বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) জানিয়েছে, জাতীয় নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণার সময় এসে গেছে। এ ছাড়া পুঁজিবাজারে সংকট চলমান রয়েছে বলে জানিয়েছে সংগঠনটি। অভ্যন্তরীণ লেনদেনে কারসাজি অব্যাহত রয়েছে। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এ ছাড়া সরকারি কর্মকর্তাদের খুশি করতে মহার্ঘ্য ভাতা দেওয়া হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছে সিপিডি।
রাজধানীর ধানম-িতে সিপিডি কার্যালয়ে গতকাল ‘২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনীতির অবস্থান (তৃতীয় পর্যালোচনা)’ শীর্ষক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে এসব কথা জানায় সিপিডি। সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন, সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান, গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম প্রমুখ এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
এক প্রশ্নের জবাবে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘নির্বাচনের বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে একটা টাইমফ্রেম দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে একটা নির্দিষ্ট তারিখ দেওয়াটা যুক্তিযুক্ত হবে। একটা ভাল সিদ্ধান্ত হবে। সেটা ডিসেম্বর হোক, জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি কিংবা মার্চ হোক একটা নির্দিষ্ট সময় দেওয়ার সময় এসেছে। ‘সেটিকে রোডম্যাপ বলা হবে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের রোডম্যাপ না, একেবারে সুনির্দিষ্ট; একটা সুনির্দিষ্ট সময় দেওয়ার সময় এসে গেছে এখন।’
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনায় ফাহমিদা খাতুন আরও বলেন, বিভিন্ন সময়ে অবহেলা ও বাজার কারসাজির কারণে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সেই সংকট চলমান রয়েছে। গত ১৬ বছরের পুঁজিবাজারে এর যে প্রকৃত মূল্য, তা ৩৭ দশমিক ৬ শতাংশ কমেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিভিন্ন খাতে সংস্কার করা হচ্ছে। পুঁজিবাজার সংস্কারে একটা টাস্কফোর্স করা হয়েছে। কিন্তু সেখানে খুব একটা অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না।
তিনি আরও বলেন, পুঁজিবাজারে ৫টি চ্যালেঞ্জ আছে, তার মধ্যে রয়েছে- নি¤œমানের আইপিও, আর্থিক প্রতিবেদনে অনিয়ম, বিও অ্যাকাউন্টে স্বচ্ছতার অভাব, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের প্রশ্নবিদ্ধ আচরণ ও সেকেন্ডারি মার্কেটে কারসাজি। এগুলোর উন্নতি করতে হবে। গত ৯ মাসে ডিএসইতে বিভিন্ন সূচকের ওঠানামা দেখতে পাচ্ছি। ধারাবাহিকভাবে ডিএসই সূচক নি¤œমুখী থেকেছে। খুব দ্রুত তা ৬ হাজার পয়েন্ট অতিক্রম করেছে। অভ্যন্তরীণ লেনদেনে কারসাজি অব্যাহত রয়েছে। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক বলেন, দুর্বল নজরদারি, প্রযুক্তি ব্যবহার না করা, অপরাধ যারা করছে তাদের শাস্তির আওতায় না আনাসহ নানা কারণে পুঁজিবাজার শক্তিশালী হচ্ছে না। ব্যাংকিং খাতে সুশাসন আনতে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা ও বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালনা বোর্ডের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার পরামর্শ দেন ফাহমিদা খাতুন।
সরকার মহার্ঘ্য ভাতা দেওয়ার নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে। এখন যে ৫ শতাংশ বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া হয়, তার বদলে এটি দেওয়া হবে। এতে সরকারি ব্যয় প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা বেড়ে যাবে। এ বিষয়ে ফাহমিদা খাতুন বলেন, এটা কি সরকারি কর্মকর্তাদের খুশি করতে করা হচ্ছে? ফাহমিদা খাতুন আরও বলেন, অন্যদের জন্য ব্যবস্থা নেওয়া না হলে মূল্যস্ফীতির চাপে পড়বে সাধারণ মানুষ। এ ছাড়া এ বরাদ্দ দেওয়ার সময় নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
মূল্যস্ফীতি প্রসঙ্গে ফাহমিদা খাতুন বলেন, ২০২৩ সাল থেকে মূল্যস্ফীতি বেড়েই চলেছে। এখন একটু কমেছে। বিশেষ করে খাদ্য মূল্য বৃদ্ধি এ মূল্যস্ফীতি বাড়ানোর চালক হিসেবে কাজ করেছে। বন্যা, বাজার নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতাসহ নানা কারণে মূল্যস্ফীতির চাপ বেড়েছে। এই অর্থনীতিবিদ বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অবলম্বন করছে বেশ কয়েক মাস ধরে। নীতি সুদহার বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে, তারপরও কাঠামোগত দুর্বলতায় মুদ্রানীতি পুরোপুরি কাজ করতে পারেনি।
ব্রিফিংয়ে রেমিট্যান্স, পুঁজিবাজার, জ্বালানি সংকট নিয়ে আলোচনা করা হয়। সিপিডি জানায়, লোডশেডিং বৃদ্ধি পাওয়া, গ্যাসের সংকট ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি দেশের অর্থনীতি ও জনজীবনকে প্রভাবিত করছে। চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা আদায়ে বছরের বাকি সময়ে ৬৪ দশমিক ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে। চলতি অর্থবছর শেষ হবে আগামী ৩০ জুন। এই সময়ে এটা আদায় করা প্রায় অসম্ভব হবে বলে মনে করছে সিপিডি। সব মিলে অর্থবছর শেষে রাজস্ব আহরণে ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে সিপিডি।
ফাহমিদা খাতুন বলেন, চলতি অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আদায় করা রাজস্বের প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ২ দশমিক ৮ শতাংশ, গত বছর যা ছিল ১০ দশমিক ৭ শতাংশ। এ ছাড়া জুলাই-জানুয়ারি সামগ্রিক রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫ দশমিক ৩ শতাংশ। আগের অর্থবছরের একই সময়ে যা ছিল ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ।
সিপিডির সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বিনিয়োগে চাঞ্চল্য আমরা আনতে পারছিনা। অনিশ্চয়তা কাজ করছে। বিডা একটা বড় বিনিয়োগ সম্মেলন করল। কিন্তু অনিশ্চয়তা থেকে যাচ্ছে। গ্যাসের সাপ্লাই, মানসম্পন্ন বিদ্যুৎ, ওয়ানস্টপ সার্ভিসের অনেকগুলোই আমরা দিতে পারিনি। এটাই মূল চ্যালেঞ্জ। উচ্চমূল্যস্ফীতির চাপে জীবন মানে অবনমন যেটা দেখছি সেটা থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র উপায় হচ্ছে শোভন কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা। সেটা করতে গেলে বিনিয়োগে চাঞ্চল্য আনতে হবে।