প্রকাশ্যে খুন-ছিনতাই-ডাকাতি নাগরিকের উদ্বেগ

রবিবার রাত ১১টা। রাজধানীর বাড্ডা থানাধীন গুদারাঘাট এলাকার একটি মুদি দোকানের সামনে চেয়ারে বসে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিলেন গুলশান থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক কামরুল আহসান সাধন। হঠাৎ মাস্ক পরা দুই যুবক এসে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করে কামরুলকে। ঘাড়ে, কাঁধে, পিঠে, বুকের নিচে ও পেটে গুলি করে হত্যা করা হয়। পরে একাধিক ফাঁকা গুলি করে দুর্বৃত্তরা চলে যায়।

একই দিন মগবাজার এলাকায় দিনে-দুপুরে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে এক যুবকের ব্যাগ ছিনতাইয়ের ঘটনার একটি সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এতে দেখা যায়, ১৮ মে বিকেল ৫টা ২২ মিনিটের দিকে কাঁধে ব্যাগ নিয়ে ফাঁকা একটি গলি দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন এক যুবক। এ সময় বিপরীত দিক থেকে আসা একটি সাদা রঙের মোটরসাইকেলে বসে থাকা তিন যুবকের মধ্যে দুজন নেমে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে ওই পথচারী যুবকের কাঁধে থাকা ব্যাগ ও অন্যান্য জিনিসপত্র ছিনিয়ে নিয়ে যায়।

শুধু বাড্ডা ও মগবাজারের ঘটনাই নয়, পুরো দেশ জুড়েই বেপরোয়া হয়ে উঠেছে অপরাধীরা। প্রকাশ্যে খুন, ডাকাতি, ছিনতাই, সশস্ত্র মহড়াসহ নানা অপরাধ কর্মকা-ের ঘটনা ঘটছে। মানুষকে জিম্মি করে, অস্ত্র ঠেকিয়ে, গুলি করে অথবা ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে সর্বস্ব লুটে নিচ্ছে। এতে মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে নিরাপত্তাহীনতাবোধ ও আতঙ্ক।

২৪-এর জুলাই বিপ্লবের পর সারা দেশে ক্রমানুসারে বেড়ে চলছিল এই অপরাধমূলক কর্মকা-। পরে যৌথবাহিনীর অভিযান ‘ডেভিল হান্ট’ সহ নানা উদ্যোগ নেওয়া হলে অপরাধ কর্মকা- কিছুটা কমে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় ঢিলেমি দেখা দিলে আবারও বাড়তে থাকে একই ধরনের অপরাধ। প্রায়ই রাজধানীর মোহাম্মদপুরে সশস্ত্র মহড়া চালায় কিশোর গ্যাং সদস্যরা। কেউ কথা না শুনলে হুমকি, অস্ত্র দেখিয়ে শাসানো, তুচ্ছ বিষয় নিয়ে খুন, চাঁদাবাজি দ্বন্দ্বে হত্যা, প্রকাশ্যে রামদা দিয়ে কুপিয়ে ছিনতাই ও মাদক সেবন কেন্দ্রকে করে খুনসহ এখন আবার বেড়েছে অপরাধমূলক কর্মকা-।

পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, সারা দেশে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল এই চার মাসে ১ হাজার ২৪৬টি খুনের ঘটনায় মামলা হয়েছে। গত জানুয়ারি মাসে ২৯৪টি, ফেব্রুয়ারিতে ৩০০টি, মার্চে ৩১৬টি ও এপ্রিলে ৩৩৬টি হত্যার ঘটনায় মামলা হয়। ক্রমেই এই সংখ্যা বাড়তে দেখা যায়। এ ছাড়া এই চার মাসে চুরি, ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনায় মামলা হয়েছে ১ হাজার ৭৭৫টি। এর মধ্যে গত এপ্রিল মাসে ৪১৪টি, মার্চে ৪৩৭টি, ফেব্রুয়ারিতে ৪২০টি ও জানুয়ারিতে ৫০৪টি মামলা হয়।

অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, খুনের ঘটনায় মামলা হলেও চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাইয়ে ঘটনা ভিন্ন। মামলা দিয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র সবসময় বোঝা যায় না। পুলিশ যে ঘটনাগুলোতে তাদের কাছে অভিযোগ যায় কিংবা মামলা হয়, সেগুলোই নথিবদ্ধ করে। অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী পুলিশের কাছে যান না ঝামেলার ভয়ে। থানাগুলো কখনো কখনো চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনায় মামলা না নিয়ে মূল্যবান জিনিসপত্র বা টাকা হারানোর সাধারণ ডায়েরি (জিডি) নেয়। অবশ্য পুলিশ বলছে, তারা এখন আর মামলা নিতে অনীহা দেখায় না। এ কারণে মামলার সংখ্যা বেশি হতে পারে।

