ট্যুরিস্ট ভিসায় বিপাকে ৩ লাখ শ্রমিক

মোহাম্মদ ইলিয়াস। গ্রামের বাড়ি শরীয়তপুর। ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় সহায়-সম্বল বিক্রি করে মালয়েশিয়া যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন। বেশি বেতনের আশায় শাহ আলম নামের এক দালালকে সাড়ে ৩ লাখ টাকা দিয়ে দেন। গত ১৬ মে তিনি সকাল ৮টা ২৫ মিনিটে কুয়ালালামপুরে পৌঁছান। বিমানবন্দরে নেমেই এক দালালকে দিয়েছেন আরও ১ লাখ টাকা।
 
কিন্তু দালাল বিমানবন্দর থেকে বের করতেই টালবাহানা করতে থাকেন। কিছুক্ষণ পরপর বলেন, এক ঘণ্টা পর বের করব আর দুই ঘণ্টা থাকেন। এভাবে দালাল দুদিন শুধু ঘুরিয়েছেন। খাবার নেই, পানি নেই। বিমানবন্দরের ভেতরে থাকা খাবারের দোকান থেকে এটা-ওটা কিনে খেয়েছেন। যাদের কাছে টাকা ছিল না, তারা না খেয়ে দিন পার করেছেন। ট্যুরিস্ট ভিসায় নিয়ে যান দালাল। পরে তাকে দেশেই ফেরত পাঠিয়ে দেয় ওই দেশের ইমিগ্রেশন পুলিশ। 
 
ইলিয়াসের মতোই প্রায় ৩ লাখ শ্রমিক ট্যুরিস্ট ভিসায় মালয়েশিয়া গিয়ে হয়রানির শিকার হচ্ছেন। তাদের রক্ষা করতে মালয়েশিয়া হাইকমিশন উদ্যোগ নিচ্ছে না বলে শ্রমিকরা অভিযোগ করেছেন। সম্প্রতি মালয়েশিয়ার কয়েকটি শহরে সরেজমিনে গিয়ে শ্রমিকদের হয়রানির বিষয়ে পাওয়া গেছে এসব তথ্য। 
 
সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, মালয়েশিয়া থেকে কাজের যেসব চাহিদাপত্র আসে, তা দূতাবাস যাচাই-বাছাই করেই পাঠায়। প্রতিষ্ঠানগুলোয় কর্মীর প্রয়োজন রয়েছে কি না বা কর্মীদের বেতন দিতে পারবে কি না, সেগুলো দূতাবাস থেকে যাচাই করা হয়। পরে রিক্রুটিং এজেন্সির আবেদনের ভিত্তিতে স্মার্টকার্ড দেয় বিএমইটি। 
 
বাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্য বলছে, সৌদি আরবের পর দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শ্রমবাজার মালয়েশিয়া। বর্তমানে প্রায় ১৫ লাখের বেশি বাংলাদেশি কর্মী মালয়েশিয়ায় কর্মরত। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর ২০২২ সালে দেশটির শ্রমবাজার খোলা হয়। ওই বছর যান ৫১ হাজারের মতো। ২০২৩ সালে যান ৩ লাখ ৫১ হাজার ৬৮৩ জন। ২০২৪ সালে দেশটিতে যান ৯৩ হাজার ৬৩২ জন। নানা অভিযোগ ওঠায় আবার বন্ধ হয়ে যায় শ্রমবাজার। এরই মধ্যে প্রায় তিন লাখ শ্রমিক ট্যুরিস্ট ভিসায় যান। বিভিন্ন রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে দালালরা লোকজন পাঠিয়ে প্রতারণা করে আসছেন। তাদের মধ্যে কেউ মালয়েশিয়ার ইমিগ্রেশন পুলিশের হাতে ধরা পড়ছেন আবার কেউ পালিয়ে দিনযাপন করছেন। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের তথ্যমতে, গত দুই বছরের ব্যবধানে চাকরি হারানোসহ নানা কারণে দেশে ফিরেছেন পাঁচ লাখ শ্রমিক। 
 
অবৈধভাবে যাচ্ছেন হাজার হাজার শ্রমিক: বৈধভাবে যাওয়ার সুযোগ না পেয়ে প্রতিনিয়ত অবৈধভাবে মালয়েশিয়া যাচ্ছেন হাজার হাজার শ্রমিক। দালাল চক্রের প্রলোভনে পড়ে তারা মালয়েশিয়া গিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। কুয়ালালামপুর থেকে ১৯ মে একটি এয়ারলাইনসের ফ্লাইটে ৪০ জন যাত্রীকে ফেরত পাঠানো হয়। যারা ট্যুরিস্ট ভিসা নিয়ে শ্রমিক হিসেবে মালয়েশিয়া প্রবেশের চেষ্টা করছিলেন। প্রতারিত হওয়া ৪০ জন ব্যক্তি ৩ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করে ট্যুরিস্ট ভিসায় মালয়েশিয়ায় যান। কিন্তু মালয়েশিয়ার ইমিগ্রেশন পুলিশ তাদের ফেরত পাঠিয়েছে। তা ছাড়া অভিবাসী ক্যাম্পে আটকা পড়ে আছেন অবৈধভাবে যাওয়া কয়েক লাখ শ্রমিক। কুয়ালালামপুরে বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তারা শ্রমিক আটক থাকার বিষয়টি স্বীকার করলেও তাদের প্রকৃত সংখ্যা জানাতে পারেননি। 
 
