রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে দুর্বৃত্তদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে নিহত হয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ছাত্রদল নেতা ও শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের ১৮-১৯ সেশনের শিক্ষার্থী শাহরিয়ার আলম সাম্য (২৫)। মঙ্গলবার রাত ১২টায় এ ঘটনা ঘটে।
পুলিশ বলছে, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ক্যাম্পাসের আধিপত্য দেখাতে গিয়ে এ খুনের ঘটনা ঘটেছে। দুপক্ষের বাগবিতন্ডার একপর্যায়ে ক্যাম্পাসের আধিপত্য দেখাতে যান সাম্য। ১০-১২ জনের একটি গ্রুপের সঙ্গে মারধরে জড়ান সাম্য ও তার দুই বন্ধু। মারধরের একপর্যায়ে সাম্যকে ধারালো অস্ত্রের আঘাতে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় গতকাল বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
এদিকে, সাম্য হত্যাকান্ডের ঘটনায় উত্তাল হয়ে ওঠে ঢাবি ক্যাম্পাস। গভীর রাতে বিক্ষোভে ফেটে পড়েন শিক্ষার্থীরা। রাতেই ছাত্রদল উপাচার্য ও প্রক্টরের পদত্যাগের দাবিতে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে বিক্ষোভ করে। নিহত সাম্যের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে আজ বৃহস্পতিবার শোক পালন ও অর্ধদিবস ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে ঢাবি প্রশাসন।
গতকাল সকালে নিহতের ভাই শরীফুল ইসলাম বাদী হয়ে শাহবাগ থানায় ১০-১২ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেছেন। মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে শাহবাগ থানার ওসি মোহাম্মদ খালিদ মুনসুর দেশ রূপান্তরকে বলেন, এ হত্যাকান্ডে জড়িত তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা হলেন মো. তামিম হাওলাদার (৩০), সম্রাট মল্লিক (২৮), ও মো. পলাশ সরদার (৩০)। তাদের রাজাবাজার ও গ্রিনরোড এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের মধ্যে সাম্য হত্যা মামলায় আটক হওয়া সম্রাট মাদারীপুর ডাসার উপজেলা শ্রমিক দলের সাংগঠনিক সম্পাদক। এ ছাড়া এ হত্যাকান্ডে আরও যারা জড়িত রয়েছেন, তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে জানান ওসি।
গতকাল দুপুরে এ হত্যাকান্ডের বিষয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে দায়িত্বরত আনসার কমান্ডার শামসুদ্দিনের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, উদ্যানের পাঁচটি গেটে পাঁচজন আনসার সদস্য দায়িত্ব পালন করেন। রাত ১২টায় যখন এ ঘটনা ঘটে, তখন উদ্যানে রমনার কালীমন্দির গেটে দায়িত্বে ছিলেন আনসার সুজন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে আনসারের এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ক্যাম্পাসের ছেলেরা সবসময়ই একটু ক্ষমতা দেখায়। ক্যাম্পাসের আধিপত্য দেখাতে গিয়ে এই খুনের ঘটনা ঘটে। ধাক্কাধাক্কি ঘটনার মধ্যেই কেউ একজন ছুরিকাঘাত করে। তিনি আরও বলেন, সাম্যর সঙ্গে যাদের ধাক্কাধাক্কি হয়, তারা সংখ্যায় অনেক ছিল।
গতকাল বেলা ১১টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল মর্গে সাম্যর মরদেহ ময়নাতদন্ত শেষ হয়। সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেন শাহবাগ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আবুল কালাম। তিনি উল্লেখ করেন, সাম্যর ডান পায়ের রানের পেছনের অংশে কাটা জখম রয়েছে। এ ছাড়া পিঠের মাঝ বরাবর লালচে দাগ রয়েছে।
নিহত সাম্যর বাবা মো. ফখরুল আলম বলেন, ‘গত পরশু (সোমবার) ছেলের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছিলাম। তখনো সে আমাকে বলল, বাবা তুমি চিন্তা করো না, আমি ভালো আছি। এরপর কাল রাতেই (মঙ্গলবার) আমার ছেলের মৃত্যুর খবর আসল।’ তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার ছেলে খুবই ঠান্ডা স্বভাবের ছিল। কারও সঙ্গে কোনো ঝামেলায় জড়াত না। বিগত আওয়ামী লীগ শাসনামলে সে হলেও থাকতে পারেনি; ওর বড় ভাই ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতা ছিল বলে। ৫ আগস্টের পর সে হলে সিট পেয়েছে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সামনে শুধু বাইকে ধাক্কা লাগার মতো তুচ্ছ কারণে এমন ঘটনা ঘটায়নি তারা। ওকে মেরে ফেলার জন্য পূর্বপরিকল্পিভাবেই এটি করেছে। আমি আমার ছেলে হত্যার সর্বোচ্চ বিচার চাই। ভবিষ্যতে যাতে আর কোনো মায়ের বুক খালি না হয়।’
