শিল্পনগরীতে নেই ক্ষুদ্র শিল্পের ঠাঁই!

বরিশাল বিসিক শিল্পনগরীতে দীর্ঘদিন ধরে ৯৩টি প্লট ফাঁকা পড়ে আছে। এসব জায়গায় কোনো ধরনের স্থাপনা না থাকায় প্রবেশাধিকার পাচ্ছেন না শহরের শতাধিক ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প উদ্যোক্তা।

উৎপাদন সক্ষমতা ও বাজার চাহিদা থাকা সত্ত্বেও শুধু পরিকাঠামোগত অসুবিধা এবং সরকারি সহায়তার অভাবে তারা নিজ নিজ শিল্প চালিয়ে যেতে পারছেন না। এতে একদিকে যেমন সম্ভাবনাময় শিল্প খাত বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি কর্মসংস্থান ও আঞ্চলিক অর্থনীতির বিকাশে অদৃশ্য প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা বিসিক এলাকায় ভাড়াভিত্তিক শেড নির্মাণের দাবি জানালেও বরাদ্দ না থাকায় কর্তৃপক্ষ তা বাস্তবায়নে অক্ষম বলে জানিয়েছে। ফলে বরিশাল বিসিক শিল্পনগরী এখন শুধু বড় ব্যবসায়ীদের আধিপত্যের জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে পিছিয়ে পড়ছেন প্রকৃত ক্ষুদ্র শিল্প উদ্যোক্তারা।

এক সময় ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য পরিকল্পিত এই শিল্পনগরী এখন বড় কারখানাগুলোর একচেটিয়া আধিপত্যে পরিণত হয়েছে। বরিশাল বিসিক শিল্পনগরীতে বর্তমানে ৪৭০টি প্লটের মধ্যে ৩৭৭টি প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১৭৭ উদ্যোক্তার অনুকূলে। এর মধ্যে মাত্র ১২৬টি প্লটে গড়ে উঠেছে কার্যকর শিল্পকারখানা। কিছু উদ্যোক্তা একাধিক প্লট নিয়ে বড় পরিসরের শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়েছেন।

অথচ বিপরীতে একই সময়ে শতাধিক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা প্লট বরাদ্দ তো দূরের কথা ভাড়া দেওয়ার মতো একটি শেডও পাননি বিসিক কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে।

প্লট না পেয়ে নগরীর বিভিন্ন এলাকার ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা নিজেদের বাসা-বাড়ির অব্যবহৃত অংশ বা ভাড়া কক্ষে ছোট কারখানা তৈরি করে কোনোভাবে পণ্য উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছেন। কাঠের হস্তশিল্প পণ্য তৈরি করা ইব্রাহিম মাসুম বলেন, ‘আমার প্রডাক্টের ভালো চাহিদা আছে, কিন্তু জায়গার অভাবে অর্ডার নিতে পারি না। বাসার ভেতর কাঠ কাটাকাটি করলে প্রতিবেশীরা আপত্তি করেন, আবার বৈদ্যুতিক সংযোগেও ঝামেলা হয়। বিসিকে একটা ছোট ঘর ভাড়া পেলে নিশ্চিন্তে কাজ করতে পারতাম।’

তার মতো আরও অনেক উদ্যোক্তা কাপড়, প্রসাধনী, বায়ো-পণ্য, আবার কেউ হস্তশিল্প নিয়ে কাজ করছেন। কিন্তু উৎপাদনের জায়গা ও পরিবেশ না থাকায় পণ্যের গুণগতমান ধরে রাখা ও সরবরাহের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বরিশাল বিসিক কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, বর্তমানে শিল্পনগরীতে অন্তত ৯৩টি খালি প্লট আছে। এসব প্লটে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ থাকলে সরকার অল্প খরচে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য টিনশেড বা আধাপাকা গঠনমূলক ঘর তৈরি করতে পারত। এতে অন্তত ৫০ জন উদ্যোক্তা তাৎক্ষণিকভাবে শিল্পে যুক্ত হতে পারতেন, তৈরি হতো নতুন কর্মসংস্থান। কিন্তু সংশ্লিষ্ট দপ্তরের অর্থ না থাকায় কিংবা কেন্দ্রীয় অনুমোদন না পাওয়ায় এ পরিকল্পনা কার্যকর করা সম্ভব হয়নি।

নগরীর উদ্যোক্তারা বলছেন, প্রধান উপদেষ্টা দেশের তরুণদের উদ্যোক্তা হতে বারবার উৎসাহিত করছেন, তরুণরাও সাড়া দিচ্ছেন। কিন্তু মাঠপর্যায়ে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি না হলে ছোট উদ্যোগ কখনই টিকে থাকবে না। বিশেষ করে বিসিকের মতো জায়গায় ছোট শিল্পীদের ঢুকতে না দেওয়া হলে দীর্ঘমেয়াদে পুরো শিল্প খাতই বড় ব্যবসায়ীদের হাতে একচেটিয়া হয়ে পড়বে।

এখন সময় নীতিনির্ধারকদের সঠিক পদক্ষেপ নেওয়ার। সরকারি অর্থায়নে দ্রুত একটি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা শেড প্রকল্প হাতে নিয়ে বাস্তবায়ন করা গেলে বরিশালের এই বিসিক শিল্পনগরী শুধু একটি শিল্প এলাকা নয়, হয়ে উঠতে পারে দক্ষিণাঞ্চলের ক্ষুদ্রশিল্প বিপ্লবের কেন্দ্রবিন্দু।

বিসিক বরিশালের উপ-মহাব্যবস্থাপক নজরুল ইসলাম বলেন, ‘ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য শেড তৈরি করে ভাড়া দেওয়ার বিষয়টি বিসিকের নীতিমালায় রয়েছে। আমরাও এতে আগ্রহী। কিন্তু আমাদের কাছে শেড নির্মাণের মতো বাজেট নেই। কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে বরাদ্দ ও অনুমোদন পেলে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।’