মানুষ এখন নিরাপদ বোধ করছে না উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, অপরাধ পরিস্থিতির উন্নতির অন্যতম নির্দেশক হলো, মানুষ ঘরে-বাইরে কিংবা চলাচলে নিরাপদ বোধ করছে কি না। এখন এই নিরাপদ বোধ করা সম্ভব নয়। তাই এই অবস্থায় বলা যাচ্ছে না যে আইনশৃঙ্খলার ক্ষেত্রে উন্নতি সাধিত হয়েছে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গত ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। শুরু থেকেই সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ ছিল রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল করা এবং আইনশৃঙ্খলার উন্নতি ঘটানো। বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজনৈতিক পরিস্থিতি মোটামুটি স্থিতিশীল করতে পেরেছে সরকার। তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দেশ রূপন্তরকে বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী শক্তভাবে বিশৃঙ্খলা ও অপরাধ দমন করতে পারছে না। এতে অপরাধীরা মনে করছে, তারা পার পেয়ে যাবে। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) থানা পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অভিযানে গেলে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তখন বল প্রয়োগ করা হলে ভিন্ন পরিস্থিতি তৈরির আশঙ্কাও থাকে। এ কারণে পুলিশকে অপরাধীরা এখন আর সেভাবে ভয় পাচ্ছে না। এ কারণেই তারা বেপরোয়া।

ডিএমপি সূত্রে জানা যায়, নভেম্বর থেকে এপ্রিল এই ছয় মাসে মহানগরীতে খুনের ঘটনায় মামলা হয়েছে ১৩৯টি, ডাকাতির ঘটনায় মামলা হয়েছে ৩৬টি, ছিনতাইয়ের ঘটনায় মামলা হয়েছে ২৪৩টি ও চুরির ঘটনায় মামলা হয়েছে ১ হাজার ২৮টি। তবে এ পরিসংখ্যান শুধু নথিভুক্তিতে। এর বাইরেও অসংখ্য ঘটনা ঘটছে। খুনের ঘটনায় মামলা হলেও চুরি, ছিনতাইয়ের ঘটনায় তেমন কোনো মামলা হয় না।

প্রায়ই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা যায়, অস্ত্রের মুখে মোবাইল ছিনিয়ে নিয়ে গেছে। রিকশা আটকিয়ে রামদা দিয়ে কুপিয়ে ব্যাগসহ সর্বস্ব ছিনতাই। কারও জমি দখল করছে, অস্ত্র দেখিয়ে মহড়া দিয়ে ছিনতাই করছে। রাতে বের হলেই আতঙ্ক ও উদ্বেগে থাকছে নগরবাসী। তবে এসব বিচ্ছিন্ন দুই-একটি ঘটনা ছাড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো মনে করছেন ডিএমপির মিডিয়া বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, আগের চেয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অবস্থার উন্নতি হয়েছে। বিচ্ছিন্ন দুই-একটি ঘটনা ছাড়া সবকিছু ঠিক আছে। আর অপরাধ ঘটলেই পুলিশ ব্যবস্থা নিচ্ছে। বিষয়গুলো নিয়ে তদন্ত করছে। এখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অবনতির কিছু নেই।

এলাকাভেদে অপরাধীদের আলাদা আলাদা ধরনও পেয়েছে পুলিশ। পুলিশ বলছে, মোহাম্মদপুর, ধানম-ি ও হাজারীবাগ এলাকার অপরাধীদের বড় অংশের সঙ্গে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়। তাদের অনেকে সাম্প্রতিককালে জামিনে কারাগার থেকে বেরিয়েছেন। গুলিস্তান, যাত্রাবাড়ী ও এর আশপাশের এলাকায় পেশাদার ছিনতাইকারী চক্রের তৎপরতা বেশি। আবার উত্তরার দিকে অল্পবয়সীদের অপরাধ-চক্রের তৎপরতা বেশি লক্ষণীয়। খিলগাঁও, মগবাজার, বাড্ডা ও মহাখালী এলাকায় পেশাদার অপরাধীদের পাশাপাশি মৌসুমি অপরাধীদের তৎপরতা বেশি পেয়েছে পুলিশ।

এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের কিছু আইডি ও পেজ থেকে ধর্ষণ, ছিনতাই ও ডাকাতির বিষয়ে গুজবও ছড়ানো হচ্ছে বলে জানান সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যরা। তারা বলেন, সবকিছু যে সঠিক তাও না। অনেকে ভিডিও তৈরি করে, আবার অনেকে পুরনো ভিডিও নতুন করে ছাড়ে। ফলে মানুষের মধ্যে বেশি আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে। গুজব ছড়ানোর সঙ্গে জড়িত শতাধিক ফেসবুক অ্যাকাউন্ট (আইডি) ও পেজ শনাক্ত করেছে পুলিশ। এ নিয়ে কাজও করছে পুলিশ।