অনিশ্চয়তায় ডিএসসিসির কোরবানির পশুর হাট

ঈদুল আজহা মাত্র সপ্তাহখানেক দূরে। নাগরিক জীবনে কোরবানির ব্যস্ততা শুরু হলেও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) কোরবানির পশুর হাট ইজারা দেওয়াসহ অন্যান্য প্রস্তুতি কার্যত বন্ধ  রেখেছে। এখন পর্যন্ত একটি অস্থায়ী হাটের ইজারাও চূড়ান্ত করতে পারেনি সংস্থাটি। কোরবানির পশুর বর্জ্য ব্যবস্থাপানা নিয়ে কোনো কাজ করতে পারেনি। তাছাড়া বাসাবাড়ির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সড়ক পরিষ্কার, হোল্ডিং ট্যাক্স সংগ্রহ, জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধনসহ নাগরিক সেবায় অচলাবস্থা নেমে এসেছে। নগর ভবনে তালা লাগিয়ে মেয়র পদ বুঝিয়ে দেওয়ার দাবিতে ইশরাক হোসেনের সমর্থকদের লাগাতার আন্দোলনের কারণে এ অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে।

সরকারের পক্ষ থেকে আদালতের সিদ্ধান্তের অপেক্ষার কথা বলা হলেও অনড় আন্দোলনকারীরা। এ অবস্থায় কোরবানির পশুর হাট, কোরবানির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কীভাবে পরিচালিত হবে তাকেউ বলতে পারছে না। অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে যাচ্ছে রাজধানীর দক্ষিণ অংশের নাগরিক সেবা। নগর ভবন খুলে দিলেও ৩/৪ দিনের মধ্যে কোরবানির পশু বেচাকেনার জন্য অস্থায়ী হাট প্রস্তুত করা কঠিন হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তারা বলছেন, নগর ভবনে তালা দিয়ে রাখার কারণে অস্থায়ী পশুর হাটের দরপত্রের সিডিউল বিক্রি ও জমা  নেওয়া যায়নি। তবে ৯টি হাটের মধ্যে ৭টি হাটের সর্বোচ্চ দরদাতা পাওয়া গেছে। অফিস খুললে তাদের হাট বসানোর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে দেওয়া হবে। বাকি দুটি হাটের ব্যাপারেও সিদ্ধান্ত  নেওয়া হবে।

ঈদের দিনসহ মোট ৫ দিনের জন্য অস্থায়ী হাটের ইজারা দেওয়া হয়ে থাকে। হাট প্রস্তুত করার জন্য ইজাদারের এক সপ্তাহ সময় লাগে। সে হিসেবে এখনই হাটের প্রস্তুতির সময় চলছে। ঢাকা উত্তর সিটি এলাকায় ইজারা পেয়ে অনেক ইজারাদার প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছেন।

জানা গেছে, ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে রাজধানীর ১১টি স্থানে অস্থায়ী পশুর হাট বসানোর জন্য গত ২১ এপ্রিল বিজ্ঞপ্তি দেয় ডিএসসিসি। দুটি জায়গায় হাট বসাতে নির্দেশনা দেয় উচ্চ আদালত। প্রথম দুই দফায় ৭টি হাটের সর্বোচ্চ দরদাতা পেয়েছে সংস্থাটি। কিন্তু তৃতীয় দফা দরপত্র দাখিলের সময় ছিল গত ২২ মে। আন্দোলনের কারণে সেদিন দরপত্র বিক্রি করতে পারেনি ডিএসসিসি। নগর ভবনের তালা না খুললে এসব হাটের ইজারা প্রক্রিয়া কিভাবে সম্পন্ন হবে তা জানেন না কর্মকর্তারা।

সংস্থাটির সম্পত্তি কর্মকর্তা হাসিবা খান দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, ‘দুই দফায় তারা ৭টি হাটের বিপরীতে সরকারি মূল্যের চেয়ে বেশি দর পেয়েছেন। তবে অফিস বন্ধ থাকার কারণে কোনো হাটই চূড়ান্তভাবে ইৎারা দেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারেননি।’

কোরবানির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়েও আশঙ্কা

নগর ভবন বন্ধ থাকায় কোরবানি পশুর বর্জ্য অপসারণেও বড় ধরনের সংকট দেখা দিতে পারে। এখনো এ ব্যাপারে প্রস্তুতি নিতে পারেনি সংস্থাটি। কোরবানির ঈদের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে বড় ধরনের কর্মযজ্ঞ করতে হয় সিটি করপোরেশনকে। এরইমধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে ১২ ঘণ্টায় বর্জ্য অপসারণের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ঘোষণা বাস্তবায়নে তার কোনো প্রস্তুতি নিতে পারেনি ডিএসসিসি।

সংস্থাটির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমোডর মো. মাহবুবুর রহমান তালুকদার বলেন, গরুর হাটের টেন্ডার বা প্রাক-ঈদ প্রস্তুতি সভা কিছুই করতে পারিনি। ময়লা পরিবহনের গাড়ি মেরামত, ব্লিচিং পাউডার কেনাসহ প্রায় সব কাজ কাজ বন্ধ আছে। এভাবে চললে ঈদের সময় কোরবানির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা মারাত্মক চ্যালেঞ্জের হবে।’

