প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের জাপান সফরের প্রস্তুতি নিচ্ছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এর মধ্যে এই সফরে আলোচনা ও দুই দেশের মধ্যকার আগ্রহের ইস্যুগুলো নিয়ে গত ১৫ মে টোকিওতে সচিব পর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় (এফওসি) বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এফওসি বৈঠকের আলোচ্য বিষয় ও আরও কিছু বিষয় নিয়ে কাজ করছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সফরের আগে এই সপ্তাহে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক হবে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ড. মুহাম্মদ ইউনূস আগামী ৩০ মে জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিগেরু ইশিবার সঙ্গে বৈঠক করবেন। এর আগে ২৮ মে তিনি ঢাকা ত্যাগ করবেন। ড. ইউনূস টোকিওতে অনুষ্ঠিতব্য আন্তর্জাতিক সম্মেলন ‘নিক্কেই ফোরাম : ফিউচার অব এশিয়া’-তে অংশ নেবেন। ২৯ ও ৩০ মে অনুষ্ঠেয় এই সম্মেলনে এশিয়ার প্রভাবশালী রাজনীতিক ও কূটনীতিকদের অংশগ্রহণে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হবে। এতে মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ, লাওসের প্রেসিডেন্ট থংলাউন সিসুলিথ, কম্বোডিয়ার প্রধানমন্ত্রী হুন মানেট, পালাউয়ের প্রেসিডেন্ট এবং সিঙ্গাপুরের উপপ্রধানমন্ত্রীও অংশ নিচ্ছেন। ড. ইউনূসের সঙ্গে তাদের পৃথক বৈঠকের সম্ভাবনা রয়েছে।
দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের প্রস্তুতি : সফরের অংশ হিসেবে ৩০ মে ড. ইউনূস জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিগেরু ইশিবার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হবেন। এই বৈঠকে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা, ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি, মিয়ানমার ও রোহিঙ্গা সংকটসহ আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ইস্যুতে আলোচনা হবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, এই সফরের প্রস্তুতি হিসেবে চলতি সপ্তাহে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এরই মধ্যে টোকিওতে বাংলাদেশ ও জাপানের পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের ষষ্ঠ ‘ফরেন অফিস কনসালটেশন (এফওসি)’ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
আলোচনা ও সম্ভাব্য চুক্তির বিষয় : বৈঠকে যে বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে তা হলো জাপান থেকে বাংলাদেশে আরও বেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা। আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং প্রতিরক্ষা বিনিময় নিয়ে আলোচনা। ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য ও কৌশলগত সম্পর্ক। মিয়ানমার পরিস্থিতি এবং বাংলাদেশের অবস্থান। এছাড়াও ঢাকা মেট্রোরেল, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, ইপিজেড উন্নয়নসহ অবকাঠামো প্রকল্পে জাপানের সহযোগিতা এবং সাংস্কৃতিক বিনিময়, শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেতে পারে।
বাণিজ্যিক ও কৌশলগত অংশীদারত্ব : বর্তমানে বাংলাদেশ-জাপান বার্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ৪০০ কোটি মার্কিন ডলার। এর মধ্যে বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি হয় ২৫০ কোটি ডলারের পণ্য এবং আমদানি হয় ১৫০ কোটি ডলারের পণ্য। সফরের সময় অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি বিষয়ে অগ্রগতি হতে পারে। এছাড়া, স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণ-পরবর্তী সময়ে শুল্কমুক্ত সুবিধা অব্যাহত রাখার অনুরোধ জানানো হবে। ফলমূল ও কৃষিপণ্যের জাপানি বাজারে প্রবেশাধিকার নিয়েও আলোচনা হবে।
টোকিও সফর ঘিরে জাপান ইতিমধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার উদ্যোগ ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে। বঙ্গোপসাগরীয় উদ্যোগ বিগবি’র আওতায় উচ্চমানের অবকাঠামো নির্মাণে যৌথ কার্যক্রম জোরদার হবে বলেও জাপানি পক্ষ আশ্বাস দিয়েছে।
সফরের সময় ড. ইউনূস জাপানের সম্রাট যুবরাজ নারুহিতোর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ হতে পারে। এই সফর বাংলাদেশের কৌশলগত, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক অংশীদারত্বকে নতুন উচ্চতায় উন্নীত করবে বলে মনে করছে বিশ্লেষক মহল। এ প্রসঙ্গে অর্থনৈতিক বিশ্লেষক আবদুল মজিদ বলেন, বাংলাদেশ ও জাপানের কূটনৈতিক সম্পর্কের ইতিহাসে অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও বাণিজ্যিক আদান-প্রদানের প্রসার একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের পুনর্গঠনকাল থেকেই জাপান তার অন্যতম আস্থাভাজন উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে উঠে আসে। গত ৪৭ বছরে এই সম্পর্কের গভীরতা মূলত নির্ধারিত হয়েছে অর্থনৈতিক সাফল্য, বিনিয়োগ প্রবাহ এবং বাণিজ্যের গতিপ্রকৃতি দ্বারা।
বিশ্লেষকরা বলেন, বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য এখনো পর্যন্ত মূলত মুক্ত বাজারনীতি ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) নির্ধারিত অনুশাসনের আওতায় পরিচালিত হয়ে আসছে। যদিও কোনো আনুষ্ঠানিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি এখনো হয়নি, তবুও বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকাভুক্ত হওয়ায় জিএসপি সুবিধা পেয়ে জাপানে বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি করে থাকে। এই তালিকায় উল্লেখযোগ্য হচ্ছে চামড়া, রেডিমেড গার্মেন্টস, হিমায়িত চিংড়ি ও চা।
প্রসঙ্গত, জাপান বর্তমানে এশিয়ায় বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি গন্তব্য। তবে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে প্রতিযোগী দেশের তুলনায় সময় ব্যবস্থাপনার ঘাটতি বাংলাদেশের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ। অন্যদিকে, জাপানি পণ্যের আমদানি বাংলাদেশে বেশ উচ্চমাত্রায় এবং প্রযুক্তিপণ্য থেকে শুরু করে যানবাহন, ইলেকট্রনিকস ও রাসায়নিক পণ্য বাংলাদেশের বাজার দখল করে আছে।
বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, বিশেষ করে রপ্তানিমুখী শিল্পাঞ্চল ও ইপিজেডগুলোর মাধ্যমে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্র্তৃপক্ষ-বেজার সহযোগিতায় কর্ণফুলী নদীর তীরবর্তী ‘জাপান ইকোনমিক জোন’-এর পরিকল্পনা এই সহযোগিতাকে আরও সুসংহত করেছে। শিল্পায়নের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নিয়ে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি কর্র্তৃক ১৯৯৫ সালে প্রস্তুতকৃত ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট প্ল্যান ফর চিটাগাং রিজিয়ন’ আজ বাস্তবায়নের পথে।
জাপানি বিনিয়োগের একটি বড় অংশ এসেছে রাসায়নিক (৫৭ শতাংশ) এবং টেক্সটাইল (১৬ শতাংশ) খাতে। মেটাল প্রডাক্টস (১৩ শতাংশ) ও ইলেকট্রনিকস (১১ শতাংশ) খাতেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। এই বিনিয়োগের সুফল হিসেবে কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং রপ্তানি আয় বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হচ্ছে।