পদত্যাগ না করতে রাজনৈতিক ঐক্য

গত বৃহস্পতিবার রাতে প্রধান উপদেষ্টার পদত্যাগের ইচ্ছা পোষণের খবর নাড়িয়ে তোলে রাজনৈতিক দলসহ বিভিন্ন মহলকে। সাধারণ মানুষও ভাবতে থাকে দেশের ক্রান্তিকালে কী হতে যাচ্ছে? এ নিয়ে দেশ-বিদেশে শুরু হয় নানা আলোচনা। গত দুদিনে রাজনৈতিক দলসহ বিভিন্ন মহল থেকে পদত্যাগ না করার অনুরোধ আসতে থাকে। আওয়ামী লীগ সরকার পতন আন্দোলনে যুক্ত থাকা বড় একটি রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা প্রধান উপদেষ্টাকে পদত্যাগ না করার অনুরোধ করবেন বলে একটি সূত্রে জানা গেছে।

গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এরপর রাজনীতিতে বিভক্তি, দলগুলোসহ সরকারের অংশীজনদের বিভিন্ন পক্ষের স্বার্থ নিয়ে বিরোধ এবং সরকারকে অসহযোগিতার বিষয়টি দৃশ্যমান হয়। তবে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গতকাল শনিবার প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির সঙ্গে আলাদা বৈঠক করেছেন। সেখানে আবারও রাজনৈতিক ঐকমত্যের দৃষ্টান্ত স্থাপন হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর বৈঠকের পর গতকাল রাতে যমুনার সামনে তার প্রেস সচিব শফিকুল আলম সাংবাদিকদের বলেন, ৩০ জুন সুনির্দিষ্ট ডেট। নির্বাচন এর বাইরে যাবে না। এক প্রশ্নের জবাবে প্রেস সচিব বলেন, প্রফেসর ইউনূস বারবার বলেছেন, ইলেকশন ডিসেম্বর থেকে জুনের মধ্যে হবে। ... এই জুন, ৩০ তারিখটা একটা সুনির্দিষ্ট ডেট। উনি বলছেন যে, এর বাইরে যাবে না। উনি এক কথার মানুষ।

এদিকে গতকাল দুপুরে উপদেষ্টা পরিষদের ‘অনির্ধারিত বৈঠক’ শেষে পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, ‘উনি (প্রধান উপদেষ্টা) তো চলে যাবেন বলেননি। বলেছেন, আমরা যে কাজ করছি, আমাদের ওপরে যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, এ দায়িত্ব ছেড়ে তো আমরা যেতে পারব না।’

মূলত চলমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতেই রাজনৈতিক দলের সঙ্গে রাতে ওই বৈঠকের আয়োজন করা হয়। বৈঠকে অংশ নেওয়া তিনটি দল তাদের দাবি-দাওয়া প্রধান উপদেষ্টার কাছে তুলে ধরেছেন। ড. ইউনূস এখন তার ভবিষ্যৎ নীতিকৌশল ঠিক করবেন। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিভক্তি এবং সরকারের সঙ্গে যে দূরত্ব, তা দূর করতে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তের কথা এখনো জানা যায়নি। তবে অধ্যাপক ইউনূস যে পদত্যাগ করছেন না, সেটি এখন পুরোটা নিশ্চিত।

রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বৈঠকের আগে সার্বিক বিষয় নিয়ে গতকাল উপদেষ্টা পরিষদের এক অনির্ধারিত বৈঠকেও আলোচনা হয়। গত কয়েক দিনের পুরো ঘটনা নিয়ে প্রধান উপদেষ্টা জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিতে পারেন বলেও সরকারের একাধিক সূত্র জানিয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি তিনটি দলের এখন প্রভাব রয়েছে। নানা স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে তাদের মধ্যে সম্পর্কের টানাপড়েন বেড়েছে কিছুদিন ধরে। যে কারণেই মূলত এই রাজনৈতিক বিভক্তি।

তারা বলছেন, সবচেয়ে বড় দল বিএনপি ও অন্তর্বর্তী সরকারের মধ্যে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে, তা আর বাড়তে দেওয়া উচিত নয়। জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যুতে সশস্ত্র বাহিনীকে সম্পৃক্ত না করার বিষয়ে সেনাপ্রধানের অভিযোগের বিষয়টি প্রধান উপদেষ্টা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করে মীমাংসা করতে পারেন। ডিসেম্বর না জুন এই বিতর্ক না করে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে সরকার নির্বাচনের একটি রোডম্যাপ ঘোষণা করলেই এ অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা অনেকটা কেটে যাবে।