বেশি টাকা নিয়ে লাভবান হচ্ছেন দালালরা: মালয়েশিয়া থেকে ফেরত আসা শ্রমিকদের একজন মুন্সীগঞ্জের হেলেনা বেগম। বিমানে বসে আলাপকালে জানান, সুদে সাড়ে ৩ লাখ টাকা নিয়ে স্থানীয় একজন দালালের মাধ্যমে গত ১৬ মে সকালে মালয়েশিয়া যান। তাকে ২২ দিনের ট্যুরিস্ট ভিসা দেওয়া হয়। কথা ছিল এয়ারপোর্ট কন্ট্রাক্ট করে তাদের নিয়ে যাওয়া হবে। কিন্তু মালয়েশিয়ান ইমিগ্রেশন পুলিশের সন্দেহ হলে তাদের আটক করে। তিন দিন পর ফিরতি বিমানে বাংলাদেশে ফেরত পাঠায়। তিনি বলেন, ‘স্বামী মারা যাওয়ার পর দুই সন্তান নিয়ে কষ্টে দিন কাটছে। তাই দালালের প্রলোভনে পড়ে সুদে সমিতি থেকে টাকা এনে মালয়েশিয়া যান। মোস্তফা নামে এক দালালের মাধ্যমে একটি রিক্রুটিং এজেন্সি তাদের মালয়েশিয়ায় পাঠায়। আমার মতো শতাধিক লোকের কাছ থেকে দালাল ও এজেন্সিরা মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন। বিমানবন্দরে আরও প্রায় এক হাজার লোক আটকা আছেন। তাদের অনেকে বাংলায় কথা বলেন।’ 
 
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ইমিগ্রেশন আমাদের আটক করে এক দিন জেলে রাখে। পরে ১২০ রিঙ্গিত জরিমানা করে। জরিমানার টাকা পরিশোধ করার পর ফ্লাইটে তুলে দেয়।’ 
 
ইলিয়াস নামে আরেক প্রতারিত শ্রমিক বলেন, ‘আমার কাছ থেকে শাহ আলম নামের এক দালাল সাড়ে ৫ লাখ টাকা নিয়েছেন।’ একই তথ্য জানালেন যশোরের পাইকগাছার রবিউল হোসেনও। 
 
নতুন করে জিটুজি চুক্তি হচ্ছে আবার: মালয়েশিয়াপ্রবাসী কমিউনিটি নেতারা বলছেন, ‘ভয়ে ভয়ে দিন কাটছে সবার মধ্যে। কথিত এজেন্টদের হাতে প্রতারিত হওয়াতেই তারা আজ পর্যন্ত দেশটির বৈধ শ্রমিকের স্বীকৃতি পাননি। বহুদিন মালয়েশিয়ায় থাকার পরও যাদের বৈধ কাগজপত্র নেই, এই ধরপাকড় অভিযান নিয়ে তাদের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক বিরাজ করছে। গভর্নমেন্ট টু গভর্নমেন্ট (জিটুজি) ব্যবস্থাপনায় মালয়েশিয়ার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো জনশক্তি আমদানি করবে বলে আমরা শুনেছি। এর আগেও এ ধরনের চুক্তি হয়েছিল। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার নতুন করে এই চুক্তি করবে বলে আমরা জেনেছি। যদি এই চুক্তি করতে পারে, তাহলে শ্রমিকরা বেশি লাভবান হবেন। অভিবাসনব্যয় ১ লাখ টাকার নিচে চলে আসবে। সিন্ডিকেট করে একাধিক চক্র ৩ থেকে সাড়ে ৪ লাখ টাকা দিতে বাধ্য করছে। তখন সিন্ডিকেট বলতে কিছ্ থাকবে না।’ 
 
একেপিএসের নজরধারী: গত ১৮ মে মালয়েশিয়ার সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ও সুরক্ষা সংস্থার (একেপিএস) এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, বিমানবন্দরে অবতরণের ছয় ঘণ্টার বেশি সময় পরও ইমিগ্রেশন কাউন্টারে উপস্থিত না হওয়ায় ১১২ জনকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। একেপিএসের মনিটরিং ইউনিটের নিয়মিত নজরদারি অভিযানের সময় বিভিন্ন দেশের প্রায় ৩০০ ব্যক্তিকে পরীক্ষা করে ১১২ জনকে শনাক্ত করা হয়। যারা দীর্ঘক্ষণ ধরে বিমানবন্দরে অবস্থান করছিলেন, তাদের অনেকেই ইচ্ছাকৃত ইমিগ্রেশন কাউন্টারে যাননি। বিদেশি নাগরিকদের এ ধরনের আচরণ মালয়েশিয়ায় প্রবেশের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সন্দেহ তৈরি হয়। ফলে তাদের আটক করা হয়। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে বাংলাদেশি ছাড়াও ভারত ও পাকিস্তানের নাগরিক ছিলেন। 
 
