জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি) শিক্ষার্থীদের টানা তিন দিন প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনার রাস্তায় অবস্থান কর্মসূচির পর শিক্ষার্থীদের উত্থাপিত চার দফা দাবি মেনে নিয়েছে সরকার। গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় ইউজিসি চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. এসএমএ ফায়েজের উপস্থিতিতে এ ঘোষণা দেন জবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. রেজাউল করিম।
তিনি বলেন, আমাদের শিক্ষার্থীদের দাবি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালন বাজেট বৃদ্ধি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বাজেট বৃদ্ধির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের প্রথম দাবি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আবাসন সংকট নিরসনে অস্থায়ী হল নির্মাণে খুব দ্রুত কাজ শুরু হবে। দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের কাজ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অতি দ্রুত বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে।
ইউজিসি চেয়ারম্যান বলেন, আমরা সারা দিন এটা নিয়ে কাজ করেছি। ইউজিসি একটি পরিবার হিসেবে সবাই মিলে সমাধান করতে পারব। আমরা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি একসঙ্গে বসে সব সমাধান করব। আপনাদের সব দাবি বাস্তবায়নে আমরা কাজ করছি। এ সময় ইউজিসি চেয়ারম্যান দাবি আদায়ের জন্য গণঅনশনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের পানি পান করিয়ে অনশন ভাঙান।
জবি শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. রইছউদ্দীন বলেন, আমাদের চতুর্থ দাবি ছিল আমাদের ওপর হামলায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া। হামলার ঘটনায় পুলিশ দুঃখ প্রকাশ করেছে। এ ছাড়া সাত দিনের মধ্যে হামলায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। এ ছাড়া সরকার আমাদের সব দাবি মেনে নিয়েছে।
এদিকে গতকাল শুক্রবার চার দফা দাবিতে কাকরাইল মোড়ে সড়ক অবরোধ করেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শতাধিক শিক্ষক-শিক্ষার্থী। বিকেল সাড়ে ৩টা থেকে তাদের গণঅনশন শুরু হয়। টানা তিন দিন ধরে আন্দোলন কর্মসূচি চালিয়ে যান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক- শিক্ষার্থীরা এবং তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও।
গত বৃহস্পতিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক রইছউদ্দীন ঘোষণা করেছিলেন দাবি আদায় না হওয়া অবধি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাটডাউন থাকবে এবং জবি ঐক্য প্ল্যাটফর্মের সম্মিলিত সিদ্ধান্তে গণঅনশন কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হয়। এরই ধারাবাহিকতায় গতকাল কাকরাইল মোড়ে প্রথম দিন থেকে দ্বিগুণ শিক্ষার্থী আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। সঙ্গে যোগ দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীরা ও বিভিন্ন অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন। সাবেক জবিয়ানরা তাদের স্ত্রী-স্বামী সন্তান নিয়ে অধিকার আদায়ের আন্দোলনে যোগ দেন।