সূত্রমতে, গতকাল সকালে বিএনপির সঙ্গে প্রস্তাবিত বিকেলের বৈঠকটি এক অজ্ঞাত কারণে স্থগিত করা হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত ড. মুহাম্মদ ইউনূস বিএনপি ও জামায়াতের সঙ্গে বৈঠকে বসতে সম্মত হন।

দেশের স্বার্থে বৃহত্তর ঐক্য প্রয়োজন : দেশকে স্থিতিশীল রাখতে, নির্বাচন, বিচার ও সংস্কারকাজ এগিয়ে নিতে এবং চিরতরে দেশে স্বৈরাচারের আগমন প্রতিহত করতে বৃহত্তর ঐক্য প্রয়োজন বলে মনে করে উপদেষ্টা পরিষদ। এ বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকার রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্য শুনবে এবং সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করবে।

গতকাল জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের সভা শেষে উপদেষ্টা পরিষদের এক অনির্ধারিত বৈঠকে উপদেষ্টারা এসব কথা বলেন বলে এক বিবৃতিতে জানিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার।

প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে রাজধানীর পরিকল্পনা কমিশনে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর অর্পিত তিনটি প্রধান দায়িত্ব (নির্বাচন, সংস্কার ও বিচার) বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

এসব দায়িত্ব পালনে বিভিন্ন সময় নানা ধরনের অযৌক্তিক দাবি-দাওয়া, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও এখতিয়ারবহির্ভূত বক্তব্য এবং কর্মসূচি দিয়ে যেভাবে স্বাভাবিক কাজের পরিবেশ বাধাগ্রস্ত করে তোলা হচ্ছে এবং জনমনে সংশয় ও সন্দেহ সৃষ্টি করা হচ্ছে, তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয় বৈঠকে।

বিবৃতিতে বলা হয়, শত বাধার মধ্যেও গোষ্ঠীস্বার্থকে উপেক্ষা করে অন্তর্বর্তী সরকার তার ওপর দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। যদি পরাজিত শক্তির ইন্ধনে এবং বিদেশি ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে সরকারের ওপর আরোপিত দায়িত্ব পালনকে অসম্ভব করে তোলা হয়, তবে সরকার সব কারণ জনসমক্ষে উত্থাপন করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।

অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই অভ্যুত্থানের জনপ্রত্যাশাকে ধারণ করে। কিন্তু সরকারের স্বকীয়তা, সংস্কার উদ্যোগ, বিচার প্রক্রিয়া, সুষ্ঠু নির্বাচন ও স্বাভাবিক কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করে এমন কর্মকা- অর্পিত দায়িত্ব পালন করাকে অসম্ভব করে তুললে সরকার জনগণকে সঙ্গে নিয়ে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে বলে উল্লেখ করা হয় বিবৃতিতে।

যেসব কারণে প্রধান উপদেষ্টার পদত্যাগের প্রশ্ন : অধ্যাপক ইউনূসকে কেন পদত্যাগের চিন্তা করতে হচ্ছে, সক্রিয় সব রাজনৈতিক দলের সমর্থনে গঠিত এই সরকারকে কেন এমন সংকটে পড়তে হলো এসব প্রশ্ন এখন সব মহলে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে।

এমন এক পটভূমিতে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ইউনূস বৃহস্পতিবার অন্য উপদেষ্টাদের সঙ্গে এক অনির্ধারিত বৈঠকে তার পদত্যাগের ভাবনার কথা বলেছেন। সে ক্ষেত্রে নানা পক্ষের প্রতিবন্ধকতার পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর অসহযোগিতায় তার সরকার কাজ করতে পারছে না বলে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন তিনি।

অভ্যুত্থানের পর প্রথম কয়েক মাস রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের একটা সমঝোতামূলক সম্পর্ক ছিল। সরকারের নীতিনির্ধারকরা জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে পরামর্শ করতেন।

কিন্তু সময়ের ব্যবধানে দূরত্ব বাড়তে থাকে। গত বুধবার সেনা কর্মকর্তাদের উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বলেছেন, সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেক বিষয়ে সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাদের ‘অন্ধকারে’ রেখে।

মিয়ানমারে মানবিক বিপর্যয় রোধে ত্রাণসামগ্রী পৌঁছানোর জন্য মানবিক চ্যানেল তৈরি কিংবা চট্টগ্রাম বন্দরের একটি টার্মিনাল পরিচালনার ভার বিদেশি কোম্পানিকে দেওয়ার বিষয়ে সরকার রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করেনি।

বিএনপির অভিযোগ, ইশরাক হোসেনের ঘটনায় সরকারের অবস্থান ছিল পক্ষপাতমূলক। যেখানে নির্বাচন কমিশন তাকে মেয়র ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন দিয়েছে, সেখানে রিটের অজুহাতে তার শপথ আটকে দেওয়া দুরভিসন্ধি।

