অসুস্থ শিশু দত্তক নিতে অনাগ্রহ

এ বছরের ২৯ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের মোগরাপাড়ার হাবিবপুর চৌরাস্তার ডাস্টবিন থেকে একটি জীবিত নবজাতক উদ্ধার করে ডা. মুজিব নিউবর্ন ফাউন্ডেশন। ৮১ দিন নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড মোড় এলাকার বাংলাদেশ নবজাতক হাসপাতালে রেখে নিবিড় চিকিৎসায় শিশুটিকে সুস্থ করে সংগঠনটি। পরে গত ২১ এপ্রিল এক নিঃসন্তান ব্যবসায়ী দম্পতির কাছে দত্তক দেওয়া হয়।

ঠিক কাছাকাছি সময়ে আরেকটি নবজাতক উদ্ধার করে সংগঠনটি। এই শিশুটি কোথায় হয়েছিল বা কোথায় পাওয়া গেছে, জানেন না সংগঠনের লোকজন। এক রাতে নাক-মুখ ঢাকা এক নারী নবজাতক হাসপাতালের বারান্দায় রেখে যায় শিশুটিকে। পরে সেখান থেকে উদ্ধার করে তাকেও চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করে তোলে সংগঠনটি।

একইভাবে চার বছর আগে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রসবের দু-তিন দিন পর এক কন্যাসন্তানকে হাসপাতালে রেখেই পালিয়ে যায় মা। হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ শিশুটিকে ঢাকার আজিমপুরের সরকারি ‘ছোটমণি নিবাসে’ পাঠায়। এভাবে প্রতিবছর দেশে এক হাজারের বেশি পরিত্যক্ত পথশিশু ও নবজাতক পাওয়া যাচ্ছে। তার মধ্যে ৯৫ জন বা ১০ শতাংশের মতো নবজাতক ও বাকি ৯০ শতাংশ শিশু। এসব শিশু ও নবজাতকদের মধ্যে জীবিত উদ্ধার হচ্ছে মাত্র ৩২ শতাংশ। বাকি ৬৮ শতাংশই মৃত।

এসব পরিত্যক্ত শিশু ও নবজাতক উদ্ধার এবং লালনপালনে দায়িত্বরত সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা এসব তথ্য জানিয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের মতে, ফেলে যাওয়া শিশু ও নবজাতকের প্রকৃত সংখ্যা অনেক বেশি।

সংস্থার কর্মকর্তারা বলছেন, এসব শিশু উদ্ধার, চিকিৎসা ও লালনপালনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেই। বিশেষ করে নবজাতকদের চিকিৎসা মিলছে না। আবার অসুস্থ বা ত্রুটিপূর্ণ শিশুকে দত্তকও নিতে চান না দম্পতিরা।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ রেজাউর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা পরিত্যক্ত শিশু উদ্ধার করি না। অধিদপ্তরের জেলা শিশুকল্যাণ বোর্ড অথবা উপজেলা শিশুকল্যাণ বোর্ডের মাধ্যমে অথবা থানার মাধ্যমে আমাদের এখানে পাঠানো হয়। অনেক সময় হাসপাতাল থেকেও পাঠায়।’

বেসরকারি পর্যায়ে পরিত্যক্ত পথশিশু ও নবজাতকদের উদ্ধার, চিকিৎসা ও লালনপালন করে ডা. মুজিব নিউবর্ন ফাউন্ডেশন। এই প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার ও প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান এবং মাতুয়াইল শিশু মাতৃ স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক ডা. মজিবুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, এ পর্যন্ত ৪৩ জন নবজাতক উদ্ধার করেছি। কিছু মারা গেছে। জীবিত কয়েকজনের পরিবার বা আত্মীয়স্বজন খুঁজে বের করে তাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বাকিদের আদালতের মাধ্যমে দত্তক দেওয়া হয়েছে। মানুষের উচিত, এসব বাচ্চা রাস্তাঘাটে, ডাস্টবিনে ফেলে না রেখে এমন একটা জায়গায় রেখে যাওয়া, যেন শিশুটা বাঁচতে পারে।

প্রকৃত সংখ্যা নেই : দেশে ফেলে যাওয়া পথশিশু ও নবজাতকের সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই বলে জানান ডা. মজিবুর রহমান। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, শিশু অধিকার ফোরাম, মানবাধিকার ফোরাম ও সমাজসেবা অধিদপ্তরের সমন্বিত তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ বছরে ৯ হাজার ৮৯০ জন পথশিশু ও নবজাতক উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে ৯৫০-এর বেশি নবজাতক। অর্থাৎ প্রতিবছর গড়ে ৯০-১১০ জন নবজাতক ও ৯৯০-১০০০ হাজার পথশিশু পাওয়া যায়। কিন্তু প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি। কারণ যেগুলো গণমাধ্যমে আসে ও চোখে পড়ে সেই সংখ্যাটা গণনা করা হয়। বাকিগুলো হিসাবে আসে না।

