সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থেকে হাটপাঁচিল পর্যন্ত যমুনা নদীর ডান তীর রক্ষা প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৪ সালের ৩০ জুন। তবে নির্ধারিত সময়েও কাজ শেষ না হওয়ায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ৩০ জুন ২০২৫ পর্যন্ত করা হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, তদারকির অভাবে ২০২১ থেকে গত বছরের জুন পর্যন্ত উল্লেখ করার মতো কোনো কাজ হয়নি। আগামী বর্ষার আগে কাজ শেষ করতে তাড়াহুড়ো করা হচ্ছে। যে পরিমাণ জিওব্যাগ ফেলার কথা, সেই পরিমাণ ফেলা হচ্ছে না। এছাড়া নিম্নমানের আরসিসি ব্লক ব্যবহার করা হচ্ছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পটিতে ছয় কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে। নির্মাণ-ব্যয় ধরা হচ্ছে ৬৫৩ কোটি টাকা। পাউবো সূত্রে জানা যায়, প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ৩৫টি প্যাকেজে দেশের বিভিন্ন জেলার প্রায় ১৭টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। প্রথম ধাপে প্রকল্পের মেয়াদ ছিল ২০২৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত, পরে তা বাড়িয়ে ২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হওয়া নিয়ে সংশয় থাকায় দ্বিতীয় দফায় প্রকল্পের মেয়াদ ৩০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সময়মতো প্রকল্পের কাজ শুরু না হওয়ায় প্রতিবছর নদীভাঙনে তীরবর্তী মানুষের ঘরবাড়ি ও শত শত বিঘা জমি যমুনায় বিলীন হয়েছে। অনেক পরিবার বাসস্থান হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সময়মতো কাজ শেষ হলে বাড়িঘর ও সরকারি-বেসরকারি স্থাপনাগুলো নদীভাঙন থেকে রক্ষা পেত। কিন্তু অব্যবস্থাপনা ও তদারকির অভাবে প্রকল্পের কাজ সময়মতো এগোয়নি। এলাকাবাসীর দাবি, এসব অনিয়মের জন্য প্রকল্পসংশ্লিষ্ট নির্বাহী প্রকৌশলী ও উপবিভাগীয় প্রকৌশলীর অপসারণ প্রয়োজন।
সরেজমিন দেখা গেছে, বাঁধ নির্মাণে মাটি, বালু, জিওব্যাগ ও আরসিসি ব্লকের কাজ চলমান। ঢাকা, রাজশাহী, সিরাজগঞ্জ, পটুয়াখালী, ঠাকুরগাঁও, ফরিদপুরসহ বিভিন্ন জেলার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো এ কাজে নিয়োজিত রয়েছে। বিভিন্ন পয়েন্টে কাজ চললেও বেশির ভাগ কাজ গত বছরের জুলাই থেকে শুরু হয়েছে। এখনো অনেক জায়গায় মাটির কাজ ও জিওব্যাগ স্থাপনের কাজ শেষ হয়নি। এরই মধ্যে বর্ষার আগে ব্লক বসানোর কাজ শুরু হওয়ায় এর স্থায়িত্ব নিয়ে সংশয় রয়েছে।
হাটপাঁচিল গ্রামের বাসিন্দা ইয়াসিন চতুর বলেন, ‘প্রকল্পে ৬৫৩ কোটি টাকা ব্যয় হলেও নির্দিষ্ট সময়ে কাজ শেষ হয়নি। গত বছর ভাঙনে বহু মানুষ তাদের ঘর হারিয়েছেন।’ একই গ্রামের শাহজাহান আলী ব্যাপারী বলেন, ‘যদি সময়মতো প্রকল্প বাস্তবায়ন হতো, তাহলে এত ক্ষয়ক্ষতি হতো না। উদাসীনতায় অনেকেই নিঃস্ব হয়ে গেছেন।’
এনায়েতপুর ভাসির্টিঘাট এলাকার বাসিন্দা আবু নাঈম বলেন, ‘নির্মাণের কয়েক দিনের মধ্যেই পাঁচিল এলাকায় ব্লক ধসে পড়েছে। ভবিষ্যতে বাঁধ কতটা টেকসই হবে, তা নিয়ে সন্দেহ আছে।’ এনায়েতপুর স্পার বাঁধের পাশে কাজ করছে ঢাকার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স সালেহ আহমেদ। তাদের প্রকল্প ইঞ্জিনিয়ার সোহেল রানা বলেন, ‘আমাদের প্যাকেজে ২৯০ মিটার কাজের ৭৮ শতাংশ শেষ হয়েছে। আরও কিছু কাজ বাকি আছে। আশা করছি, জুনের আগেই বাকি কাজগুলো শেষ করতে পারব। এ কাজে কোনো অনিয়ম হচ্ছে না।’
অন্যদিকে মেসার্স খন্দকার শাহিন আহমেদ নামের আরেক প্রতিষ্ঠান ব্রাক্ষণগ্রাম থেকে হাটপাঁচিল পর্যন্ত ৩৯০ মিটার বাঁধের কাজ করছে। কাগজে-কলমে কাজের অগ্রগতি ৯৫ দশমিক ২৩ শতাংশ হলেও বাস্তবে অনেক কাজ এখনো বাকি।
এমবিএএল-এমএসআর জিভি নামের একটি প্রতিষ্ঠান ৩ দশমিক ১৩০ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ করছে। তাদের অগ্রগতি ২৬ দশমিক ৭০ শতাংশ দেখানো হলেও বাস্তবে কাজের দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। এমনকি সাইটে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মীও পাওয়া যায়নি।
তবে অনিয়ম কিংবা ঠিকাদারের গাফিলতির অভিযোগ মানতে নারাজ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মোখলেছুর রহমান। তিনি জানান, প্রকল্পের কাজ ৮৫ শতাংশ শেষ হয়েছে। এখন পর্যন্ত ৫১১ কোটি টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে, যার ৬৯ শতাংশ বিল দেওয়া হয়েছে। সময়মতো কাজ শেষ না হওয়ায় প্রকল্পের মেয়াদ ৩০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।