ইসরায়েলের আগ্রাসন শিশুদের মৃত্যুপুরী ‘গাজা’

দীর্ঘ ১৯ মাসের যুদ্ধে ইসরায়েলের হামলায় কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকা। তবুও এ ধ্বংসস্তূূপ থেকে ফিনিক্স পাখির মতো জেগে ওঠার প্রত্যয় নিয়ে বেঁচে থাকা ফিলিস্তিনিদের সামনে ইসরায়েলের নতুন অস্ত্র হয়ে উঠেছে ‘অনাহার’। যার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী শিশু ও বৃদ্ধরা। চলতি বছর জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত সাময়িক যুদ্ধবিরতির পরে নতুন করে হামলা শুরুর পাশাপাশি গাজায় ত্রাণ প্রবেশে ইসরায়েলের টানা ১১ সপ্তাহ অবরোধে অঞ্চলটিতে ভয়াবহ খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে করুণতম পরিস্থিতির সতর্কতা জানিয়েছে। গাজায় ইসরায়েলের আগ্রাসনের ভয়াবহতার শিকার তেমনই এক শিশু সিওয়ার। পাঁচ মাস বয়সী এই শিশু ইসরায়েলি অবরোধে খাদ্যের অভাবে তীব্র পুষ্টিহীনতার কারণে হয়ে গেছে কঙ্কালসার। উপত্যকাটিতে কাজ করা বিবিসির সংবাদদাতাদের ক্যামেরায় উঠে এসেছে সে ভয়াবহতার চিত্র।

বিবিসির সংবাদদাতা ফার্গাল কিন তার প্রতিবেদনে লিখেছেন, আমার সহকর্মীর ক্যামেরা দেখেও তাদের (গাজার শিশুদের) কোনো বিকার নেই। শিশুরা খুব একটা তাকাচ্ছেও না। এই শিশুরা তাদের চারপাশে প্রতিনিয়ত দেখছে মৃত্যু, মৃতপ্রায় এবং মৃত্যুর অপেক্ষায় থাকা মানুষদের। আর কীইবা তাদের অবাক করবে? ক্ষুধা তাদের কাবু করে ফেলেছে। এই শিশুরা ক্যামেরা নিয়মিত দেখে অভ্যস্ত। ক্ষুধা-মৃত্যু-মৃত্যুর পর আলতোভাবে তাদের শরীর, কখনোবা শরীরের কিছু অংশ সাদা কাফনে জড়িয়ে দেয়া এই সবই দেখে চলেছি আমরা। উনিশ মাসের এই যুদ্ধে হাসপাতালের আঙিনায় অসংখ্য বেঁচে আসা মানুষের কান্না শুনেছে আমার সহকর্মী। সম্প্রতি তিনি সিওয়ার আশৌর নামের পাঁচ মাস বয়সী একটি মেয়েকে খুঁজে বের করেছেন। তিনি আমাকে লিখেছিলেন, খান ইউনিসের নাসের হাসপাতালে মেয়েটির কান্না তার হৃদয় ভেঙে দিয়েছিল। চলতি মাসের শুরুতে ফুটেজ নেওয়ার জন্য তিনি সেখানে গিয়েছিলেন।

মেয়ে শিশুটির ওজন এখন মাত্র দুই কেজির একটু বেশি। অথচ পাঁচ মাসের একটি বাচ্চার ওজন হওয়া উচিত ৬ কেজি কিংবা তারও বেশি। তিনি শুনেছেন মেয়েটিকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে এবং সে বাড়িতে আছে। পরে ইসরায়েলি বাহিনীর হামলার ভয়ে অস্থায়ী আশ্রয় শিবিরে আশ্রয় নিয়েছে। আল মাওয়াইসিতে বাস্তুচ্যুত মানুষের প্রচণ্ড ভিড়। অনেক খোঁজাখুজির পর একটি খুপরি ঘর মা নাজওয়া ও নানি রিমের সঙ্গে সিওয়ারকে খুঁজে পান বিবিসির সেই চিত্রগ্রাহক। তার মুখের সামনে মাছি উড়ছিল কিন্তু সিওয়ার ছিল শান্ত। ২৩ বছর বয়সী নাজওয়া বলছিলেন যে নাসের হাসপাতালে থাকার সময় তার অবস্থা কিছুটা স্থিতিশীল হয়। পরে চিকিৎসকরা এক ক্যান গুঁড়ো দুধ দিয়ে তাকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেয় কয়েকদিন আগে। এখন বাড়িতে এসেছে কিন্তু তার ওজন আবার কমতে শুরু করেছে। অ্যালার্জির জন্য সাধারণ গুঁড়ো দুধ সে হজম করতে পারে না। যুদ্ধ এবং ইসরায়েলের অবরোধের কারণে সেখানে প্রয়োজনীয় শিশুদের ফর্মুলা দুধেরও তীব্র সংকট। হাসপাতাল থেকে দেওয়া এক ক্যান দুধও শেষের পথে।

গত নভেম্বরে জন্মের পর থেকেই যুদ্ধের শব্দের মধ্যেই বাস করছে সিওয়ার। গোলাবারুদ, রকেট, বোমা পড়ছে কাছে এবং দূরে। গুলি কিংবা ইসরায়েলের ড্রোন ঘুরছে মাথার ওপর। নাজওয়া বলেন, এগুলো সে বুঝতে পারে। ট্যাংক, যুদ্ধবিমান কিংবা রকেটের বিকট শব্দএগুলো আমাদের খুব কাছে। সিওয়ার যখন এসবের শব্দ শোনে সে কান্না করতে শুরু করে। ঘুম থেকে উঠে চমকে যায় ও কান্না করতে শুরু করে। সিওয়ারের জন্মের সময়েই নাজওয়া অপুষ্টিতে ভুগছিলেন। তিনি ও তার মায়ের জন্য খাবার সংগ্রহ করাই কঠিন হয়ে পড়ছিল। তার মা বলছিলেন যে আমাদের ক্ষেত্রে সীমান্ত বন্ধ থাকা ও দাম বেড়ে যাওয়ায় দুধ ও ডায়াপার কেনা যাচ্ছিল না। চিকিৎসকরা বলছেন, অপুষ্টির কারণে কম বয়সি অনেক মায়েরা তাদের শিশুকে বুকের দুধ পান করাতে পারছে না।

গাজার মানবিক এই সংকট নিয়ে তীব্র উদ্বেগ জানিয়েছে জাতিসংঘসহ মানবাধিকার সংস্থাগুলো। জাতিসংঘ মহাসচিব বলেছেন ইসরায়েল যে পরিমাণ ত্রাণ প্রবেশের অনুমতি দিচ্ছে তা প্রয়োজনের তুলনায় এক ফোঁটা পানির মতো। তিনি বলেছেন- তেল, আশ্রয়, রান্নার গ্যাস ও বিশুদ্ধ পানির অভাবে ফিলিস্তিনিরা এখন নিষ্ঠুর একটি সংঘাতের নিষ্ঠুরতার চূড়ান্ত ধাপে রয়েছে। জাতিসংঘ জানিয়েছে, গাজার ৮০ শতাংশ অঞ্চলই ইসরায়েলের দখলে রয়েছে। প্রত্যাখ্যান, উদ্বেগ, নিন্দায় বাতাস ভারী হয়ে উঠলে, অপরিবর্তিত বাস্তবতায় দুঃখ-কষ্টকে সঙ্গী করে জীবন কাটে নাজওয়া ও তার শিশুকন্যা সিওয়ারের মতো গাজার ২১ লাখ মানুষের।