ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগের অনুসন্ধানে মাঠে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গতকাল রবিবার কমিশন অনুসন্ধান টিম গঠন করেছে। সংস্থাটির উপপরিচালক মাসুদুর রহমানের নেতৃত্বে এ টিম হয়েছে। দুদক সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
ভাসমান বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে শেখ হাসিনার দুর্নীতি মামলা সচলের জন্য আপিল করেছে দুদক। সংস্থাটির একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ‘সাবেক প্রধানমন্ত্রীর অবৈধ সম্পদ অর্জনের একটি অভিযোগের অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অনুসন্ধান টিম গঠন করা হয়েছে। টিম শেখ হাসিনার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের হিসাব ও তার আয়কর নথি যাচাই করে এবং অনুসন্ধান করে প্রাপ্ত তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে একটি প্রতিবেদন কমিশনে দাখিল করবে। তার ভিত্তিতে কমিশন-পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে।’
গতকাল দুপুরে মৌলভীবাজার জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে গণশুনানি শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে দুদক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেন বলেছেন, ‘নির্বাচনী হলফনামায় শেখ হাসিনার দেওয়া সম্পদবিবরণী ও ট্যাক্স ফাইলের সঙ্গে অনুসন্ধানে পাওয়া সম্পদের মধ্যে গরমিল পেয়েছে দুদক। সম্পদের তথ্য গোপন করার প্রমাণ পাওয়া গেছে।’
দুদক চেয়ারম্যান বলেন, ‘সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার নির্বাচনী হলফনামায় যে সম্পদের বিবরণ দিয়েছেন, তা আমরা পরীক্ষা করে দেখেছি। তিনি অনেকাংশেই সম্পদের বিবরণে তথ্য গোপন রেখেছেন। শেখ হাসিনা ও তার সন্তান এবং বোনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। আরও দু-একটি মামলা অনুসন্ধানে রয়েছে।’
নির্বাচন কমিশনে দাখিল করা হলফনামা অনুযায়ী, শেখ হাসিনার স্থাবর সম্পদের মধ্যে ধানমন্ডি আবাসিক এলাকার ৫ নম্বর রোডের ৫৪ নম্বর হোল্ডিংয়ের সুধাসদন ভবন এবং তার ক্রয়সূত্রে ১৫ দশমিক ৩ বিঘা কৃষিজমি রয়েছে। এসবের অর্জনকালীন ক্রয়মূল্য ৬ লাখ ৭৮ হাজার টাকা। অকৃষি জমির মধ্যে পূর্বাচল আবাসিক প্রকল্পের ২৭ নম্বর সেক্টরের ২০৩ নম্বর রোডে ১০ কাঠার প্লট রয়েছে, যার ক্রয়মূল্য ৩৪ লাখ ৭৬ হাজার টাকা। এ ছাড়া তিনতলা ভবনসহ ৬ দশমিক ১০ শতাংশ জমি, যার অর্জনকালীন মূল্য ৫ লাখ টাকা।
হলফনামার তথ্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনার অস্থাবর সম্পদের মধ্যে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমাকৃত অর্থের পরিমাণ ২ কোটি ৩৮ লাখ ৯৮ হাজার ৬০৭ টাকা, স্থায়ী আমানত ৫৫ লাখ, পোস্টাল অর্ডার ও সঞ্চয়পত্র ২৫ লাখ, একটি উপহারসহ তিনটি প্রাইভেট গাড়ি ও দুটি গাড়ির ক্রয়মূল্য ৪৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা। তার ১৩ লাখ ২৫ হাজার টাকার স্বর্ণালংকার ও ৭ লাখ ৪০ হাজার টাকার আসবাবপত্র রয়েছে।
হলফনামায় আয়ের বিষয়ে বলা হয়েছে, তিনি বছরে কৃষি খাত থেকে ৯ লাখ ৪৬ হাজার টাকা, সঞ্চয়পত্র ও আমানত থেকে ২৫ লাখ, সম্মানী ভাতা ও নির্বাচনী খরচ হিসেবে পাওয়া ১৬ লাখ ৩৮ হাজার, স্থায়ী আমানত ও রয়্যালটি থেকে ৫৫ লাখ ২৫ হাজার ৩৪৬ টাকা আয় করেন।