এই কর্মকর্তা আরও জানান, গত বছর যে ৯৪ জন নবজাতক পাওয়া গেছে, এর মধ্যে ৬৫ জন মৃত। অর্থাৎ ফেলে যাওয়া নবজাতকদের মধ্যে ৩২ শতাংশকে জীবিত ও ৬৮ শতাংশ মৃত পাওয়া যায়। হয় রাস্তায় মরেছে অথবা ডাস্টবিনে মরে পড়েছিল অথবা হাসপাতালে আসার দু-এক দিনের মধ্যেই মারা গেছে।

সরকারি আশ্রয়ে ১০৭ : সমাজসেবা অধিদপ্তরের তথ্যমতে, সারা দেশে সরকারি ছোটমণি নিবাস আছে ছয়টি। এসব নিবাসে সর্বশেষ মার্চের তথ্য অনুযায়ী, ১০৭ জন শিশু আছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ২৮টি শিশু আছে সিলেটের বাগবাড়ির ছোটমণি নিবাসে ও সর্বনিম্ন ১২ জন চট্টগ্রামের রউফাবাদ নিবাসে। এ ছাড়া খুলনার মহেশ্বরপাশার নিবাসে ১৯ জন, রাজশাহীর গ্রেটার রোডের ও বরিশালের আগৈলঝাড়া নিবাসে ১৫ জন করে এবং ঢাকার আজিমপুরের নিবাসে আছে ১৮ জন শিশু।

এ ব্যাপারে অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ রেজাউর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, যদি কোনো পরিত্যক্ত শিশু পাওয়া যায়, তখন উপজেলা বা জেলা শিশুকল্যাণ বোর্ডের মাধ্যমে অথবা থানা থেকেও পাঠানো হয়। ছোটমণি নিবাসে ছয় বছর বয়স পর্যন্ত রাখা হয়। এরপর তাদের বালক শিশু পরিবার অথবা বালিকা শিশু পরিবারে পাঠানো হয়। এসব শিশু পরিবারে তারা ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত থাকতে পারবে। দেশে এ ধরনের শিশু পরিবার আছে ৮৫টি।

বেশিরভাগই পরিত্যক্ত পথশিশু : নিবাসে আসা পরিত্যক্ত শিশুর সংখ্যা খুব বেশি না বলে জানান ঢাকার আজিমপুরের ছোটমণি নিবাসের উপ-তত্ত্বাবধায়ক জুবলী বেগম রানু। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, এ ধরনের বাচ্চা আসার সংখ্যা বেশি না, খুব কম। এখন যেহেতু দত্তক হয়, সে কারণে এখন গড়ে ২০-২৫টা শিশু থাকে।

পরিত্যক্ত শিশুর ধরন উল্লেখ করে এই কর্মকর্তা বলেন, রাস্তায় যে মানুষগুলো থাকে, বেশিরভাগ বাচ্চাই তাদের। সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষ ভুলক্রমে একটা বাচ্চা জন্ম দিয়েছে, এমন সংখ্যা ১০০ জনে হয়তো চারজন, অর্থাৎ ৪ শতাংশ। বাকি সবই রাস্তায় যারা ঘুমায়, পাগল, ভবঘুরে তাদের বাচ্চা বা দরিদ্র মানুষ যারা সন্তান লালনপালনে অক্ষম, তাদের সন্তান। এরা বেশিরভাগই ভাসমান মানুষ।

উদ্ধারের পর মিলছে না চিকিৎসা : উদ্ধারের পর এই নবজাতক ও শিশুরা চিকিৎসা পাচ্ছে না বলে জানান ডা. মজিবুর রহমান । তিনি বলেন, এসব শিশুর মৃত্যুর প্রধান কারণ হাইপো থার্মাল, অর্থাৎ তাপমাত্রা কমে যাওয়া। পলিথিনে ভরে রাখে। খাবারের উচ্ছিষ্ট লাউ, কুমড়া, সবজির সঙ্গে ফেলে রাখলে বাচ্চার তাপমাত্রা কমে যায়। পলিথিনে বা ব্যাগে ভরে রাখার কারণে অক্সিজেন ও কার্বন ডাই-অক্সাইড কমে যায়। এতে কিডনি ড্যামেজ হয়। মশা-মাছি ও বিষাক্ত পোকার কামড়ে সংক্রমণ হয়। শেষ পর্যন্ত নিউমোনিয়া হয়। পরে মারা যায়।

উদ্ধার নবজাতকদের চিকিৎসায় অনেক টাকা ব্যয় হয় ও সে ব্যবস্থাও অপ্রতুল বলে জানান ডা. মজিবুর রহমান। তিনি বলেন, ‘আমার এখানে ৯০০ গ্রাম ওজনের বাচ্চাটা চার মাস ধরে আছে। প্রথম ২১ দিন তাকে প্রতিদিন সাড়ে ৪ হাজার টাকার ইনজেকশন দিতে হয়েছে। ৬ হাজার টাকা করে ইনজেকশন দিতে হয়েছে প্রায় ১৪ দিন। প্রথম দিন আসার পরে ফুসফুস বাঁচিয়ে রাখার জন্য ৪২ হাজার টাকা দামে একটি ইনজেকশন দিয়েছি। এ ছাড়া চোখ ও কানের চিকিৎসা করাতে হয়।