ঢাবিতে সাম্যর জানাজা : আইইআর ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী সাম্যর জানাজা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে বাদ জোহর অনুষ্ঠিত হয়েছে। জানাজা শেষে তার লাশ গ্রামের বাড়ি সিরাজগঞ্জে নেওয়া হয়। সেখানে দ্বিতীয় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তার মরদেহ দাফন করা হবে।
এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খান, উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, প্রক্টর সহযোগী অধ্যাপক সাইফুদ্দিন আহমদ, বিএনপির প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, ছাত্র সম্পাদক রকিবুল ইসলাম বকুল, ছাত্রদল সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব, সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন নাসির প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
বৃহস্পতিবার শোক দিবস : ঢাবি শিক্ষার্থী সাম্যর মৃত্যুতে আজ বৃহস্পতিবার ঢাবিতে শোক দিবস ও অর্ধদিবস ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ ঘোষণা করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। গতকাল বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দেন ঢাবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খান। তিনি বলেন, ‘আগামীকাল (আজ) শাহরিয়ার সাম্যের স্মৃতিতে শোক দিবস ঘোষণা করছি। একই সঙ্গে অর্ধদিবস ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ রাখব।’ তাছাড়া সাম্যের হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের জোর তাগিদ দিয়েছে ঢাবি প্রশাসন।
ঢাবিতে ৭ সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন : সাম্যর মৃত্যুর ঘটনা তদন্তে সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ঢাবির কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খানকে আহ্বায়ক করে সাত সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
রাতেই বিক্ষোভ : সাম্য হত্যাকান্ডে জড়িতদের বিচার দাবিতে মঙ্গলবার গভীর রাতে বিক্ষোভ মিছিল করেছে ছাত্রদল। গতকাল বুধবাও তার বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে উপাচার্যের বাসভবন ঘেরাও করে এবং খুনিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে জোর তৎপরতার দাবি জানায়। এ সময় ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ব্যর্থতার দায়ে প্রক্টরকে অবশ্যই সসম্মানে পদত্যাগ করতে হবে। পরবর্তী সময়ে যদি ছাত্রদলের আর কোনো মেধাবী ছাত্রনেতা হত্যা বা হামলার শিকার হয় এবং সরকার যদি দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে আমরা এ সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেব।’
উদ্যানে অভিযান : সাম্য হত্যাকান্ডের ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে বিক্ষোভ মিছিল করেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। বিক্ষোভে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে অপরাধীদের বিচারের দাবি জানানো হয়। পরে শিক্ষার্থীরা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মাদকাসক্ত ও মাদক বিক্রেতাদের বিতাড়িত করেন। এ সময় পাঁচজনকে পুলিশের হাতে সোপর্দ করেন শিক্ষার্থীরা।
সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিতের দাবি সাদা দলের : সাম্য খুন হওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী ঢাবি শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দল। একই সঙ্গে ঢাবি ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সংগঠনটি সাম্য হত্যাকারীদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করে।
বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের প্রতিবাদ : তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির ও গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের (বাগছাস) নেতারা। দল দুটির নেতারা সে সময় সাম্যকে দেখতে হাসপাতালে উপস্থিত হন এবং অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান। পরে রাত ১টার দিকে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে নিন্দা জ্ঞাপন করে ছাত্রশিবির। গতকাল বাগছাস নিরাপদ ক্যাম্পাসের দাবিতে বিক্ষোভ করে এবং সাত দফা সংবলিত স্মারকলিপি প্রদান করে। তাছাড়া জুলাই ঐক্য, বাংলাদেশ ছাত্রপক্ষ, ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রফ্রন্ট, ইসলামী ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতারা ঘটনার নিন্দা জানিয়ে সুষ্ঠু বিচারের দাবি জানান। এ ঘটনায় সন্ধ্যায় উপাচার্য ও প্রক্টরের পদত্যাগের দাবিতে মশাল মিছিল করেছে ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রফ্রন্ট ও সাম্যর বন্ধুরা।