জিপিওর জায়গায় সচিবালয় বর্ধিত করার উদ্যোগ!

রাজধানীর গুলিস্তানের জিরো পয়েন্টে অবস্থিত ডাক অধিদপ্তরের জেনারেল পোস্ট অফিসের (জিপিও) জায়গায় সচিবালয় বর্ধিত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে মাস্টারপ্ল্যান পরিবর্তনের কাজও শুরু হয়েছে। মন্ত্রণালয় ও দপ্তরগুলো এ নিয়ে বেশ কয়েক দফা চিঠি চালাচালি করেছে। তবে ঘোর আপত্তি করেছে ডাক বিভাগ।

তারা বলছে, জিপিওর জায়গা পরিত্যক্ত দেখিয়ে সচিবালয় বর্ধিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ ধরনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হলে ডাক ব্যবস্থা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে চলে যাবে। যার ফলে জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। তাই অবিলম্বে সরকারকে এই উদ্যোগ থেকে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছেন ডাকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

ডাক বিভাগের তথ্যমতে,  অন্তত ২৫টি সরকারি অফিসের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। একদিনের জন্যও জায়গাটি পরিত্যক্ত ছিল না। প্রতিদিনই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নানা কাজ এখান থেকে সম্পাদিত হচ্ছে। সরেজমিনেও ঢাকা মেট্রো সার্কেলের অফিসসহ অসংখ্য অফিসের কার্যক্রম সেখানে দেখা গেছে।

গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, গত ১৭ এপ্রিল সচিবালয়ের মাস্টারপ্ল্যান সংশোধনের জন্য প্রধান স্থপতিকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব মো. নাজমুল আলম স্বাক্ষরিত সেই চিঠিতে বলা হয়,  ঢাকার গুলিস্তানের জিরো পয়েন্টে অবস্থিত ডাক বিভাগের জিপিও ভবন এলাকার ৪ দশমিক ৮০১৬ একর জায়গা ইতিমধ্যে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এই জমি সংযুক্ত করে বাংলাদেশ সচিবালয়ের মাস্টারপ্ল্যান সংশোধনপূর্বক দ্রুত মন্ত্রণালয়ে প্রেরণের জন্য বলা হয়।

গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন অনুবিভাগ-১) মো. আব্দুল মতিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জিপিওর জায়গায় সচিবালয় বর্ধিত করার আগে মাস্টারপ্ল্যান সংশোধন করতে হবে। এ জন্য সচিবালয়ের মাস্টারপ্ল্যান সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে স্থাপত্য অধিদপ্তরকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে বিষয়গুলো এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে আছে।

স্থাপত্য অধিদপ্তরের প্রধান স্থপতি মীর মনজুরুর রহমান জানান, নতুন যোগদান করার করণে বিস্তারিত তথ্য তার কাছে নেই। তবে অধিদপ্তরের আরও কয়েকজন স্থপতির সঙ্গে যোগাযোগ করেও এ বিষয়ে বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এদিকে, গত ২৫ মার্চ প্রধান উপদেষ্টার অনুমোদনের জন্য গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে একটি সারসংক্ষেপ পাঠানো হয়। সেখানে জিপিওর জায়গাটিকে খালি এবং পরিত্যক্তা হিসাবে উল্লেখ করা হয়। সেখানে বলা হয়, ২০১০ সালে শেরে বাংলা নগরের প্রশাসনিক এলাকায় গৃহায়ন ও গণপূর্তের হস্তান্তরিত জমিতে ডাক বক্সের আদলে ১৪ তলা ভবন নির্মাণ করে ডাক অধিদপ্তরের সদর দপ্তরসহ অন্যান্য কার্যক্রম গুলিস্তান থেকে শেরে বাংলা নগরের নবনির্মিত ভবনে স্থানান্তর করা হয়। ফলে ৬০ বছরেরও বেশি পুরানো গুলিস্তান জিপিও ভবনটি বর্তমানে অব্যবহৃত এবং পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে।

বাংলাদেশ সচিবালয়ের জন্য নির্ধারিত ২০ দশমিক ৮৩ একর জমিতে বর্তমানে ৪২টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। প্রতিনিয়ত বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কার্যক্রম ও জনবল বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে সচিবালয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অফিসের স্থান সংকুলান করা যাচ্ছে না। ডাক অধিদপ্তরের অব্যবহৃত স্থানটি সচিবালয় সংলগ্ন হওয়ায় ওই স্থানে নতুন ভবন নির্মাণ করে সচিবালয়ের কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হলে সচিবালয়ের স্থান সংকটের সমাধান হবে এবং মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমে গতিশীলতা আসবে।

