরা নিজেরাও সংস্কার চাই। কিন্তু সেই সংস্কার হতে হবে রাজস্ব বিষয়ক সব অংশীজনের মতামতের ভিত্তিতে। যাতে জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষিত হয় এবং কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীস্বার্থ প্রাধান্য না পায়। তারা পরামর্শক কমিটির প্রতিবেদন জনসম্মুখে প্রকাশ করার দাবি জানান এবং ওই প্রতিবেদনের সুপারিশগুলোর ওপর সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের নিয়ে আলোচনার ভিত্তিতে নতুন করে অধ্যাদেশ জারির দাবি জানান।

এদিকে এনবিআর ভাগ করার উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এ বিষয়ে সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ভেঙে দুটি নতুন বিভাগ গঠনের সিদ্ধান্ত সাহসী ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ। এই সংস্কারের ফলে বাংলাদেশের কর প্রশাসনের আধুনিকীকরণ, রাজস্ব বৃদ্ধি ও ব্যবস্থাপনা আরও দক্ষ হবে। তবে এই সংস্কারের সফলতা অনেক বিষয়ের ওপর নির্ভর করবে। বাংলাদেশের সামগ্রিক কর ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কার দরকার। বাড়াতে হবে করের আওতা। করছাড় কমাতে ও পরোক্ষ করের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা থেকে সরে আসার জন্য জোরালো প্রচেষ্টা নেওয়া উচিত। প্রত্যক্ষ কর, বিশেষ করে আয়করের ভূমিকা বাড়াতে হবে। জনসংখ্যার ধনী অংশ, যারা সঠিকভাবে কর দেয় না, তাদের করের আওতায় আনতে হবে।

সংস্কার বিষয়ে কর্মকর্তারা দ্বিমত করলেও রাজস্ব আহরণে প্রভাব পড়বে না বলে মনে করেন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ। গতকাল সচিবালয়ে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠক শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, এনবিআর বিলুপ্ত করে দুটি বিভাগ গঠন করা হলেও প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তাদের দুশ্চিন্তার কারণ নেই। সব দেশেই এমন আলাদা বিভাগ থাকে। এনবিআরের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করেই এটা করা হয়েছে। এতে করে রাজস্ব আদায়ে এর প্রভাব পড়বে না। সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, রাজস্ব আদায়ে প্রভাব পড়বে না। এখন পর্যন্ত রাজস্ব আদায় গতবারের তুলনায় ২ শতাংশ বেশি হয়েছে। খুব হতাশাব্যঞ্জক নয়, আমরা আরও প্রত্যাশা করছি। অন্তত গতবারের তুলনায় কম হবে না।

এনবিআর পৃথকীকরণের বিষয়ে স্পষ্টীকরণ করে গণমাধ্যমে বিবৃতি পাঠিয়েছে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়। বিবৃতিতে বলা হয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ভেঙে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনে রাজস্ব নীতি বিভাগ এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ নামে দুটি স্বতন্ত্র বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। এটি একটি বড় কাঠামোগত সংস্কার এবং এই সিদ্ধান্তের লক্ষ্য হলো রাজস্ব আহরণ ব্যবস্থাপনা থেকে রাজস্ব নীতি প্রণয়ন কার্যক্রমকে পৃথক করার মাধ্যমে দেশের রাজস্ব ব্যবস্থার দক্ষতা বৃদ্ধি, স্বার্থের দ্বন্দ্ব হ্রাস এবং রাজস্ব আহরণের আওতাকে সম্প্রসারিত করা।

বিবৃতিতে বলা হয়, পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় আগে প্রতিষ্ঠিত এনবিআর ধারাবাহিকভাবে তার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত প্রায় ৭.৪ শতাংশ, যা এশিয়ার সবচেয়ে কম কর-জিডিপি অনুপাতের মধ্যে একটি (বিশ্বব্যাপী এ অনুপাত গড়ে ১৬.৬ শতাংশ, মালয়েশিয়ায় এ অনুপাত ১১.৬ শতাংশ)। জনগণের কাক্সিক্ষত উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য, বাংলাদেশকে অবশ্যই কর-জিডিপি অনুপাত কমপক্ষে ১০ শতাংশে উন্নীত করতে হবে।

এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য এনবিআর পুনর্গঠন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কর নীতি প্রণয়ন এবং তা কার্যকর করার জন্য একটি একক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নেওয়া উচিত নয় এই ধরনের ব্যবস্থা স্বার্থের দ্বন্দ্ব (কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট) তৈরি করে। এটি ধীরগতিসম্পন্ন ও অদক্ষতা বাড়ায়। বছরের পর বছর বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করে আসছেন যে, বিদ্যমান নীতিমালাগুলো প্রায়শই ন্যায্যতা, প্রবৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার চেয়ে রাজস্ব সংগ্রহকে অগ্রাধিকার দেয়।