ফলে দক্ষিণ সিটির জনগণের ভাগ্যে কি আছে তা কেউ জানে না।

নাগরিক সেবা তলানিতে

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ৫৩ নম্বর ওয়ার্ডের জুরাইন এলাকায় গত ৬ দিন ধরে ময়লা সংগ্রহ করছেন না পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা। ময়লা জমা হয়ে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। শুধু জুরাইন বা ৫৩ নম্বর ওয়ার্ডই নয়, পুরান ঢাকাসহ ডিএসসিসির অনেক এলাকার বাসাবাড়িতে প্রায় এক সপ্তাহ ধরে ময়লার স্তূপ জমা হয়েছে। জন্মমৃত্যু নিবন্ধনসহ কোনো ধরনের নাগরিক সেবা পাচ্ছেন না নাগরিকরা।

জুরাইনের বাসিন্দা মিজানুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, গত ৫ দিন ধরে আমাদের এলাকা থেকে বাসাবাড়ির ময়লা নেওয়া হচ্ছে না। পচা দুর্গন্ধে সবাই অতিষ্ঠ। আশপাশের এলাকা থেকেও ময়লা নেওয়া হচ্ছে না। অনেকেই দুর্গন্ধ সহ্য করতে না পেরে সেই ময়লা রাস্তায় ফেলে দিচ্ছেন।

ওয়ারী এলাকার শাহনাজ বেগম বলেন, ‘আন্দোলন হোক, মেয়র  হোক আর প্রশাসক হোক, ময়লা তো নেবে? ময়লা নেওয়া বন্ধ করে এমন আন্দোলন তো আমরা চাই না। কে সরকারে এলো, গেলো তা দিয়ে তো আমদের মাথাব্যথা নেই। ট্যাক্স দিয়ে যদি সেবা না পাই, তাহলে আমরা কোথায় যাব?

জানা গেছে, সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে মশক নিধন এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালু রাখার দাবি করা হলেও মাঠ পর্যায়ে তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না। মশক ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীরাও গাছাড়া দিয়ে আছেন। তাদের অনেকেই আন্দোলনেও অংশ নিচ্ছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক পরিচ্ছন্নতাকর্মী দেশ রূপান্তরকে বলেন, সারা দিন আন্দোলন করি, আবার ময়লাও পরিষ্কার করি। আমাদের দাবি ছিল, মেয়র হলে কাজের সুবিধা হতো। কিন্তু কি ধরনের সুবিধা হতো এ প্রশ্নের কোনো উত্তর দেননি তিনি।

ডিএসসিসি শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি আরিফ চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সব কর্মচারীরা স্বেচ্ছায় আন্দোলনে যোগ দিয়েছে। কাউকে জোর করে নিয়ে আসা হয়নি। মেয়র হিসেবে ইশরাক হোসেনকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিলে সবাই কাজে যোগ দেবে।

নাগরিক ভোগান্তির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এর জবাব স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় এবং উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া দেবেন।’

রাজস্ব আদায়ে ধাক্কা

মে ও জুন মাস সিটি করপোরেশনের রাজস্ব আদায়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এ সময় বছরের এক-তৃতীয়াংশের বেশি রাজস্ব আদায় হয়। কিন্তু আন্দোলনের কারণে রাজস্ব আদায় কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে।

ডিএসসিসির উপপ্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা শাহজাহান আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখন রাজস্ব আদায়ের পিক টাইম। অথচ কোনো কাজ করতে পারছি না। ফলে বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা কঠিন হয়ে যাবে।’

আদালতের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় মন্ত্রণালয়

ডিএসসিসি মেয়র পদে ইশরাক হোসেনের শপথ পাঠের বিষয়টি এখন আদালতের রায়ের ওপর নির্ভরশীল বলে জানিয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। গতকাল মঙ্গলবার স্থানীয় সরকার বিভাগের আইন অধিশাখা থেকে প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ইশরাক হোসেনের শপথ পড়ানোর বিষয়ে গত ২২ মে হাইকোর্টে করা রিট খারিজ হওয়ার পর স্থানীয় সরকার বিভাগ সার্বিক প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কিন্তু গত ২৫ মে ইশরাক হোসেন নিজেই তার আইনজীবীর মাধ্যমে মেয়র হিসেবে শপথ নেওয়ার জন্য হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন দাখিল করেন।

গতকাল  একজন নাগরিকের পক্ষে হাইকোর্ট বিভাগের ২২ মে দেওয়া খারিজ আদেশের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল দাখিল করা হয়েছে। ফলে ইশরাক হোসেনের শপথের বিষয়টি এখন সর্বোচ্চ আদালতে বিচারাধীন। তাই স্থানীয় সরকার বিভাগও ইশরাক হোসেনের শপথপাঠের ক্ষেত্রে আদালতের রায়ের অপেক্ষায় রয়েছে।