তোমাদের বই

যে রূপকথায় পাওয়া যায় আনন্দের সঙ্গে শিক্ষা

বিশ্বব্যাপী যে মানবজাতি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে তাদের মানসিক ঐক্যের সন্ধান পাওয়া যায় রূপকথার গল্পে। মানুষের মুখে মুখে লোককথারূপে যে গল্পগুলো ছড়িয়ে আছে সেগুলোর মধ্যে যে আশ্চর্য সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায় সেটি এ কথায় প্রমাণ করে, মানবজাতির শিকড় এক ও অভিন্ন। তাই জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে নানা প্রান্তে ছড়িয়ে গেলেও মূল সুরটি একই রয়ে গেছে, তার ব্যত্যয় হয়নি। এই আশ্চর্য সাদৃশ্য দেখে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর জিজ্ঞাসু মন জানতে চেয়েছিল, তবে কি একদিন ওই সাদা ইংরেজ ও এই কালো বাঙালির পূর্বপুরুষরা ভাই ভাইরূপে একই তাঁবুর নিচে বাস করত?

এই প্রশ্নের উত্তর নিশ্চিতভাবে না বলা গেলেও বিভিন্ন দেশের লোকসাহিত্য পড়ে ও বিচার বিশ্লেষণ করলে এই বক্তব্যের সপক্ষেই উপাত্ত হাজির হয়।

ইতালির রূপকথা বইটির গল্পগুলো পড়লেও একই কথাই মনে হয়। বইটির উৎস ইংরেজি সংকলন ওঃধষরধহ ঋধনষবং, অনুবাদ করেছেন মুহম্মদ শামসুর রহমান। বইটিতে পনেরোটি গল্প রয়েছে। লম্বা রুপালি নাক, পালকঅলা দৈত্য, আপেল ও আপেলের খোসা, রাজপুত্র ও তিনটি ডালিমফুল, ওয়র্গে এক রাত, সুখী লোকের জামা, আগুন এলো কেমন করে, নেকড়ে চাচা, ক্রিক ও ক্রক, দুই কুঁজোর গল্প, কুঁজো, খোঁড়া বাঁকা-ঘাড় বামন-বুড়ি, মার্চ ও ভেড়ার রাখাল, নির্ভীক নির্বোধ, কোলা পেসির উপাখ্যান, গিউফা। গল্পগুলোতে বর্ণিত হয়েছে লোভের কুফল, সততার সুফল, ন্যায়পরায়ণতা, বন্ধুত্বে¡র মর্যাদা রক্ষা, প্রতিবেশীর প্রতি দায়িত্ব, সাহসিকতা প্রভৃতি বিষয়। রূপকথা বা লোককথাগুলো মূলত মানুষকে আনন্দ দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষণীয় বিষয়গুলো সাধারণ মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য পরিবেশন করা হতো। সেই বৈশিষ্ট্যগুলোও এই গল্পগুলোতে বিদ্যমান। রূপকথার গল্প মানেই তাই আনন্দের সঙ্গে শিক্ষা লাভ। রূপকথার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এই গল্পগুলো শিশুদের কল্পনার জগৎকে প্রসারিত করতে সাহায্য করে, নিজেদের জগৎ তৈরি করতে সাহায্য করে। ইতালির রূপকথাতেও বাস্তবে পাওয়া যায় না, কিন্তু মেনে নিতে অসুবিধা হয় না, এমন উপাদানের সংখ্যা কম নয়। শিশুদের ইতিবাচক মননে গড়ে তোলার জন্য সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি প্রয়োজন সেটি রয়েছে এখানে চমৎকারভাবে। প্রতিটি গল্পের শেষে দুষ্টের পরাজয় ঘটে এবং শিষ্টের জয় লাভ হয়। যেমন প্রথম গল্প, লম্বা রুপালি নাক গল্পে শয়তান ভুলিয়ে ভালিয়ে ধোপার মেয়েদের নিয়ে যায় নিজের কাছে, গৃহকর্মী হিসেবে। কিন্তু সেখানে তাদের বন্দি করে রাখে। ধীরে ধীরে মেরে ফেলতে থাকে। সবার ছোট যে মেয়ে, সে বুদ্ধি খাটিয়ে নিজের দুই বোনকে এবং নিজেকে উদ্ধার করে ফিরে আসে নিজেদের বাড়িতে। পরাক্রমশালী শয়তানকে পরাজিত করেই। এমন শক্তিশালী যে শয়তান সেও কি না ছোট্ট মেয়েটির বুদ্ধির কাছে পরাজিত হলো? একজন পূর্ণবয়স্ক ব্যক্তি তা সহজে মানতে না চাইলেও গল্পের মাঝে আমাদের মেনে নিতে আপত্তি থাকে না। গল্পের শক্তি এখানেই। গল্প আমাদের শেখায়, কেউ যদি সৎপথে থাকে, ঈশ্বরে বিশ্বাস করে এবং সৎনিয়তে কোনো কাজ করে তাহলে সে সেই কাজে সফল হবেই। এভাবে শিশুদের মনে দুঃসাধ্য কাজকে সম্ভব করার মানসিক শক্তি প্রোথিত করে দেয় এই গল্পগুলো।

গ্রামবাংলার রূপকথা বা লোককথাগুলোতে যেখানে রাক্ষসেরা মানুষের গন্ধ পেলে ‘হাউ মাউ খাও, মানুষের গন্ধ পাও’ বলে তেড়ে আসে এখানে ইতালির রূপকথায় দৈত্যরা ‘হাউ মাউ খাও’ বলে তেড়ে আসে। কিন্তু এখানেও রাজার সন্তান না হলে সন্ন্যাসী মন্ত্রপূত আপেল দিয়ে যায় রানীকে খাওয়ার জন্য। এমন মিল যেমন আছে তেমনি গল্পগুলোতে ইতালীয় বৈশিষ্ট্যও আছে। গ্রামবাংলার রূপকথার সঙ্গে যাদের পরিচয় আছে তারা সহজেই সে বৈশিষ্ট্যগুলো চিহ্নিত করতে পারবে। যেমন একটি মেয়ে সে ছিল ভীষণ পেটুক। তাকে তার মা পাঠাল নেকড়ে চাচার কাছে কড়াই আনতে। গ্রামবাংলার রূপকথাতে বাঘকে বাঘমামা বলা হলেও সে মামা শিয়াল বা বনের অন্যদের কাছে। সাধারণ মানুষ তার কাছে মেয়েকে পাঠায় না কোনো কাজে। ইতালিতে হয়তো এটি সম্ভব। সে জন্যই হয়তো নেকড়ে মামা কড়াই ফেরত নেওয়ার সময় যখন পিঠে না পেয়ে গাধার গোবর পেল তখনো তাকে না খেয়ে ক্ষমাই করে দিল। এমনি মজার সব কাহিনি পড়তে পড়তে তোমার জানা রূপকথার সঙ্গে ইতালির রূপকথার তুলনা করতে তোমাদের মন্দ লাগবে না সে আমি হলফ করে বলছি।

সুলতানা রাজিয়া