চেয়ারম্যানের অপসারণ চেয়ে প্রধান উপদেষ্টাকে স্মারকলিপি

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) দুই ভাগ করার অধ্যাদেশ বাতিল করা ও বোর্ডের চেয়ারম্যানের পদত্যাগ দাবিতে কর্মকর্তাদের আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে। আন্দোলনকারীরা গতকাল বৃহস্পতিবার প্রধান উপদেষ্টার কাছে স্মারকলিপি দিয়েছেন। রাষ্ট্রীয় ভবন যমুনায় গিয়ে স্মারকলিপি দেওয়া হয়। প্রধান উপদেষ্টার সহকারী একান্ত সচিব স্মারকলিপি গ্রহণ করেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

গত মঙ্গলবার অর্থ উপদেষ্টার সঙ্গে আলোচনার পরও আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণাকে অযৌক্তিক আখ্যায়িত করে গতকাল গণমাধ্যমে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। বিজ্ঞপ্তিতে মিথ্যাচার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন আন্দোলনরত কর্মকর্তারা।

স্মারকলিপিতে এনবিআরের কর্মকর্তারা চার দফা দাবি জানিয়েছেন। এগুলো হলো : এনবিআর বিলুপ্ত করে দুটি পৃথক বিভাগ গঠনের লক্ষ্যে জারিকৃত অধ্যাদেশ অবিলম্বে বাতিল করা; অবিলম্বে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানকে অপসারণ করা; রাজস্ব খাতের সংস্কার বিষয়ক পরামর্শক কমিটির সুপারিশ জনসাধারণের জন্য ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের প্রস্তাবিত খসড়া ও পরামর্শক কমিটির সুপারিশমালা পর্যালোচনা করে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থা, ব্যবসায়ী সংগঠন, সুশীল সমাজ, রাজনৈতিক নেতা ও সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের অভিমত নিয়ে উপযুক্ত ও টেকসই রাজস্বব্যবস্থা বিষয়ক সংস্কার নিশ্চিত করা।

এনবিআর সংস্কার ঐক্য পরিষদের ব্যানারে কর্মকর্তারা প্রধান উপদেষ্টার কাছে স্মারকলিপি দেন। এতে স্বাক্ষর করেন কর পরিদর্শক মুতাসিম বিল্লাহ, রাজস্ব কর্মকর্তা মো. শফিউল বসর, উপ কর কমিশনার শিহাবুল ইসলাম কুশল, অতিরিক্ত কর কমিশনার সেহেলা সিদ্দিকা ও কাস্টমসের অতিরিক্ত কমিশনার হাছান মুহম্মদ তারেক রিকাবদার। জারিকৃত অধ্যাদেশের বিষয়ে ৫টি আপত্তি জানিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। তারা বলেছেন, প্রথমত. রাজস্ব বোর্ড বিলুপ্তির অধ্যাদেশটি কঠোর গোপনীয়তার মধ্যে গত ১২ মে মধ্যরাতে জারি করা হয়েছে; উপদেষ্টা পরিষদের অনুমোদনের আগে খসড়া অধ্যাদেশে গোপনে কাটাছেঁড়া করে বিশেষ গোষ্ঠী বা প্রভাবশালী মহলের সুবিধামতো তৈরি করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত. জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কার্যক্রম খুবই বিশেষায়িত ও আইননির্ভর। অথচ জারিকৃত অধ্যাদেশে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আয়কর, কাস্টমস ও ভ্যাট বিভাগের কর্মকর্তাদের অভিজ্ঞতা ও পেশাগত দক্ষতার মূল্যায়ন করা হয়নি। তৃতীয়ত. অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত রাজস্ব বিষয়ক পরামর্শক কমিটির দাখিল করা অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন অনলাইন-অফলাইন কোথাও প্রকাশ করা হয়নি। অনানুষ্ঠানিকভাবে প্রাপ্ত প্রতিবেদনে রাজস্বসংক্রান্ত নীতি প্রণয়নের জন্য সরকারের বিভাগ পদমর্যাদায় রাজস্ব কমিশন নামের ‘স্বাধীন ও স্বশাসিত’ সংস্থা গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে। কিন্তু জারিকৃত অধ্যাদেশে পরামর্শক কমিটির অন্তর্বর্তী প্রতিবেদনের এ বিষয়টিকে দেখা যায়নি। চতুর্থত. জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাঠামোগত সংস্কার করা জরুরি। সব অংশীজনের অভিমতের ভিত্তিতে এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার মানদ- অনুযায়ী এ সংস্কার বাস্তবমুখী হতে হবে। সেভাবেই আন্তর্জাতিক নিয়ম-নীতির ভিত্তিতে রাজস্ব প্রশাসনের সাংগঠনিক কাঠামো নির্ধারিত হতে হবে। জারিকৃত অধ্যাদেশটি সেসব পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। পঞ্চমত. এনবিআর বিলুপ্ত করে সরকার অধ্যাদেশটির মাধ্যমে রাজস্ব নীতি বিভাগ এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ নামে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীন দুটি বিভাগ গঠন করেছে। কিন্তু অধ্যাদেশটি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, কৌশলে রাজস্ব নীতি বিভাগের রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগকে নিয়ন্ত্রণ করার কার্যপ্রণালি তৈরি করা হয়েছে।