সপ্তাহব্যাপী নগর ভবন ও রাজপথের আন্দোলনের কারণে যে নগরবাসী অবর্ণনীয় ভোগান্তির মধ্য পড়েছেন, বিএনপিও এটা করতে চায়নি। কিন্তু চার দিন ধরে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করেও যখন নেতারা ব্যর্থ হলেন, তখনই সংবাদ সম্মেলনের সিদ্ধান্ত নেন। বিএনপির অভিযোগ, এই জনদুর্ভোগের দায়ও সরকারের। এনসিপি নেতার এক ঘণ্টার আলটিমেটামের মুখে উপদেষ্টা পরিষদ জরুরি বৈঠক ডেকে তাদের দাবি মেনে নিলেও ইশরাকের বিষয়টি ছয় দিন ঝুলিয়ে রাখা অপমানজনক।

তারা বলছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ছাত্র নেতৃত্বের প্রতি অধ্যাপক ইউনূসের দুর্বলতা রয়েছে; যা তিনি নিজে বিভিন্ন সময় প্রকাশও করেছেন।

সেই ছাত্র নেতৃত্ব যখন রাজনৈতিক দল এনসিপি গঠন করল, এই দলের প্রতিও তার পক্ষপাতিত্ব রাজনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রকাশ পেয়েছে। যা বিএনপিকে ক্ষুব্ধ করেছে।

সরকারের গত নয় মাসে প্রথম দিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এবং পরে এনসিপির ব্যানারে বিভিন্ন ইস্যু তুলে রাজপথে অবস্থানসহ নানা কর্মসূচি পালন করতে দেখা গেছে।

সর্বশেষ আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবিতে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবনের সামনেও অবস্থান কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। সেই পরিস্থিতিতে সরকার দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে।

অন্যদিকে, বিভিন্ন গোষ্ঠীর মব বা দলবদ্ধ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির বিষয়টি আলোচিত। এ ব্যাপারে সরকারের দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা বা সমর্থনের বিষয়ও বিভিন্ন সময় আলোচনায় এসেছে।

সরকারের একাধিক উপদেষ্টা জানিয়েছেন, প্রধান উপদেষ্টা গত বৃহস্পতিবার তাদের সঙ্গে যে বৈঠক করেছেন, সেখানে অধ্যাপক ইউনূস নিজেও অংশীজনদের অসহযোগিতার কথা বলে হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

বিএনপি অবশ্য উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও মাহফুজ আলম, এই দুই ছাত্র প্রতিনিধির পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমানের পদত্যাগের দাবি তুলেছে।

দলটির নেতারা বলছেন, এনসিপি বিভিন্ন সময় রাস্তায় অবস্থান নিয়ে চাপের মুখে দাবি আদায়ের সংস্কৃতি তৈরি করেছে। সেখানে বিএনপির যৌক্তিক দাবি মানা হচ্ছে না। এনসিপি নেতারা এ ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করছেন।

প্রধান উপদেষ্টা ‘অবশ্যই’ থাকবেন : গতকাল দুপুরে উপদেষ্টা পরিষদের ‘অনির্ধারিত বৈঠক’ শেষে পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, ‘উনি (প্রধান উপদেষ্টা) তো চলে যাবেন বলেননি। বলেছেন, আমরা যে কাজ করছি, আমাদের ওপরে যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, সে দায়িত্ব পালনে অনেক প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে; কিন্তু আমরা সব প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে আমাদের অর্পিত দায়িত্ব, এটা তো বড় দায়িত্ব, এটার ওপর নির্ভর করছে ভবিষ্যৎ, বহু বছরের ভবিষ্যৎ, এ দায়িত্ব ছেড়ে তো আমরা যেতে পারব না।’

উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠক প্রসঙ্গে ওয়াহিদউদ্দিন বলেন, ‘দায়িত্ব পালনে যে প্রতিবন্ধকতাগুলো আসছে, সেই প্রতিবন্ধকতাগুলো নিয়ে আমরা আলোচনা করেছি। আমরা প্রত্যেকে বিভিন্ন জায়গা থেকে কী প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে, কার কী প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে সংস্কারকাজ আমরা এগিয়ে নিতে গেলে কী হচ্ছে, সেগুলো আমরা দেখছি।’

আগামী নির্বাচনের সময়সূচি নিয়ে কোনো কথা হয়েছে কি না, এ প্রশ্নের কোনো জবাব দেননি তিনি। বলেছেন, এ ক্ষেত্রেও যেসব প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, তা চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে।