এই চিকিৎসক বলেন, নবজাতকের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র বা ডেডিকেটেড নিউনেটাল ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (এনআইসিইউ) ছাড়া অন্য কোনো আইসিইউতে এসব বাচ্চা বাঁচানো যাবে না। চিকিৎসা বা মেডিসিন দেওয়া গেল, কিন্তু বাবা-মায়ের কেয়ার, দুধ খাওয়ানো, নিজের কষ্ট ভুলে রাতভর বাচ্চার সেবা এগুলো করবে কে? এজন্য ডেডিকেটেড এনআইসিইউ লাগবে। সরকারের ছোটমণি নিবাসেও নবজাতক বাচ্চা রাখার মতো অবস্থা নেই।

সুস্থ শিশু শতভাগ দত্তক : মানুষ এখন শিশু দত্তক নিতে চায় বলে জানান ডা. মজিবুর রহমান। তিনি বলেন, বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে ইনফার্টিলিটির সংখ্যা বেশি। বিভিন্ন কারণে মানুষের মধ্যে বাচ্চা জন্ম প্রবণতা বা স্বাভাবিক সক্ষমতা কমে যাচ্ছে। কারণ সময়মতো বাচ্চা নিতে পারছে না, রিপ্রোডাকটিভ লাইফ চলে যাচ্ছে। তখন দত্তক নিচ্ছে। কিন্তু বাচ্চা স্টেবল বা সুস্থ না হলে কেউ দত্তক নিতে চায়।

এই চিকিৎসক আরও বলেন, ‘আমার এখানে দুই বাচ্চা যখন লাইফ সাপোর্টে ছিল, তখন দত্তকের এত আগ্রহ ছিল না। এখন সুস্থ ফুটফুটে হয়েছে, সবাই এখন দত্তক নিতে চাইছে। খুব জটিল সমস্যা না হলে শতভাগ বাচ্চার দত্তক দেওয়া যায়। কিন্তু চোখে সমস্যা, বিকলাঙ্গ বা প্রতিবন্ধী বাচ্চা দত্তক নিতে চায় না কেউ।

সমাজকল্যাণ অধিদপ্তরের বোর্ডের মাধ্যমে দত্তক দেওয়া গেলে কাজটা সহজ হতো বলে মনে করেন ডা. মজিবুর রহমান। তিনি বলেন, পারিবারিক আদালতের মাধ্যমে দত্তক নিতে তিন-ছয় মাস সময় লাগে। কিন্তু এতদিন এই বাচ্চা রাখবে কে? বাচ্চাটা ত্রুটিপূর্ণ হলে তাকে রাখা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। তাই দত্তক আইন সহজ করা জরুরি। যদি সরকার বাদী হয়ে পাঁচ-সাত দিনের মধ্যে রায়ের ব্যবস্থা করে দেয়, তাহলে এই বাচ্চাগুলো তাড়াতাড়ি দত্তক দেওয়া যায় এবং আরও নতুন বাচ্চার চিকিৎসার ব্যবস্থা করা যায়।

নিউবর্ন হাব ও নির্দিষ্ট হাসপাতালের পরামর্শ : ফেলে যাওয়া শিশুকে বাঁচাতে দেশে নিউবর্ন হাব গড়ে তোলার পরামর্শ দিয়েছেন ডা. মজিবুর রহমান। তিনি বলেন, নিউবর্ন হাব হলো ইনকিউবেটরের মতো একটা যন্ত্র। এর ভেতর তাপমাত্রা থেকে শুরু করে স্যালাইন, খাবার সব ব্যবস্থা থাকবে। বাংলাদেশে এটা সম্পূর্ণ নতুন ধারণা। একটি হাবের অধীনে ১০টি বাক্স ও ২০টি মেশিন থাকতে পারে। সব মিলে একটি হাব সেন্টার হবে। একটি মেশিনের পেছনে খরচ পড়বে প্রায় দেড় কোটি টাকা।

এই চিকিৎসক বলেন, নিউবর্ণ হাব হলে ৯০ শতাংশ বাচ্চার মৃত্যু রোধ হবে। কারণ তখন বাচ্চাগুলো আর রাস্তাঘাটে না ফেলে সরাসরি এখানে আনলে তাৎক্ষণিক চিকিৎসা করা যাবে। যদি তাপমাত্রা কমে না যায়, নিউমোনিয়া ও সংক্রমণ না হয়, তাহলে শতভাগ শিশুকে বাঁচিয়ে রাখা যাবে। পাশাপাশি এসব শিশুর চিকিৎসায় সুনির্দিষ্ট হাসপাতাল বা হাসপাতালে একটি কর্নার প্রয়োজন।