আন্দোলনকারীরা তাদের সংস্কারের রূপরেখায় উল্লেখ করেন, ‘আমরা রাজস্ব ব্যবস্থার সামগ্রিক ও টেকসই সংস্কার চাই। শুধু কাঠামোগত বিভাজন নয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের যেসব সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান রয়েছে, যেমন রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় অনভিজ্ঞ নেতৃত্ব, দ্বি-স্তরবিশিষ্ট প্রশাসন, সীমিত জনবল, অপ্রতুল অবকাঠামো ও লজিস্টিকস প্রভৃতির সংস্কার চাই। সরকারগঠিত রাজস্ব সংস্কার বিষয়ক পরামর্শক কমিটির দাখিল করা মধ্যবর্তী প্রতিবেদনের সুপারিশকৃত মডেলকে রাজস্ব নীতি প্রণয়নের জন্য একটি রাজস্ব কমিশন ও রাজস্ব নীতি বাস্তবায়নের জন্য পুনর্গঠিত শক্তিশালী জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বিবেচনায় নিয়ে সর্বজনগ্রাহ্য রাজস্ব ব্যবস্থাপনা মডেল প্রতিষ্ঠা করতে চাই। আমরা এমন সংস্কার চাই যেখানে যোগ্যতা ও পেশাগত দক্ষতার মূল্যায়ন করা হবে এবং যোগ্যতা ও বিশেষায়িত জ্ঞান অগ্রাধিকার পাবে, আমলাতান্ত্রিকতা নয়। আমরা চাই বিশ্বের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ টেকসই সংস্কার। আমরা চাই রাজস্ব ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম স্বাধীন ও স্বতন্ত্র এজেন্সি বা সংস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হোক। আমরা একটি রাজস্ব ব্যবস্থাপনা চাই যেখানে তিন বিভাগ আয়কর, কাস্টমস ও ভ্যাটের সব ফাংশন অটোমেটেড হবে, তাদের পরস্পরের মধ্যে ইন্টিগ্রেশন থাকবে, সেই ইন্টিগ্রেটেড সিস্টেম দেশের ব্যংকিং সিস্টেমের সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে, যা রাজস্ব ব্যবস্থায় গতিময়তা, স্বচ্ছতা এবং বাণিজ্য সহজীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সবশেষে সরকারের সর্বোচ্চ সদিচ্ছায় রাজস্ব ব্যবস্থাপনার উপযুক্ত সংস্কারের মাধ্যমে আমরা অটোমেটেড, ইন্টিগ্রেটেড ও টেকসই রাজস্ব ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করতে চাই।’

গত মঙ্গলবারের আলোচনার পর আন্দোলন চালিয়ে যাওয়াকে অযৌক্তিক উল্লেখ করে গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, ২০ মে অর্থ উপদেষ্টার সভাপতিত্বে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ, সড়ক বিভাগ ও রেলপথ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু উপদেষ্টা, রাজস্ব নীতি সংস্কারসংক্রান্ত পরামর্শক কমিটির সদস্যরা এবং এনবিআর সংস্কার ঐক্য পরিষদের ১৩ প্রতিনিধির উপস্থিতিতে ১ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় জানানো হয়, রাজস্ব নীতি সংস্কার সংক্রান্ত পরামর্শক কমিটিসহ সব অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করে জারিকৃত অধাদেশে প্রয়োজনীয় সংশোধন আনার পর তা বাস্তবায়ন করা হবে। তা মেনে না নিয়ে এনবিআর সংস্কার ঐক্য পরিষদ পুনরায় অসহযোগ আন্দোলনের যে কর্মসূচি ঘোষণা করেছে তার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের এমন বক্তব্যকে প্রতারণামূলক আখ্যায়িত করেছেন আন্দোলনরত কর্মকর্তারা। গতকাল সন্ধ্যায় আন্দোলনরত একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে এ প্রতিবেদকের কথা হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা দেশ রূপান্তরকে বলেন, এ বিজ্ঞপ্তি শাক দিয়ে মাছ ঢাকার নামান্তর। মঙ্গলবার অর্থ মন্ত্রণালয়ে আলোচনার নামে প্রহসন করা হয়েছে। এনবিআরের কর্মকর্তাদের কথা শোনা হয়নি। কর ও কাস্টমস ক্যাডারের উদ্বেগের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। অর্থ মন্ত্রণালয় তাদের বিজ্ঞপ্তিতে প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছে। আন্দোলনকারীরা জানান তারা তাদের আন্দোলন চালিয়ে যাবেন।