একেপিএস আরও জানায়, আটককৃতরা মূলত পর্যটক হিসেবে প্রবেশের দাবি করলেও তারা ইমিগ্রেশন কাউন্টারের দিকে আগাননি; বরং বিমানবন্দরের বিভিন্ন জায়গায় ঘোরাফেরা করছিলেন এবং বিশেষ কারও জন্য অপেক্ষা করছিলেন বলে সন্দেহ করা হয়। আটককৃতদের আরও তদন্ত ও পরিদর্শনের জন্য বিমানবন্দরের একেপিএস মনিটরিং ইউনিট অফিসে নিয়ে যাওয়া হয়। তাদের বিরুদ্ধে প্রবেশ প্রত্যাখ্যানের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত জারি করা হয়। 
 
নৌপথে যাচ্ছেন শ্রমিকরা: মালয়েশিয়ান দূতাবাসের কাউন্সিলর (রাজনৈতিক) প্রণব কুমার ভট্টাচার্য্যরে সঙ্গে আলাপকালে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, নৌপথ বা অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ পথেও আসছেন তারা। একশ্রেণির অসাধু রিক্রুটিং ও ট্রাভেল এজেন্সির মালিকরা এই চক্র নিয়ন্ত্রণ করছে। তারা দালালের মাধ্যমে শ্রমিকদের নানা প্রলোভন দেখিয়ে মালয়েশিয়া নিয়ে যান। শ্রমিকরা ইমিগ্রেশন পুলিশের হাতে আটক হয়ে অভিবাসী ক্যাম্পে মানবেতর জীবনযাপন করেন। 
 
জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সির (বায়রা) মহাসচিব আলী হায়দার চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, শ্রমিকরা যেকোনো উপায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ চান। বৈধভাবে শ্রমিকরা যেতে না পারলে অবৈধভাবে যেতে চান। তাই বৈধভাবে শ্রমবাজার উন্মুক্ত করা জরুরি। অবৈধভাবে যারা ট্যুরিস্ট ভিসায় শ্রমিক পাঠায়, তাদের বিরুদ্ধে সরকারের উচিত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া।
 
বৈধভাবে গিয়েও অনেকে সমস্যায় পড়ছেন: সব নিয়মকানুন মেনে বৈধভাবেই কর্মী ভিসায় মালয়েশিয়ায় গিয়েছিলেন নাজমুল ইসলাম। কিন্তু গিয়ে দেখেন নিয়োগকর্তা যে কাজের জন্য তাকে নিয়ে যান, সে রকম কোনো কাজই তার কাছে নেই, মিলছে না কোনো বেতনও। ফলে বাধ্য হয়ে কুয়ালালামপুরে অন্য একজনের অধীনে নির্মাণ খাতে কাজ করছেন এই কর্মী। মালয়েশিয়ার আইনে এটি অবৈধ। এ রকম অবৈধভাবে কাজ করছেন অসংখ্য শ্রমিক। মূলত কিছু অসাধু এজেন্ট ও স্থানীয় দালালদের খপ্পরে পড়ে এই দশা হয়েছে তাদের। কয়েকজন শ্রমিক বলেন, ‘মালিকপক্ষ চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে কম বেতন দেয়, অতিরিক্ত সময় কাজ করায় এবং শ্রমিকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে। তারা নির্ধারিত মালিকের অধীনে কাজ করতে না চেয়ে অন্য জায়গায় কাজ খোঁজেন। ট্যুরিস্ট ভিসায় যারা আছেন, তারা মহাসমস্যায় আছেন। হাইকমিশন আমাদের কোনো সহায়তা করে না। তাদের কাছে গেলে গালাগাল করে তাড়িয়ে দেয়। আইনগত সুরক্ষা না থাকায় তারা কারোর বিরুদ্ধে অভিযোগও করতে পারেন না।’
 
কঠোর মনিটরিংয়ের আওতায় আনার পরামর্শ: শ্রমবাজারের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন বিশ্লেষক দেশ রূপান্তরকে বলেন, সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া সরকারের উচিত রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর কার্যক্রম কঠোরভাবে মনিটর করা। যাতে শ্রমিকরা প্রতারিত না হন। যারা এসব অপকর্ম চালিয়ে আসছে, তাদের কঠোর আইনের আওতায় আনতে হবে। গ্রামাঞ্চলে সহজ-সরল লোকদের সঙ্গে যেসব দালাল প্রতারণা করছেন, তাদের তালিকা তৈরি করে গ্রেপ্তারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তাদের প্রতিরোধ করতে না পারলে এসব সমস্যা বাড়তেই থাকবে। নষ্ট হবে বাংলাদেশের সুনাম।