পরিকল্পনা উপদেষ্টা বলেন, ‘আগামী নির্বাচন ও সুশাসিত গণতান্ত্রিক অবস্থায় উত্তরণে যে ধরনের ক্ষেত্র তৈরি করা দরকার সেই কাজেও। এটা তো আমাদের প্রধান কাজ; সেই কাজেও কোথা থেকে কী প্রতিবন্ধকতা আসছে সেগুলো আমরা চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছি।’ নির্বাচনের প্রতিবন্ধকতা কী চিহ্নিত করা হয়েছে এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান।

বিচার, সংস্কার ও নির্বাচনের রোডম্যাপ প্রকাশের আহ্বান এনসিপির : গতকাল রাজধানীর বাংলা মোটরে এনসিপির কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বিচার, সংস্কার ও নির্বাচনের রোডম্যাপ একসঙ্গে প্রকাশের আহ্বান জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, বিচার, সংস্কার ও নির্বাচন তিনটির রোডম্যাপ একসঙ্গে প্রকাশ করা উচিত। তাহলে জনমনে ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে স্বস্তি তৈরি হবে। আস্থার জায়গা তৈরি হবে। পাশাপাশি জনগণ ও রাজনৈতিক দলগুলোকে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে।

ছাত্র-জনতার প্রবল আন্দোলনে গত বছর ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা পালিয়ে ভারতে চলে যাওয়ার তিন দিন পর ৮ আগস্ট নোবেল বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে শপথ নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। জুলাই আন্দোলনের ঐক্য মাস কয়েক বজায় থাকলেও প্রথমে ছাত্রদের মধ্যে ফাটল দেখা দেয়। তারপর রাষ্ট্রপতিকে অপসারণ ও ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’ নিয়ে বিএনপির সঙ্গে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের দূরত্ব তৈরি হয়।

এরপর ফেব্রুয়ারি মাসে ছাত্র আন্দোলন ও তাদের জাতীয় নাগরিক কমিটির উদ্যোগে নতুন দল এনসিপি আত্মপ্রকাশ করলে সংস্কার ও নির্বাচন বিষয়ে মিত্র দলগুলোর মধ্যে বিভেদ স্পষ্ট হতে শুরু করে।

রাজপথ দখলে নিয়ে টানা বিক্ষোভ দেখিয়ে এনসিপি যে কৌশলে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবি আদায় করে নিয়েছে, বিএনপি নেতা ইশরাক হোসেন সেই একই কৌশলে মেয়র পদে বসার চেষ্টা করলে এনসিপির সঙ্গে বিরোধ বাড়তে শুরু করে।

ইশরাককে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে শপথ পড়ানোর দাবিতে এক সপ্তাহ আগে নগর ভবনের সামনে লাগাতার আন্দোলন শুরু করেন তার সমর্থকরা। পরে তারা প্রধান উপদেষ্টার বাসভবনের কাছে কাকরাইলে সড়ক অবরোধ করেও বিক্ষোভ দেখান।

সেই বিক্ষোভ কর্মসূচি থেকে ইশরাক স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের পদত্যাগ দাবি করেন।

অন্যদিকে ইশরাককে মেয়র ঘোষণার গেজেট প্রকাশ করায় নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে এনসিপি। কমিশন পুনর্গঠন দাবি করে তারা নির্বাচন ভবনের সামনে বিক্ষোভও করে।

সেখানে দলটির নেতা নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী পরিকল্পনা উপদেষ্ট ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ, অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ ও আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলকে বিএনপির মুখপাত্র আখ্যায়িত করে তাদের পদত্যাগ দাবি করেন।

এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার মধ্যে সেনানিবাসে সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন দেওয়ার বিষয়ে কথা বলেছেন বলে খবরে এসেছে।

বৃহস্পতিবার বিএনপি জরুরি সংবাদ সম্মেলন করে স্থানীয় সরকার, তথ্য ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার পদত্যাগ দাবি করে। ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন না হলে সরকারের ওপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহারের হুমকি দেয়।

এমন পরিস্থিতিতে প্রধান উপদেষ্টার ‘পদত্যাগের ইচ্ছা প্রকাশের’ গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে দেখা করতে যান নাহিদ ইসলাম। এরপর সরকারে থাকা দুই ছাত্র উপদেষ্টা মাহফুজ আলম ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াও মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে দেখা করেন।

বৃহস্পতিবার বিএনপির স্থায়ী কমিটির পক্ষ থেকে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে ডিসেম্বরের মধ্যেই সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানে দলের অবস্থান জানানো হয়।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ওইদিন বৈঠক করে জামায়াতে ইসলামী। বৈঠকে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার পর দলটির আমির শফিকুর রহমান সর্বদলীয় বৈঠক ডাকতে প্রধান উপদেষ্টার প্রতি আহ্বান জানান।