নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ চেয়ে সরকারের ওপর চাপ অব্যাহত রাখবে বিএনপি। তবে তারা সরকার কী ধরনের পদক্ষেপ করে, তা দেখে পরের করণীয় ঠিক করবে। দলটি ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচনের লক্ষ্যে রোডম্যাপ প্রকাশের দাবি থেকে সরছে না, এটা নিশ্চিত বলা চলে। সরকার স্পষ্ট সময়সূচি না দিলে কর্মসূচির দিকে যাবে বলে দলটি।
বিএনপির একাধিক সিনিয়র নেতা জানান, আগামী এক-দুই মাসের মধ্যে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট না হলে রাজনৈতিক কর্মসূচি নতুন মাত্রায় নিয়ে মাঠে নামার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। সভা-সমাবেশ, সেমিনারসহ নানা ফোরামে এ ইস্যুতে চাপ অব্যাহত রাখা হচ্ছে।
গত শনিবার প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বৈঠক করেছে বিএনপির উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল। তবে সন্তুষ্ট হতে পারেনি তারা। কারণ, প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচনের কোনো নির্দিষ্ট রোডম্যাপ উপস্থাপন না করে আগের অবস্থানই পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তিনি প্রতিনিধিদলকে জানিয়েছেন, আগামী ডিসেম্বর থেকে পরবর্তী বছরের জুনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলমও রবিবার সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস আগামী বছরের ৩০ জুনের পর একদিনও ক্ষমতায় থাকবেন না।
রবিবারের বৈঠকে বিএনপির পক্ষ থেকে তিন পৃষ্ঠার একটি চিঠি প্রধান উপদেষ্টার হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। সেখানে নির্বাচন, বিচারব্যবস্থা, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা, চট্টগ্রাম বন্দর ও করিডর ইস্যুসহ সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়। বলা হয়, ‘আমরা যে বিষয়গুলো এ চিঠিতে উল্লেখ করেছি, সেগুলো আমাদের আগের প্রস্তাব ও পরামর্শের মতো উপেক্ষিত হলে তা হবে দুর্ভাগ্যজনক এবং অনিবার্যভাবেই সরকারকে সহযোগিতা করার লক্ষ্যে পরামর্শ দিতে তা আমাদের নিরুৎসাহিত করবে।’ সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, চিঠির ভাষ্য থেকে স্পষ্ট, সরকারের ওপর বিএনপির আস্থার ঘাটতি রয়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, প্রধান উপদেষ্টার ‘পরবর্তী পরিকল্পনা’ নিয়ে নতুন করে বিএনপিকে ভাবতে হচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার ধারাবাহিক বৈঠক অব্যাহত থাকলেও, দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে সরকারের সুনির্দিষ্ট অবস্থান অনুপস্থিতই থেকে যাচ্ছে। এমন অভিযোগ বিএনপির নেতাদের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। নির্দিষ্ট সময়ে রোডম্যাপ ঘোষণার বিষয়ে ভিন্ন পরিকল্পনা এ সরকারের রয়েছে কি না, তা তাদের সংশয়গ্রস্ত করেছে।
সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান সম্প্রতি সেনা অফিসার্স অ্যাড্রেসে জানান, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে জাতীয় নির্বাচন হওয়া উচিত। তার এ বক্তব্য রাজনৈতিক মহলে গুরুত্ব পাচ্ছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকব গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তনের জন্য। আমরা একটি সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ধারা ফিরিয়ে আনতে চাই। যত বিলম্ব হবে, যত দেরি হবে এবং তত বেশি আমাদের সংকট বাড়তে থাকবে। সেজন্যই আমরা জাতির সামনে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করার আহ্বান জানাচ্ছি বারবার।’
বিএনপির স্থায়ী কমিটির শীর্ষ দুই নেতা দেশ রূপান্তরকে জানান, আগামী কয়েকটি সপ্তাহ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যদি সরকারের পক্ষ থেকে নির্বাচনের দিনক্ষণ স্পষ্ট না করা হয় বা যদি কোনোভাবে নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যায়, তাহলে আমরা আন্দোলনের শরিকদের সঙ্গে বসে চূড়ান্ত কর্মসূচি ঠিক করব।’
বিএনপির জোটসঙ্গী বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান জানান, ‘নির্বাচনী রোডম্যাপ আদায়ে বিএনপির নেতৃত্বে থাকা দলগুলো সরকারের ওপর চাপ অব্যাহত রাখার পরিকল্পনা করেছে। ডিসেম্বরের মধ্যে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ঘোষণা না এলে ঈদুল আজহার পর জোটসঙ্গী দলগুলো বসে নতুন কর্মপরিকল্পনা নেওয়ার কথা আগের বৈঠকেই আলোচনা করা হয়েছে।’
এর আগে সংস্কার, বিচার, নির্বাচন, করিডর, চট্টগ্রাম বন্দর, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সম্প্রতি নির্বাচন কমিশন ঘেরাও, ইশরাকের শপথ, সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টার নিরপেক্ষতা প্রভৃতি প্রশ্নে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ঘোলাটে হয়ে ওঠে। দলগুলোর মতপার্থক্যের মধ্যেই প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের ‘পদত্যাগ ভাবনা’ ঘিরে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে গত শনিবার বৈঠক করে বিএনপি। ওইদিনই জামায়াত ও এনসিপির প্রতিনিধিরাও পৃথক বৈঠক করে। গত রবিবারও প্রধান উপদেষ্টা তার সরকারি বাসভবন যমুনায় দুই দফায় বিভিন্ন দল ও সংগঠনের ১৯ নেতার সঙ্গে বৈঠক করেন।
বৈঠকে অংশ নেওয়া বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে আলাপকালে জানা গেছে, তারা প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছেন। তারা চান, বর্তমান প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক দল ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক যাতে দুর্বল না হয়। বিশেষ করে সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সরকারের সম্ভাব্য দূরত্ব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন কয়েকজন নেতা। এ ধরনের দূরত্ব এড়ানো সম্ভব বলেও নেতারা মত দেন।
কয়েকজন নেতা অভিযোগ করেন, সরকারের কিছু মহল রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করতে সচেষ্ট। সংবেদনশীল বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত গ্রহণের ওপর জোর দেন তারা। অন্তর্বর্তী সরকারের নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও দুই ছাত্র উপদেষ্টার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন কেউ কেউ।
গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা বলেছি, জাতীয় নির্বাচনের একটা নির্দিষ্ট মাস ও সপ্তাহ কিংবা সুনির্দিষ্ট তারিখ বলা যেতে পারে। এখন স্থানীয় সরকার অগ্রাধিকার নয় বলেও বৈঠকে জানানো হয়েছে।’