গৌরনদীতে ফের বকনা বাছুর কেলেঙ্কারি!

জেলেদের বিকল্প জীবিকায়ন প্রকল্পে সরকারের সদিচ্ছা থাকলেও বাস্তবায়নের দায় যখন অসততার হাতে পড়ে, তখন উন্নয়ন আর কল্যাণের নামে সৃষ্টি হয় হতাশা, ক্ষোভ আর প্রশ্নের পাহাড়। বরিশালের গৌরনদী উপজেলায় ‘দেশীয় প্রজাতির মাছ ও শামুক সংরক্ষণ ও উন্নয়ন প্রকল্প’-এর আওতায় জেলেদের মধ্যে বকনা বাছুর বিতরণের উদ্যোগ ঠিক এমনই এক নজির। ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বহীনতা, মানদণ্ড উপেক্ষা এবং পুরনো অনিয়মের পুনরাবৃত্তি প্রকল্পটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। বারবার সরকারি সহায়তার প্রতিশ্রুতি পেলেও ভোগান্তি ও বঞ্চনার বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আছেন সুবিধাভোগী জেলেরা।

গত মঙ্গলবার উপজেলা পরিষদ চত্বরে জেলের মধ্যে বকনা বাছুর বিতরণ কার্যক্রমের আয়োজন করা হয়। উপজেলার ৬৫ জন জেলেকে একটি করে বকনা বাছুর দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বিতরণের জন্য আনা বকনা বাছুরগুলোর অধিকাংশই ছিল ওজনে কম এবং শারীরিকভাবে দুর্বল। ফলে বিতরণ অনুষ্ঠান চলাকালে ৪০টি বাছুর ফেরত পাঠান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক রিফাত আরা মৌরি।

জানা গেছে, বাছুর সরবরাহের দায়িত্বে ছিল ‘সিমেন্স অ্যালাইন্স বিডি লিমিটেড’ নামে ঢাকার একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এর আগে চলতি বছর ২৭ ফেব্রুয়ারিও একই প্রকল্পের আওতায় ‘ফোকাস ট্রেডিং’ নামের আরেক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান গৌরনদীতে রুগ্ণ ও কম ওজনের বাছুর সরবরাহ করে বিতরণের মুখে তোপের মুখে পড়ে। তখনো তৎকালীন ইউএনও মো. আবু আবদুল্লাহ খান তা ফেরত পাঠান। পরে নতুন চালান আসার পর নিয়ম মেনে বিতরণ সম্পন্ন হয়।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি ফারুখ দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমাদের প্রতিটি গরুর ওজন ৭০ কেজির ওপর ছিল। কিন্তু কর্মকর্তারা গরুর ওজন থেকে ১০ শতাংশ বাদ দিয়ে হিসাব করেছেন। পরে গরুর ওজন হয় ৬০-৬২ কেজির মধ্যে। এতে তাদের চাহিদা অনুযায়ী গরুর ওজন কম দেখানো হয়েছে। আমরা বিষয়টি সময় নিয়ে দেখছি। মূল কন্ট্রাক্টর বিষয়টি পর্যালোচনা করবেন।

তবে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা প্রসেনজিৎ দেবনাথ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের ৬৫টি বাছুর বিতরণের কথা ছিল। কিন্তু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মাত্র ৪০টি গরু পাঠিয়েছে। বাকিগুলো আগামী রবিবার পাঠানোর কথা বলা হয়েছে। পাঠানো গরুগুলোর মধ্যে মাত্র ৫-৭টি ছিল ৭০ কেজির ওপর, বাকিগুলো ৫০ থেকে ৬০ কেজির মধ্যে। এমনকি কিছু গরু ছিল রুগ্ণও। ফলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিতরণ বন্ধ করে বাছুরগুলো ফেরত পাঠিয়েছেন। আশা করছি আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সঠিক ওজনের গরু সরবরাহ করলে পুনরায় বিতরণ করা সম্ভব হবে।

বাছুরের ওজন থেকে ১০ শতাংশ বাদ দেওয়ার বিষয়ে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা প্রসেনজিৎ দেবনাথ বলেন, গরুর ওজন যেহেতু ফিতা দিয়ে মেপে নির্ধারণ করা হয়, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের নিয়ম অনুযায়ী ওই ওজন থেকে ১০ শতাংশ বাদ দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। সে অনুযায়ী ফিতা দিয়ে মেপে প্রাপ্ত ওজন থেকে ১০ শতাংশ বাদ দিয়ে আমরা চূড়ান্ত ওজন বিবেচনা করি। কিন্তু যে বাছুরগুলো আনা হয়েছিল, সেগুলোর ফিতা অনুযায়ী মাপ নেওয়ার পর ১০ শতাংশ বাদ দিলে অনেকটির ওজন ৫০ কেজিরও নিচে নেমে আসে। এ কারণেই আমরা বাছুরগুলো গ্রহণ না করে ফেরত পাঠিয়েছি।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রিফাত আরা মৌরি গণমাধ্যমে বলেন, শিডিউল অনুযায়ী ওজন ও স্বাস্থ্যের মান নিশ্চিত না করলে কোনো বাছুর গ্রহণ করা হবে না। জেলেদের জন্য প্রাপ্য সুবিধা নিশ্চিত করতেই আমরা এ পদক্ষেপ নিয়েছি।

সরকারের পক্ষ থেকে জেলেদের জীবনমান উন্নয়নের জন্য নেওয়া এসব উদ্যোগ প্রকৃতপক্ষে তখনই সফল হবে, যখন বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা যাবে। নতুবা বারবার এমন ব্যর্থতা সুবিধাভোগীদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি করবে এবং প্রকল্পের উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে বলে মনে করে সচেতন মহল।