গতকাল সকালে শিক্ষার্থীদের স্লোগানে কাকরাইল সড়ক প্রকম্পিত হয়। এই সময় শিক্ষার্থীরা ‘দালালি না রাজপথ, রাজপথ রাজপথ, আপস না সংগ্রাম সংগ্রাম,’ ‘তুমি কে আমি কে জবিয়ান জবিয়ান,’ ‘বৈষম্যের কালো হাত ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও,’ ‘জবিয়ান আসছে রাজপথ কাঁপছে,’ ‘বৈষম্য না সমতা, সমতা সমতা’, ‘এক দুই তিন চার হল আমার অধিকার’, ‘আমার ভাই আহত কেন ইন্টেরিম জবাব চাই’, ‘বিপ্লবে বলীয়ান, নির্বাক জবিয়ান’, ‘ভুজুংভাজুং বুঝি না আইসা পড়ছি যমুনা’, ‘ক্ষমতা না জনতা জনতা জনতা’। তা ছাড়া তাদের স্লোগানে উঠে আসে, ‘রক্ত লাগলে রক্ত নে, তবু আমাদের আবাসন দে’, ‘জ্বালো রে জ্বালো, আগুন জ্বালো’, ‘আর নয় হেলাফেলা, এবার হবে আসল খেলা’, ‘বৈষম্যের কালো হাত, ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও’, ‘শিক্ষকদের অপমান, সইবে নারে জবিয়ান’, ‘আমার ভাই আহত কেন, ইন্টেরিম জবাব দে’সহ নানা স্লোগান।’
সকাল ৯টায় ২৫-৩০টি বাস ভর্তি করে জবি থেকে কাকরাইল মোড়ে এসে আন্দোলনে যোগ দেন শিক্ষার্থীরা। শুধু শিক্ষার্থীরাই নয় জবির টিএসসির চা বিক্রেতা থেকে শুরু করে কর্মচারীরাও এতে যোগ দেয়।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক-বর্তমান শিক্ষার্থীরা মিলিত হয়ে দাবি আদায়ের মিছিলে নামে। বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা কাকরাইল মসজিদের সামনে মিছিল করে। প্রতিদিনের মতো এই আন্দোলনকে ঘিরে সড়কে তেমন যানজট দেখা যায়নি। শুক্রবার হওয়ায় রাস্তা ফাঁকা থাকায় ও আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় স্বতঃস্ফূর্ত ছিল আন্দোলন।
গতকাল দুপুরে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র অধিকার পরিষদের সভাপতি একেএম রাকিব বলেন, সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের সমাবেশে জবি ঐক্যের পক্ষ থেকে এই অনশন শুরু হয়েছিল। আমাদের আন্দোলন এমন জায়গায় এসে পৌঁছেছে আমাদের আর পেছনে ফেরার সুযোগ নেই। আমরা বিকেলে অনশন কর্মসূচি শুরু করেছি। বিজয় না নিয়ে আমরা ফিরছি না।
অনশনে বসা শিক্ষার্থী কামরুন নাহার বলেন, আমরা আমাদের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত অনশন থেকে উঠব না। আমরা যখন লংমার্চ নিয়ে আসি তখন আমাদের ওপর পুলিশ হামলা করে আমাদের আহত করে, আমাদের শিক্ষকদের আহত করেন। আমরা আমাদের অধিকার নিয়ে ফিরে যাব।
ইতিমধ্যে জানা যায়, জবির আবাসন সমস্যা নিয়ে চলমান ৩ দফার প্রতি সংহতি জানিয়ে এবং জবি শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের ওপর আওয়ামী কায়দায় পুলিশি হামলায় জড়িতদের বিচারের দাবিতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়।
এদিকে শিক্ষার্থীদের আগের তিন দফা দাবির সঙ্গে নতুন আরও এক দাবি যুক্ত হয়েছে। ১৪ মে শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের অতর্কিত হামলার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা। এর আগে শিক্ষার্থীদের তিন দফা দাবি হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থীর জন্য ২০২৫-২৬ অর্থবছর থেকে আবাসন বৃত্তি চালু করা, জবির প্রস্তাবিত পূর্ণাঙ্গ বাজেট কাটছাঁট না করে অনুমোদন, দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের কাজ একনেক সভায় পাস ও বাস্তবায়ন।
গত বুধবার (১৪ মে) দুপুর পৌনে ১২টায় চার দফা দাবি আদায়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজারের বেশি শিক্ষার্থী প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনার দিকে রওনা হয়। পদযাত্রা প্রথমে গুলিস্তান মাজার গেটে বাধার সম্মুখীন হয়। পরে মৎস্য ভবনে ফের পুলিশের বাধা অতিক্রম করে যমুনা অভিমুখে এগিয়ে যেতে থাকে জবি শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের পদযাত্রা কাকরাইল মসজিদ ক্রসিং মোড়ে আসতেই অতর্কিত টিয়ারগ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড, গরম পানি নিক্ষেপ করতে শুরু করে পুলিশ। এতে শিক্ষক শিক্ষার্থী সাংবাদিকসহ অনেকে আহত হয়।