সূত্র বলছে, জিপিওর জায়গায় সচিবালয় সম্প্রসারণের জন্য ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ থেকে অধিদপ্তরের মতামত জানতে চাওয়া হয়। সেখানে তারা ২৫টি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম উল্লেখ করে। এরমধ্যে পোস্টমাস্টার জেনারেলের কার্যালয় (কেন্দ্রীয় সার্কেল ও মেট্রোপলিটন সার্কেল); জেনারেল ম্যানেজার, ডাক জীবনবীমা (পূর্বাঞ্চল) এর কার্যালয়; আঞ্চলিক ম্যানেজার, ডাক জীবনবীমা এর কার্যালয়; ঢাকা জিপিও; ডিপিএমজি ঢাকা নগরী দক্ষিণ বিভাগের কার্যালয়; ডিপিএমজি ঢাকা নগরী উত্তর বিভাগের কার্যালয়; ডিপিএমজি বৈদেশিক ডাক বিভাগের কার্যালয়; সহকারী জেনারেল ম্যানেজার, ডাক জীবনবীমা (মাঠ) এর কার্যালয়; ব্যাগ নিয়ন্ত্রণ অফিস; সহকারী নিয়ন্ত্রক (স্টাম্পে) এর কার্যালয়; স্টাম্পে গোডাউন (কেপিআই চিহ্নিত এলাকা); আন্তর্জাতিক ডাক অনুসন্ধান কেন্দ্র; ডেটা সেন্টার; টেলিফোন হিসাবরক্ষণ অফিস; চেয়ারম্যান, মেইলিং অপারেটর ও কুরিয়ার সার্ভিস লাইসেন্সিং কর্তৃকপক্ষ এবং রাজস্ব কর্মকর্তার কার্যালয়, কাস্টমস অ্যাসেসমেন্ট অফিস উল্লেখযোগ্য।

ডাক বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, ১৯৭১ সালের আগে ডাক বিভাগের সদর দপ্তর ছিল পাকিস্তানে। স্বাধীনতার পর  ঢাকায় অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা করা হয়। কোনো অফিস না থাকায় জিপিওর তিন তলায় ভাড়া অফিসে অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কার্যালয় পরিচালিত হতো। সরকার আগারগাঁওয়ে যে ভবন নির্মাণ করেছে সেটি সেই অধিদপ্তরের ভবন। কিন্তু এরপর জিপিও এই জায়গাটিকে নিজস্ব অপারেশনাল এরিয়া হিসাবে ব্যবহার করে আসছে। আগারগাঁওয়ে শুধুমাত্র সদর দপ্তর স্থানান্তরিত হয়েছে।

ঢাকা মেট্রো সার্কেলের পোস্টমাস্টার জেনারেল আলতাফুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের আপত্তির কথা মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছি। ডিজি অফিস আগারগাঁওয়ে স্থানান্তরের অন্যমত উদ্দেশ ছিল প্রশাসনিক ও অপারেটিভ কাজ আলাদা করা। কিন্তু হঠাৎ করে আমাদের সঙ্গে কথা না বলে এই জায়গাটিকে কীভাবে পরিত্যক্ত দেখানো হলো তা বোধগম্য নয়।’

তিনি বলেন, এখানে ২৫টি অফিসের মধ্যে ডাক বিভাগের অফিস-ই ২২টি। এসব অফিসে ২ হাজারের বেশি কর্মচারী কাজ করছেন। এখানে অন্য কোনো কিছু করার সিদ্ধান্ত ডাক যোগাযোগের জন্য মারাত্মক হুমকি।

মন্ত্রণালয়ে লেখা এক চিঠিতে ডাক বিভাগ বলছে, ডাক অধিদপ্তরের সদর দপ্তরের কার্যক্রম গুলিস্তান থেকে শেরে বাংলা নগরের নবনির্মিত ভবনে স্থানান্তরিত হলেও জিপিওসহ এই ভবনে অবস্থিত মোট ২৫টি দপ্তর স্থানান্তরিত হয়নি। জিপিও ভবন কোনো সময়ের জন্যই পরিত্যক্ত এবং অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকেনি বা এখনো নেই। শেরে বাংলা নগর প্রশাসনিক এলাকায় স্থানান্তরিত ডাক ভবনটি মূলত : ডাক অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কার্যালয় হিসেবে নির্মাণ করা হয়েছে। বর্তমানে ডাক ভবনে মহাপরিচালকের কার্যালয়, আন্তর্জাতিক ডাক হিসাবরক্ষণ অফিসের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। শেরে বাংলা নগরের নবনির্মিত ডাক ভবনে বর্তমানে কোনো ফ্লোর অব্যবহৃত নেই। তাই জিপিও ভবনে পরিচালিত কোনো অফিস নবনির্মিত ডাক ভবনে স্থানান্তর করা সম্ভব নয়।

ওই চিঠিতে আরও বলা হয়, ডাক বিভাগের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় একটি আধুনিক, প্রযুক্তি নির্ভর ডাক বিভাগ গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ চলমান রয়েছে। যেখানে উন্নত বিশ্বের মতো ডাকের সব কার্যক্রমকে অটোমেটেড ও যন্ত্রনির্ভর করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রযুক্তি নির্ভর অটোমেটেড মেইল প্রসেসিং সেন্টার স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। ঢাকা জিপিও চত্বরটি ডাক অধিদপ্তরের অনেকগুলো অফিস অবস্থিত হওয়ায় এবং ডাক যোগাযোগ ব্যবস্থা এই স্থানকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠায় এখানে অটোমেটেড মেইল প্রসেসিং সেন্টার স্থাপনের বিকল্প নেই।