দুদকের তথ্যমতে, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বিগত ১৫ বছরে দেশের উন্নয়নের নামে অর্থ লুটপাট, প্লট জালিয়াতি, বিদেশে অর্থ পাচার, প্রকল্পের অর্থ লুটপাট নিয়ে দুদকের একাধিক অনুসন্ধান চলমান রয়েছে। পূর্বাচল প্রকল্পে ৬০ কাঠার প্লট জালিয়াতির অভিযোগে ছয় মামলায় চার্জশিট দাখিলের পর আদালত তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে। দেশের তিনটি বিমানবন্দরের উন্নয়নকাজের নামে কোটি কোটি টাকা লুটপাটের অভিযোগের অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে শেখ হাসিনা, বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সাবেক প্রতিমন্ত্রী মো. মাহবুব আলী এবং একই মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব মোকাম্মেল হককে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করেছিল দুদক। কিন্তু তারা দুদকে হাজির হননি।
শেখ হাসিনার দুর্নীতির মামলা সচলের জন্য আপিল : সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ভাসমান বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন নিয়ে দুর্নীতির মামলা বাতিল করে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আবেদন করা হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা আবেদনের ওপর শুনানির জন্য আগামী ১৫ জুলাই দিন ধার্য করেছে আপিল বিভাগ। গতকাল রবিবার বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত আপিল বেঞ্চ আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে আবেদনটির ওপর শুনানির এ দিন ধার্য করে। আদালতে দুদকের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী আসিফ হাসান।
আসিফ হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ মামলায় শেখ হাসিনাসহ অন্যদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। দুদক মামলাটি সচলের উদ্যোগ নিয়েছে। গতকাল ১৮ মে আমাদের আবেদনটি শুনানির জন্য দিন ধার্য করা হয়েছিল।’
আইনজীবী সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯৬-৯৭ সালে শিকলবাহা, হরিপুর ও খুলনায় বার্জমাউন্টেড বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে ক্ষমতার অপব্যবহার করে দুর্নীতির অভিযোগে ২০০৭ সালের ২ সেপ্টেম্বর রাজধানীর তেজগাঁও থানায় এ মামলা করে দুদক। মামলায় শেখ হাসিনা, সাবেক বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সচিব তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান নুরুদ্দীন মাহমুদ কামাল, সামিটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুহাম্মদ আজিজ খান, পরিচালক মুহাম্মদ ফরিদ খান, ইউনাইটেড গ্রুপের চেয়ারম্যান হাসান মাহমুদ রাজা ও পরিচালক আবুল কালাম আজাদকে আসামি করা হয়েছে।
তদন্ত শেষে ২০০৮ সালের ১০ জানুয়ারি অভিযোগপত্র দেয় দুদক। অভিযোগ গঠনের পর ঢাকার একটি বিশেষ জজ আদালতে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। পরে শেখ হাসিনার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১০ সালের ১৩ এপ্রিল মামলাটি বাতিল করে হাইকোর্ট। হাইকোর্টের এ রায়ের বিরুদ্ধে গত ৫ মার্চ লিভ টু আপিল করে দুদক। এতে ৫ হাজার ৪৫২ দিন বিলম্ব মার্জনার আবেদন করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৭ মার্চ আবেদনটি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে শুনানির জন্য ওঠে। চেম্বার আদালত এ বিষয়ে আপিল বিভাগের নিয়মিত বেঞ্চে শুনানির জন্য ১৮ মে (গতকাল) দিন ধার্য করেছিল। গতকাল আপিল উপস্থাপন করা হলেও শুনানি হয়নি। আগামী ১ জুলাই শুনানির নতুন দিন ধার্য করা হয়েছে।